শিক্ষক থাকার পরও তিনি কেন বললেন, কারো কাছে পড়েননি?

এক বইয়ে তিনি শৈশবের তিন শিক্ষকের নাম লিখেছেন, আরেক বইয়ে বলেছেন কোনো মানুষের কাছে কুরআন-হাদীসের একটি সবকও পড়েননি। দুটি কথা কি সত্যিই পরস্পরবিরোধী?

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

উনিশ শতকের পাঞ্জাব। কাদিয়ান নামের ছোট্ট এক গ্রাম। তখন এ অঞ্চলে স্কুল-মাদ্রাসায় পড়ার রেওয়াজ তেমন ছিল না। সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো বাড়িতে শিক্ষক রেখে ছেলেদের পড়াত।

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর বাবাও তা-ই করেছিলেন। পরে তিনি নিজেই সেই শৈশবের গল্প লিখে গেছেন। আর সেই গল্প থেকেই উঠেছে একটি আপত্তি।

আপত্তিটি কী?

বিরোধীরা দুটি লেখা পাশাপাশি রাখেন।

প্রথমটি আইয়ামুস সুলেহ গ্রন্থের। সেখানে তিনি লিখেছেন, কেউ প্রমাণ করতে পারবে না যে তিনি কোনো মানুষের কাছে কুরআন, হাদীস বা তফসীরের একটি সবকও পড়েছেন, কিংবা কোনো মুফাসসির বা মুহাদ্দিসের শিষ্যত্ব নিয়েছেন। (রূহানী খাযায়েন, ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৪, টীকা)

দ্বিতীয়টি কিতাবুল বারিয়্যা গ্রন্থের। সেখানে তিনি নিজেই তিনজন শিক্ষকের নাম লিখেছেন। (রূহানী খাযায়েন, ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৯–১৮১, টীকা)

আপত্তিকারীরা বলেন, এক জায়গায় শিক্ষক থাকার কথা, আরেক জায়গায় অস্বীকার। তাহলে তো একটি কথা মিথ্যা।

আসুন, দুটি লেখাই পুরো প্রসঙ্গসহ পড়ি।

তিন শিক্ষক কারা, কী পড়িয়েছিলেন?

কিতাবুল বারিয়্যা-য় তিনি লিখেছেন, ছয়-সাত বছর বয়সে তাঁর জন্য একজন ফারসি-জানা শিক্ষক রাখা হয়। তাঁর নাম ফযলে ইলাহী। তিনি তাঁকে কুরআন শরীফ আর কয়েকটি ফারসি বই পড়ান।

দশ বছর বয়সে ফযল আহমদ নামের একজন আরবী-জানা মৌলভী নিযুক্ত হন। তাঁর কাছে তিনি সরফ (শব্দরূপ) এর কয়েকটি বই আর নাহু (ব্যাকরণ) এর কিছু নিয়ম পড়েন।

সতেরো-আঠারো বছর বয়সে আসেন মৌলভী গুল আলী শাহ। তাঁর কাছে তিনি পড়েন নাহু, মানতিক (যুক্তিবিদ্যা) আর হিকমত (দর্শন), অর্থাৎ সে যুগের প্রচলিত বিদ্যা। এ ছাড়া বাবার কাছে চিকিৎসাশাস্ত্রের কিছু বই পড়েন।

মজার একটি কথাও তিনি লিখেছেন: প্রথম দুই শিক্ষকের নামের প্রথম শব্দ “ফযল”, অর্থাৎ অনুগ্রহ। তাঁর মনে হয়েছে, এটি যেন আল্লাহর অনুগ্রহে তাঁর শিক্ষার প্রথম বীজ বোনা।

এবার তালিকাটি মন দিয়ে দেখুন। শিশুকালে কুরআন পড়তে শেখা, ফারসি বই, আরবী ব্যাকরণের প্রাথমিক পাঠ, যুক্তিবিদ্যা আর দর্শন। এর মধ্যে কোথাও কোনো মুফাসসিরের কাছে তফসীর পড়া নেই, কোনো মুহাদ্দিসের কাছে হাদীসের সনদ নেওয়া নেই।

✦

“কোনো সবক পড়িনি” কথাটি কোন প্রসঙ্গে?

