আহমদীয়া খিলাফত: “দ্বিতীয় কুদরত”-এর একশো বছরের বেশি পথচলা

১৯০৫ সালে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছিলেন, তাঁর পরে আল্লাহ “দ্বিতীয় কুদরত” দেখাবেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। সেই প্রতিশ্রুতি থেকে আজকের খিলাফত পর্যন্ত: খলীফা কারা, কীভাবে নির্বাচিত হন, আর আহমদী মুসলমানরা কেন খিলাফত মানেন।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

হিজরি ১১ সাল। মদীনায় খবর ছড়িয়ে পড়ল, মহানবী (সা.) ইন্তেকাল করেছেন। সাহাবীরা দিশেহারা। হযরত উমর (রা.)-এর মতো দৃঢ় মানুষও মেনে নিতে পারছিলেন না। এমন সময় হযরত আবু বকর (রা.) এসে দাঁড়ালেন, আর আল্লাহর এক বান্দার হাতে উম্মত আবার এক হলো।

প্রায় তেরো শতাব্দী পর হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর অনুসারীদের ঠিক এই দৃশ্যটির কথা মনে করিয়ে দিলেন। তিনি জানতেন তাঁর বিদায় ঘনিয়ে আসছে, আর তিনি চেয়েছিলেন তাঁর জামাত যেন সেদিন ভেঙে না পড়ে।

“দ্বিতীয় কুদরত”-এর প্রতিশ্রুতি

১৯০৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত আল-ওসীয়্যত পুস্তিকায় তিনি লিখলেন, আল্লাহর চিরন্তন রীতি হলো তিনি দুটি কুদরত বা শক্তির প্রকাশ দেখান। প্রথমটি নবীর মাধ্যমে; আর নবীর মৃত্যুর পর যখন বিরোধীরা ভাবে সব শেষ, তখন আল্লাহ দ্বিতীয়বার তাঁর শক্তি দেখান, যেমন হযরত আবু বকর (রা.)-এর মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন। তারপর তিনি লিখলেন:

“তোমাদের জন্য দ্বিতীয় কুদরতও দেখা জরুরি, আর তার আগমন তোমাদের জন্য উত্তম, কারণ তা চিরস্থায়ী, যার ধারা কিয়ামত পর্যন্ত ছিন্ন হবে না। আর আমি না গেলে সেই দ্বিতীয় কুদরত আসতে পারে না।” (আল-ওসীয়্যত; ইংরেজি অনুবাদ The Will, ২০২৩ সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৭)

তিনি আরও লিখলেন, আমার পরে আরও কিছু ব্যক্তি থাকবেন, যাঁরা দ্বিতীয় কুদরতের প্রকাশ হবেন; আর জামাতের পবিত্রাত্মা নেককার লোকেরা আমার নামে বয়আত নেবেন। পাদটীকায় পদ্ধতিটিও বলে দিলেন: এমন ব্যক্তি মুমিনদের মতৈক্যে নির্বাচিত হবেন। (The Will, পৃষ্ঠা ৮)

কুরআনের প্রতিশ্রুতি

খিলাফতের ভিত্তি একটি আয়াত, যাকে বলা হয় “আয়াতে ইস্তিখলাফ”:

وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَیَسۡتَخۡلِفَنَّہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ کَمَا اسۡتَخۡلَفَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ ۪ وَلَیُمَکِّنَنَّ لَہُمۡ دِیۡنَہُمُ الَّذِی ارۡتَضٰی لَہُمۡ وَلَیُبَدِّلَنَّہُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ خَوۡفِہِمۡ اَمۡنًا ؕ یَعۡبُدُوۡنَنِیۡ لَا یُشۡرِکُوۡنَ بِیۡ شَیۡئًا
“তোমাদের মধ্য হইতে যাহারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাহাদের সঙ্গে ওয়াদা করিয়াছেন যে, তিনি অবশ্যই তাহাদিগকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করিবেন যেভাবে তিনি তাহাদের পূর্ববর্তীগণকে খলীফা নিযুক্ত করিয়াছিলেন; এবং অবশ্যই তিনি তাহাদের জন্য তাহাদের দীনকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করিয়া দিবেন যাহাকে তিনি তাহাদের জন্য মনোনীত করিয়াছেন, এবং তাহাদের ভয়-ভীতির অবস্থার পর উহাকে তিনি তাহাদের জন্য নিরাপত্তায় পরিবর্তন করিয়া দিবেন; তাহারা আমার ইবাদত করিবে, আমার সঙ্গে কোন কিছুকেই শরীক করিবে না।…”
সূরা আন-নূর ২৪:৫৬
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২৪:৫৫।

