মহানবী (সা.) কি বলেছেন, ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নামবেন?

হাদীসটি সত্য, সহীহ বুখারী আর মুসলিমে আছে। কিন্তু তাতে “আকাশ” শব্দটি কোথায়? আর “ইবনে মরিয়ম” বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

চৌদ্দশ বছর আগে মহানবী (সা.) তাঁর সাহাবীদের (রা.) বহু শতাব্দী পরের এক যুগের খবর দিয়েছিলেন। সেই সব ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে একটি ছিল প্রশ্নের আকারে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) সেটি মনে রেখে বর্ণনা করেছেন:

كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا نَزَلَ ابْنُ مَرْيَمَ فِيكُمْ وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ
“তোমাদের অবস্থা তখন কেমন হবে, যখন ইবনে মরিয়ম তোমাদের মাঝে নাযিল হবেন, আর তোমাদের ইমাম হবেন তোমাদেরই মধ্য থেকে?”
সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, বাব নুযূলি ঈসা ইবনে মারইয়াম, হাদীস ৩৪৪৯; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস ১৫৫

হাদীসটি সহীহ, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আহমদী মুসলমানরা এটি পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে মানেন। প্রশ্ন শুধু এর অর্থ নিয়ে। অনেকে বলেন, এই হাদীস প্রমাণ করে যে ঈসা (আ.) আকাশে জীবিত আছেন, আর সেখান থেকে নেমে আসবেন। চলুন হাদীসের শব্দগুলো মন দিয়ে দেখি।

“আকাশ” শব্দটি কোথায়?

হাদীসটি আবার পড়ুন। “ইবনে মরিয়ম তোমাদের মাঝে নাযিল হবেন।” কোথা থেকে? হাদীস তা বলেনি। “আকাশ থেকে” (মিনাস সামা) কথাটি এখানে নেই।

প্রথম কথা হলো, হাদীসে “আকাশ থেকে” শব্দটি উল্লেখই নেই। “আকাশ থেকে নামবেন” কথাটি পরবর্তীকালে মানুষের মুখে মুখে যুক্ত হয়েছে, মহানবী (সা.)-এর মুখ থেকে নয়।

তাহলে বাকি থাকে দুটি শব্দ, যা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়: “নাযিল” আর “ইবনে মরিয়ম”।

“নাযিল” মানে কি আকাশ থেকে পড়া?

আরবিতে “নাযালা” মানে নামা, অবতীর্ণ হওয়া, আবার কোথাও এসে থামা বা অবস্থান নেওয়াও। কুরআনে এই শব্দ এমন অনেক কিছুর জন্য ব্যবহার হয়েছে, যা আকাশ থেকে টুপ করে পড়েনি। স্বয়ং মহানবী (সা.)-এর আগমন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:

قَدۡ اَنۡزَلَ اللّٰہُ اِلَیۡکُمۡ ذِکۡرًا رَّسُوۡلًا یَّتۡلُوۡا عَلَیۡکُمۡ اٰیٰتِ اللّٰہِ
“…আল্লাহ্ নিশ্চয় তোমাদের প্রতি নাযেল করিয়াছেন এক স্মারক- এক রসূল, যে তোমাদের নিকট আল্লাহ্‌র সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করে…”
সূরা আত-তালাক ৬৫:১১-১২
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ৬৫:১০-১১।

মহানবী (সা.) মক্কায় মা আমিনার কোলে জন্মেছিলেন। কেউ বলেন না তিনি আকাশ থেকে নেমেছিলেন। অথচ কুরআন তাঁর জন্যই “নাযিল” শব্দ ব্যবহার করেছে। কারণ আল্লাহর পক্ষ থেকে যা আসে, সম্মান বোঝাতে তাকে “নাযিল” বলা হয়। এই শব্দের আরও উদাহরণ নিয়ে এই সাইটে আলাদা একটি লেখা আছে।

✦

“ইবনে মরিয়ম” কে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটাই। যেহেতু কুরআন স্পষ্ট বলেছে ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন, আর মৃতরা পৃথিবীতে ফিরে আসেন না, তাই হাদীসের “ইবনে মরিয়ম” একজন নতুন ব্যক্তি, যিনি ঈসা (আ.)-এর গুণ আর দায়িত্ব নিয়ে আসবেন।

হাদীসের শেষ অংশটিই এর ইঙ্গিত দেয়: “তোমাদের ইমাম হবেন তোমাদেরই মধ্য থেকে।” যিনি আসবেন, তিনি এই উম্মতেরই একজন।

সহীহ বুখারীতে আরেকটি সূক্ষ্ম প্রমাণ আছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, তিনি ঈসা, মূসা ও ইবরাহীম (আ.)-কে দেখেছেন, আর ঈসা (আ.)-এর বর্ণনা দিয়েছেন: লালচে বর্ণের, কোঁকড়ানো চুল, চওড়া বুক (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৩৮)। আবার এক স্বপ্নে কাবা তাওয়াফের সময় তিনি যে “ইবনে মরিয়ম”-কে দেখেছেন, যার পরপরই দাজ্জালকেও দেখেছেন, তাঁর বর্ণনা ভিন্ন: বাদামি বর্ণের, সোজা চুল (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৪১)। এই পার্থক্য থেকে বোঝা যায়, মহানবী (সা.) নিজেই আগামী ঈসার দৈহিক বৈশিষ্ট্য অতীতের ঈসা ইবনে মরিয়ম থেকে ভিন্ন বলে বর্ণনা করেছেন। দুজন আলাদা মানুষ।

