২ নভেম্বর ১৯০৪। শিয়ালকোট শহর। বিশাল এক সমাবেশে মুসলমানদের পাশাপাশি বসেছেন অনেক হিন্দু ও আর্য সমাজের সদস্য। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর লেখা বক্তৃতাটি পড়ে শোনানো হচ্ছে। শেষের দিকে এল এমন একটি ঘোষণা, যা শুনে অনেকে চমকে উঠলেন।
তিনি বললেন, তাঁর আগমন শুধু মুসলমানদের সংস্কারের জন্য নয়; মুসলমান, খ্রিস্টান ও হিন্দু তিন ধর্মের মানুষের সংস্কারের জন্য। আর আল্লাহ তাঁকে জানিয়েছেন, মুসলমান ও খ্রিস্টানদের জন্য তিনি প্রতিশ্রুত মসীহ, আর হিন্দুদের জন্য তিনি কৃষ্ণ।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, কৃষ্ণ হিন্দুদের একজন দেবতা। একজন মুসলমান নিজেকে কৃষ্ণ বললে তিনি শিরকের দরজা খুলে দেন, আর এটি প্রমাণ করে তাঁর দাবি ইসলামের বাইরে।
মজার বিষয়, তিনি নিজেই এই আপত্তির কথা আগেই বলে গেছেন। একই বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, আমি জানি অজ্ঞ মুসলমানরা এটি শুনেই বলবে যে আমি একজন কাফেরের নাম নিয়ে প্রকাশ্যে কুফর গ্রহণ করেছি; কিন্তু এটি আল্লাহর ওহী, আর তা প্রকাশ না করে আমার উপায় নেই। (লেকচার শিয়ালকোট, ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৩৯)
তিনি কৃষ্ণকে কী মনে করতেন
আপত্তির মূল প্রশ্ন এটিই। তিনি কি কৃষ্ণকে খোদা বা দেবতা মনে করতেন? তাঁর নিজের কথা:
“আমার কাছে যা প্রকাশ করা হয়েছে, সে অনুযায়ী রাজা কৃষ্ণ এমন একজন সত্যিকারের মহান মানুষ ছিলেন, হিন্দুদের ঋষি ও অবতারদের মধ্যে যাঁর তুলনা পাওয়া কঠিন। তিনি তাঁর যুগের অবতার, অর্থাৎ নবী ছিলেন, যাঁর ওপর আল্লাহর কাছ থেকে রূহুল কুদুস নাযিল হতো।” (লেকচার শিয়ালকোট, পৃষ্ঠা ৩৯)
তিনি আরও বলেছেন, কৃষ্ণ আর্যদের দেশকে পাপ থেকে পবিত্র করেছিলেন; তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেমে পূর্ণ, পুণ্যের বন্ধু আর মন্দের শত্রু; আর তাঁর শিক্ষা পরে নানাভাবে বিকৃত হয়েছে। (লেকচার শিয়ালকোট, পৃষ্ঠা ৩৯–৪০)
অর্থাৎ তাঁর চোখে কৃষ্ণ খোদা নন, খোদার অবতারও নন হিন্দু অর্থে; তিনি একজন নবী, আল্লাহর এক বান্দা, যাঁর আসল শিক্ষা কালের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। জীবনের শেষ বই পয়গামে সুলেহ-তেও তিনি লিখেছেন, কৃষ্ণের অনুসারীদের কেউ কেউ তাঁকে খোদা মনে করে, কিন্তু নিঃসন্দেহে তিনি তাঁর যুগে আল্লাহর একজন রসূল ও প্রতিনিধি ছিলেন, এবং আল্লাহ তাঁর সাথে কথা বলেছেন। (Message of Peace, ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১৩)
কুরআন বলে: প্রত্যেক জাতির কাছে সতর্ককারী এসেছেন
একজন মুসলমান কীভাবে ভারতবর্ষের প্রাচীন কোনো ব্যক্তিকে নবী মনে করতে পারেন? উত্তর দিয়েছে কুরআন নিজে:
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) পয়গামে সুলেহ-তে ঠিক এই আয়াতটি উদ্ধৃত করে লিখেছেন, আল্লাহ কোনো জাতি বা কোনো দেশকে অবহেলা করেননি; যেমন তিনি প্রত্যেক দেশের মানুষের শারীরিক প্রয়োজন মেটান, তেমনি প্রত্যেক জাতিকে আধ্যাত্মিক লালনপালনও দিয়েছেন। (Message of Peace, পৃষ্ঠা ৯)
কুরআন আরও বলে, কিছু রসূলের কাহিনি মহানবী (সা.)-কে শোনানো হয়েছে, আর কিছু রসূলের কথা শোনানো হয়নি:
তাহলে কোটি কোটি মানুষের এই উপমহাদেশে হাজার বছর ধরে কোনো নবী আসেননি, এমন ধারণাই বরং কুরআনের সাথে মেলে না।
“আমিই কৃষ্ণ” কথাটির অর্থ
তিনি দাবি করেননি যে কৃষ্ণ আবার জন্ম নিয়েছেন। হিন্দু বিশ্বাসে পুনর্জন্মের যে ধারণা আছে, তিনি নিজেই সেই বক্তৃতায় আর্যদের সেই মতের ভুল ধরেছেন। তাঁর দাবির ধরন ছিল বুরুযি, অর্থাৎ গুণ ও আধ্যাত্মিক রূপে প্রতিফলন। ঠিক যেমন তিনি বলেছেন, তিনি “মসীহ ইবনে মরিয়মের রূহে” এসেছেন, ঈসা (আ.) নিজে সশরীরে ফিরে আসেননি।
তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ছিল শেষ যুগে কৃষ্ণের রূপে একজন অবতার আসবেন, আর সেই প্রতিশ্রুতি তাঁর আগমনে পূর্ণ হয়েছে। কৃষ্ণের যে গুণগুলো বলা হয়, যেমন পাপের বিনাশকারী, দুঃখীদের সান্ত্বনাদাতা, গরিবের পালনকারী, সেগুলো প্রতিশ্রুত মসীহেরও গুণ। “আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে কৃষ্ণ আর প্রতিশ্রুত মসীহ একই; শুধু অঞ্চলভেদে পরিভাষা আলাদা।” (লেকচার শিয়ালকোট, পৃষ্ঠা ৪০)
এবং “কৃষ্ণ হিসেবে” প্রথম যে কাজটি তিনি করলেন, তা হলো আর্যদের তাওহীদের দিকে ডাকা: আত্মা ও বস্তুকণা অনাদি-অসৃষ্ট, এই মত ভুল; পরমেশ্বর ছাড়া কিছুই অসৃষ্ট নয়। (লেকচার শিয়ালকোট, পৃষ্ঠা ৪০–৪১) অর্থাৎ হিন্দুদের তাদের নিজেদের ভাষায় এক আল্লাহর দিকে আহ্বান।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
হিন্দু গ্রন্থে কৃষ্ণ সম্পর্কে যে কাহিনিগুলো আছে, সেগুলোর কী হবে?
এখানে কেউ কেউ কৃষ্ণ-সম্পর্কিত লোককাহিনি তুলে আপত্তি করেন। চলুন দেখি। তিনি নিজেই বলেছেন, কৃষ্ণের শিক্ষা পরে নানাভাবে বিকৃত করা হয়েছে। মুসলমানরা মূসা (আ.) ও দাউদ (আ.)-কে নবী মানেন, যদিও বাইবেলে তাঁদের নামে এমন অনেক কাহিনি আছে, যা নবীর মর্যাদার সাথে মেলে না। আমরা সেই কাহিনিগুলো প্রত্যাখ্যান করি, নবীদের নয়। কৃষ্ণের ক্ষেত্রেও একই নীতি: বিকৃত কাহিনি বাদ, আল্লাহর বান্দা হিসেবে আসল মানুষটি মর্যাদার যোগ্য।
কুরআনে তো কৃষ্ণের নাম নেই; তাহলে তাঁকে নবী বলার প্রমাণ কী?
কুরআনে বহু নবীর নামই নেই, এবং কুরআন নিজেই বলেছে কিছু রসূলের কাহিনি বর্ণনা করা হয়নি (সূরা আন-নিসা ৪:১৬৫)। কোনো ব্যক্তিকে নবী বলে নিশ্চিত করার জন্য আল্লাহর জানানো জ্ঞান লাগে। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) স্পষ্ট বলেছেন, এটি তাঁর অনুমান নয়, আল্লাহর ওহীর মাধ্যমে তাঁকে জানানো হয়েছে। তাঁর একটি ইলহাম ছিল: “হে কৃষ্ণ রুদ্র গোপাল, তোমার মহিমা গীতায় লেখা আছে।” (লেকচার শিয়ালকোট, পৃষ্ঠা ৪০) সাধারণ মুসলমানের জন্য অন্তত এটুকু তো পরিষ্কার: কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী ভারতবর্ষেও আল্লাহর সতর্ককারী এসেছিলেন।
একজন মুসলমান সংস্কারকের হিন্দুদের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন কী?
মহানবী (সা.) সমগ্র মানবজাতির জন্য এসেছেন। তাঁর অনুসারী হিসেবে যিনি শেষ যুগে ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য এসেছেন, তাঁর কাজ শুধু মুসলমানদের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে না। খ্রিস্টানদের কাছে তিনি তাদের প্রতীক্ষিত মসীহ রূপে এলেন, হিন্দুদের কাছে তাদের প্রতীক্ষিত অবতার রূপে, আর উভয়কে ডাকলেন একই দিকে: এক আল্লাহ আর মহানবী (সা.)-এর শিক্ষার দিকে।
সংক্ষেপে
- ২ নভেম্বর ১৯০৪-এর লেকচার শিয়ালকোটে তিনি বলেন, মুসলমান ও খ্রিস্টানদের জন্য তিনি প্রতিশ্রুত মসীহ, হিন্দুদের জন্য কৃষ্ণ; এটি ছিল বুরুযি বা প্রতিফলনমূলক দাবি।
- তিনি কৃষ্ণকে খোদা নয়, তাঁর যুগের একজন নবী মনে করতেন, যাঁর শিক্ষা পরে বিকৃত হয়েছে।
- কুরআন বলে, এমন কোনো জাতি নেই যার কাছে সতর্ককারী আসেননি (৩৫:২৫), এবং অনেক রসূলের কাহিনি বর্ণনা করা হয়নি (৪:১৬৫)।
- “কৃষ্ণ হিসেবে” তাঁর প্রথম বার্তাই ছিল তাওহীদ: পরমেশ্বর ছাড়া কিছুই অনাদি নয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Lecture Sialkot, English PDF · alislam.org
- Message of Peace (Paigham-e-Sulh), English PDF · alislam.org
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.