আয়াতটিতে তিনটি বিষয় লক্ষ করুন। খিলাফত আল্লাহর একটি ওয়াদা, মানুষের রাজনৈতিক প্রকল্প নয়। এটি দেওয়া হয় ঈমান ও সৎকর্মের শর্তে। আর এর লক্ষণ: দীন সুদৃঢ় হয়, ভয় নিরাপত্তায় বদলায়, আর মানুষ শিরকমুক্ত ইবাদতে লেগে থাকে। আল-ওসীয়্যত-এও হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) এই আয়াতের অংশ উদ্ধৃত করে হযরত আবু বকর (রা.)-এর ঘটনার সাথে মিলিয়েছেন। (The Will, পৃষ্ঠা ৬)

মহানবী (সা.)-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণীও এখানে প্রাসঙ্গিক। হযরত হুযায়ফা (রা.)-এর বর্ণনায় তিনি উম্মতের যুগগুলোর কথা বলেছেন: নবুওয়ত, তারপর নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত, তারপর কঠোর রাজতন্ত্র, তারপর জবরদস্তির শাসন, এবং শেষে:

ثم تكون خلافة على منهاج النبوة، ثم سكت
“তারপর আবার নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত হবে। এরপর তিনি নীরব হলেন।”
মুসনাদে আহমদ, হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা.)-এর বর্ণনা
✦

পাঁচজন খলীফা

১৯০৮ সালের ২৬ মে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ইন্তেকাল করেন। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আহমদীয়া মুসলিম জামাতের নেতৃত্ব দিয়েছেন পাঁচজন খলীফা:

১. হযরত হাকীম মৌলভী নূরুদ্দীন (রা.), খলীফাতুল মসীহ আউয়াল: ২৭ মে ১৯০৮ থেকে ১৩ মার্চ ১৯১৪। প্রসিদ্ধ চিকিৎসক ও আলেম, হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর একনিষ্ঠ সাথী। তাঁর সময়েই প্রথম মুবাল্লিগ ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়, আর খিলাফতের কর্তৃত্ব নিয়ে ওঠা প্রশ্নের মীমাংসা হয়।

২. হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.), খলীফাতুল মসীহ সানী: ১৪ মার্চ ১৯১৪ থেকে ৮ নভেম্বর ১৯৬৫। প্রায় একান্ন বছরের খিলাফতে জামাত একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনে পরিণত হয়। আহমদী মুসলমানরা তাঁকে “মুসলেহ মওউদ”, অর্থাৎ প্রতিশ্রুত পুত্র, বলে বিশ্বাস করেন।

৩. হযরত মির্যা নাসের আহমদ (রাহে.), খলীফাতুল মসীহ সালেস: ৮ নভেম্বর ১৯৬৫ থেকে ৯ জুন ১৯৮২। পশ্চিম আফ্রিকায় স্কুল ও হাসপাতাল গড়ার “নুসরত জাহান” পরিকল্পনা তাঁর সময়ে শুরু হয়। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানে আহমদী মুসলমানদের অমুসলিম ঘোষণার সংকটে তিনি জামাতকে ধৈর্যের পথে রাখেন। “সবার প্রতি ভালোবাসা, কারও প্রতি ঘৃণা নয়” কথাটি তাঁরই।

৪. হযরত মির্যা তাহের আহমদ (রাহে.), খলীফাতুল মসীহ রাবে: ১০ জুন ১৯৮২ থেকে ১৯ এপ্রিল ২০০৩। ১৯৮৪ সালে পাকিস্তানে আহমদী মুসলমানদের ধর্মপালনে নিষেধাজ্ঞা জারির পর তিনি লন্ডনে হিজরত করেন। তাঁর সময়ে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের মাধ্যমে খলীফার কণ্ঠ সারা বিশ্বে একসাথে পৌঁছাতে শুরু করে।

৫. হযরত মির্যা মাসরূর আহমদ (আই.), খলীফাতুল মসীহ খামেস: ২২ এপ্রিল ২০০৩ থেকে বর্তমান। তাঁর নেতৃত্বে জামাত দুইশোর বেশি দেশে বিস্তৃত, আর তিনি বিশ্বের বিভিন্ন পার্লামেন্ট ও মঞ্চে ইসলামের শান্তির বাণী তুলে ধরছেন।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

খিলাফত কি বংশগত হয়ে গেছে?