একজনের নামে আরেকজনকে ডাকা আরবি ভাষার পরিচিত রীতি। সহীহ বুখারী থেকে এর উদাহরণ আছে: রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবার থেকে বেরিয়ে আবু সুফিয়ান মহানবী (সা.)-কে বলেছিলেন “ইবনে আবী কাবশা” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৭)। মহানবী (সা.) আবু কাবশার ছেলে ছিলেন না। আবু সুফিয়ান এই নাম দিয়েছিলেন একটি সাদৃশ্যের কারণে। আমরাও তো দানশীল মানুষকে বলি “হাতেম তাঈ”। এতে কেউ ভাবে না, সেই প্রাচীন হাতেম কবর থেকে উঠে এসেছেন।

প্রসিদ্ধ সূফী বুযুর্গ মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবী (রহ.)-এর একটি বক্তব্যও তফসীরে আরাইসুল বায়ান (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬২)-এর বরাতে উদ্ধৃত হয়েছে: শেষ যুগে তাঁর অবতরণ হবে ভিন্ন দেহে।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

মহানবী (সা.) তো স্পষ্ট নাম ধরে “ইবনে মরিয়ম” বলেছেন। রূপক অর্থ নেওয়ার দরকার কী?

দরকারটা তৈরি করেছে কুরআন নিজেই। কুরআন বলেছে, ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মুখ দিয়েই কিয়ামতের দিন বলা হবে: “যখন তুমি আমাকে মৃত্যু দিলে” (সূরা আল-মায়েদা ৫:১১৮)। মহানবী (সা.)-এর কথা কখনো কুরআনের বিপরীত হতে পারে না। তাই দুটোকে মেলালে একটাই অর্থ দাঁড়ায়: ভবিষ্যতের “ইবনে মরিয়ম” এই উম্মতের একজন, যিনি ঈসা (আ.)-এর গুণে গুণান্বিত। কুরআনও মরিয়মপুত্রের উল্লেখকে বলেছে “দৃষ্টান্ত স্বরূপ” (সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৫৮)। আর ভবিষ্যদ্বাণীতে রূপকের ব্যবহার কুরআন-হাদীসের পরিচিত রীতি।

আকাশ থেকে না নামলে “নাযিল” শব্দ কেন বলা হলো? “আসবেন” বললেই তো হতো।

কারণ “নাযিল” শব্দটি সম্মান আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আসার ভাব বহন করে। এর ব্যাখ্যা হলো, মসীহের আগমনের জন্য এই শব্দ তাঁর গুরুত্ব, বরকত আর আধ্যাত্মিক মর্যাদা বোঝায়; আকাশ থেকে দেহসহ পড়া নয়। মহানবী (সা.), লোহা, গৃহপালিত পশু, পোশাক, সবকিছুর জন্যই কুরআনে এই শব্দ এসেছে। যিনি আল্লাহর প্রেরিত, তিনি “নাযিল” হন, যদিও তাঁর জন্ম হয় এই পৃথিবীরই কোনো ঘরে।

তাহলে প্রতিশ্রুত “ইবনে মরিয়ম” কে?

প্রতিশ্রুত ইমামকে মহানবী (সা.) “ইবনে মরিয়ম” বলেছেন, কারণ তিনি হবেন এই উম্মতের মসীহ। মসীহ নাম আর মসীহের দায়িত্ব নিয়েই তিনি আসবেন। আহমদীয়া মুসলিম জামাত বিশ্বাস করে, এই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (আ.)-এর মাধ্যমে, যিনি এই উম্মতের মধ্য থেকেই এসেছেন এবং প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী হওয়ার দাবি করেছেন। হাদীসের শব্দ “তোমাদের ইমাম তোমাদেরই মধ্য থেকে” এই কথার সাথেই পুরোপুরি মেলে।

সংক্ষেপে

  1. বুখারী (৩৪৪৯) ও মুসলিম (১৫৫)-এর হাদীসে “আকাশ থেকে” কথাটি নেই।
  2. “নাযিল” শব্দ কুরআনে মহানবী (সা.)-এর আগমনের জন্যও এসেছে; এর মানে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা।
  3. “তোমাদের ইমাম তোমাদেরই মধ্য থেকে”: আগমনকারী এই উম্মতের একজন।
  4. বুখারীতেই অতীতের ঈসা (আ.) আর আগামী ইবনে মরিয়মের দৈহিক বর্ণনা ভিন্ন; তাই “ইবনে মরিয়ম” একটি উপাধি, যা ঈসা (আ.)-এর গুণে আসা একজনকে বোঝায়।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.