এবার আইয়ামুস সুলেহ-র লেখাটি তার আগের-পরের কথাসহ দেখি। সেখানে তিনি বোঝাচ্ছেন, প্রতিশ্রুত সংস্কারকের নাম কেন “মাহদী”, অর্থাৎ “যাকে আল্লাহ হেদায়াত দিয়েছেন”।

তিনি লেখেন, আমাদের নবী (সা.) বাহ্যিক জ্ঞান কোনো শিক্ষকের কাছে পড়েননি। আল্লাহ নিজেই তাঁর শিক্ষক হয়েছেন, প্রথম “ইকরা” (পড়ো) আল্লাহই বলেছেন। অথচ মূসা (আ.) ও ঈসা (আ.) মানুষের পাঠশালায় বসেছিলেন। তাই আগমনকারীর নাম “মাহদী” রাখার মধ্যে ইঙ্গিত আছে যে, তিনি দ্বীনের জ্ঞান আল্লাহর কাছ থেকেই পাবেন, কুরআন ও হাদীসে কোনো ওস্তাদের শাগরেদ হবেন না।

এরপরই আসে সেই বাক্য: শপথ করে বলতে পারি, আমার অবস্থা এমনই। কেউ প্রমাণ করতে পারবে না যে আমি কোনো মানুষের কাছে কুরআন, হাদীস বা তফসীরের একটি সবকও পড়েছি, বা কোনো মুফাসসির বা মুহাদ্দিসের শিষ্যত্ব নিয়েছি। দ্বীনের রহস্য সরাসরি আমার কাছে খোলা হয়েছে। (রূহানী খাযায়েন, ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯৪, টীকা)

অর্থাৎ এখানে কথা হচ্ছে দ্বীনের গভীর জ্ঞান নিয়ে: কুরআনের তফসীর, হাদীসের ব্যাখ্যা, দ্বীনের রহস্য। কথা হচ্ছে না অক্ষর চেনা, তিলাওয়াত শেখা বা ব্যাকরণের প্রথম পাঠ নিয়ে।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

ফযলে ইলাহী তো তাঁকে কুরআনই পড়িয়েছিলেন, তাহলে?

এখানে কেউ কেউ বলেন, কিতাবুল বারিয়্যা-তেই তো লেখা আছে, প্রথম শিক্ষক তাঁকে কুরআন শরীফ পড়িয়েছিলেন। চলুন দেখি।

আমাদের দেশে প্রায় প্রতিটি মুসলমান শিশু ছোটবেলায় মক্তবে বা বাড়িতে হুজুরের কাছে কায়দা, আমপারা, কুরআন পড়া শেখে। বড় হয়ে সে যদি বলে, “আমি কোনো মুফাসসিরের কাছে তফসীর পড়িনি”, কেউ কি তাকে মিথ্যাবাদী বলবে? বলবে না। কারণ ছয় বছর বয়সে কুরআনের অক্ষর চিনে তিলাওয়াত শেখা আর কুরআনের অর্থ ও তফসীর শেখা এক জিনিস নয়।

লক্ষ করুন, ফযলে ইলাহী ছিলেন একজন “ফারসি-জানা” শিক্ষক, কোনো মুফাসসির নন। আর আইয়ামুস সুলেহ-র কথা ছিল দ্বীনের রহস্য আর তফসীর-হাদীসের জ্ঞান নিয়ে। একটি শিশুর তিলাওয়াত শেখা দিয়ে সেই দাবি খণ্ডন হয় না।

নবী বা মাহদীর কি কোনো শিক্ষক থাকতে পারে?

কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, আল্লাহর প্রেরিত পুরুষের তো কোনো মানুষ শিক্ষক থাকার কথা নয়। এর উত্তর হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই টীকাতেই দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, মহানবী (সা.) কোনো শিক্ষকের কাছে পড়েননি, কিন্তু মূসা (আ.) ও ঈসা (আ.) পাঠশালায় বসেছিলেন। অর্থাৎ বাহ্যিক শিক্ষা থাকা নবুওয়তের পথে বাধা নয়।

কুরআনও জানায়, মূসা (আ.) শৈশব থেকে বহু বছর ফেরাউনের ঘরে বড় হয়েছিলেন। ফেরাউন তাঁকে সেই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছিল:

قَالَ اَلَمۡ نُرَبِّکَ فِیۡنَا وَلِیۡدًا وَّلَبِثۡتَ فِیۡنَا مِنۡ عُمُرِکَ سِنِیۡنَ
“সে বলিল, ‘আমরা কি তোমাকে শৈশবকালে আমাদের মধ্যে লালনপালন করি নাই? এবং অবশ্য তুমি তোমার জীবনের বহু বৎসর আমাদের মধ্যে অবস্থান করিয়াছ;”
সূরা আশ-শুআরা ২৬:১৯
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২৬:১৮।

রাজপ্রাসাদে বেড়ে ওঠা সেই শিশুকেই আল্লাহ পরে নবী বানালেন। তাহলে বাড়িতে কয়েকজন শিক্ষকের কাছে প্রাথমিক পড়াশোনা করা কোনো আপত্তির বিষয় হতে পারে না। আসল প্রশ্ন হলো দ্বীনের জ্ঞান কোথা থেকে এসেছে, আর সেখানে তাঁর দাবি স্পষ্ট।

তাঁর আরবী জ্ঞান কি ওই শিক্ষকদের কাছ থেকেই আসেনি?

এটি যাচাই করার সহজ উপায় আছে। দশ বছর বয়সে কয়েকটি সরফের বই আর নাহুর কিছু নিয়ম পড়া একজন বালক পরে কী লিখেছেন, তা দেখুন।

পাঞ্জাবের যে গ্রামে আরবী কথ্য ভাষা ছিল না, সেখান থেকে তিনি আরবী ভাষায় অনেকগুলো বই লিখেছেন, যেমন ই‘জাযুল মসীহ, খুতবা ইলহামিয়া, নূরুল হক। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তাঁকে আরবী ভাষার চল্লিশ হাজার মূল শব্দের জ্ঞান দিয়েছেন। ই‘জাযুল মসীহ নামের আরবী তফসীর লিখে তিনি আরব-অনারব সব আলেমকে এর সমতুল্য কিছু লেখার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

প্রাথমিক ব্যাকরণ শেখানো কোনো ঘরোয়া মৌলভীর কাছ থেকে এমন জ্ঞান আসে না। যদি আসত, তাহলে সেই শিক্ষকদের নিজেদেরই এমন বই থাকত। তাই এই জ্ঞানের উৎস নিয়ে তাঁর দাবিই বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছে।

দুটি লেখা আসলে একই সত্যের দুই দিক। কিতাবুল বারিয়্যা সততার সাথে জানায় শৈশবে কে কী পড়িয়েছিলেন। আইয়ামুস সুলেহ জানায়, দ্বীনের জ্ঞানের উৎস কোনো মানুষ ছিল না। যিনি নিজের শিক্ষকদের নাম নিজেই লিখে প্রকাশ করেন, তিনি কিছু লুকাতে চাইছেন, এমন বলার সুযোগ নেই।

সংক্ষেপে

  1. কিতাবুল বারিয়্যা-য় তিনি নিজেই শৈশব ও কৈশোরের তিন ঘরোয়া শিক্ষকের নাম লিখেছেন।
  2. তাঁদের কাছে তিনি পড়েছেন কুরআন পড়া, ফারসি, আরবী ব্যাকরণ, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন; তফসীর বা হাদীস কোনো মুফাসসির-মুহাদ্দিসের কাছে নয়।
  3. আইয়ামুস সুলেহ-র কথাটি দ্বীনের জ্ঞান নিয়ে, যা “মাহদী” নামের অর্থের সাথে যুক্ত।
  4. তাই দুটি লেখায় কোনো বৈপরীত্য নেই; দুটিই সত্য।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.