এখানে কেউ কেউ বলেন, প্রথমজন ছাড়া সব খলীফাই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর বংশধর। চলুন দেখি। খলীফা উত্তরাধিকার সূত্রে হন না; প্রত্যেক খলীফার ইন্তেকালের পর জামাতের একটি নির্বাচনী পরিষদ নতুন খলীফা নির্বাচন করে, আর খলীফা আজীবনের জন্য নির্বাচিত হন। প্রথম খলীফা হযরত নূরুদ্দীন (রা.) পরিবারের কেউ ছিলেন না। তাছাড়া আল-ওসীয়্যত-এর সেই পাদটীকাতেই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) একটি ইলহাম লিখে গেছেন: আল্লাহ তাঁর জামাতের জন্য তাঁর বংশ থেকে একজনকে দাঁড় করাবেন, যাঁকে তিনি তাঁর নৈকট্য ও ওহী দিয়ে সম্মানিত করবেন, আর বহু মানুষ তাঁকে গ্রহণ করবে। (The Will, পৃষ্ঠা ৮, পাদটীকা) নির্বাচনের ফল যদি সেই ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে মিলে যায়, তা বংশপ্রথা নয়।

খিলাফত তো রাষ্ট্র ও রাজনীতির বিষয়; রাষ্ট্রহীন খিলাফত কেমন?

খিলাফতের মূল কাজ আধ্যাত্মিক: দীনকে সুদৃঢ় করা, উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, আর মানুষকে শিরকমুক্ত ইবাদতের দিকে ডাকা, যেমন আয়াতে ইস্তিখলাফ বলে। খুলাফায়ে রাশেদীনের হাতে রাষ্ট্রও ছিল, কিন্তু তাঁদের মর্যাদা রাষ্ট্রের কারণে নয়, তাকওয়া ও নবুওয়তের পদ্ধতি অনুসরণের কারণে। আহমদীয়া খিলাফতের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই; আহমদী মুসলমানরা যে দেশে থাকেন, সেই দেশের আইন মেনে চলেন।

মুসলমানরা তো খিলাফতের জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন; তাহলে খিলাফত আসে কীভাবে?

১৯২৪ সালে উসমানী খিলাফতের অবসান হয়। তার আগে-পরে উপমহাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে খিলাফত ফিরিয়ে আনার আন্দোলন হয়েছে, সম্মেলন হয়েছে, কিন্তু খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আয়াতে ইস্তিখলাফে আল্লাহ বলেছেন, “তিনি” খলীফা বানাবেন; খিলাফত মানুষের ভোট বা শক্তিতে তৈরি হয় না, আল্লাহর ওয়াদায় আসে। আর ওয়াদাটি তাঁদের জন্য, যাঁরা ঈমান আনেন ও সৎকর্ম করেন। আহমদী মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, প্রতিশ্রুত মসীহকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই সেই শর্ত পূর্ণ হয়েছে, আর ১৯০৮ সাল থেকে একটানা চলা খিলাফত সেই ওয়াদার সাক্ষী।

সংক্ষেপে

  1. আল-ওসীয়্যত (১৯০৫)-এ হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) “দ্বিতীয় কুদরত”-এর প্রতিশ্রুতি দেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে এবং মুমিনদের মতৈক্যে নির্বাচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে।
  2. খিলাফতের ভিত্তি সূরা আন-নূরের আয়াতে ইস্তিখলাফ (২৪:৫৬): খিলাফত আল্লাহর ওয়াদা, ঈমান ও সৎকর্মের শর্তে।
  3. পাঁচজন খলীফা: হযরত নূরুদ্দীন (রা.) ১৯০৮–১৯১৪, হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.) ১৯১৪–১৯৬৫, হযরত মির্যা নাসের আহমদ (রাহে.) ১৯৬৫–১৯৮২, হযরত মির্যা তাহের আহমদ (রাহে.) ১৯৮২–২০০৩, হযরত মির্যা মাসরূর আহমদ (আই.) ২০০৩ থেকে।
  4. খলীফা নির্বাচিত হন, বংশসূত্রে নন; আহমদীয়া খিলাফত আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক নয়।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.