“টিচি” নামের ফেরেশতা: একটি স্বপ্নের নাম নিয়ে এত হাসাহাসি কেন?

অনেকে ঠাট্টা করে বলেন, ফেরেশতার নাম আবার “টিচি” হয় কীভাবে? অথচ স্বপ্নটি কখন, কেন দেখা হয়েছিল আর নামটির মানে কী, তা জানলে ঠাট্টার জায়গায় একটি নিদর্শন চোখে পড়ে।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

১৯০৫ সালের মার্চ মাস, কাদিয়ান। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে অতিথি আসছেন। তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয় “লঙ্গরখানা” থেকে, অর্থাৎ জামাতের সাধারণ রান্নাঘর থেকে। কিন্তু সেই সময় আয় ছিল খুব কম, অথচ অতিথির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ল। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন।

স্বপ্নটি কী ছিল

তিনি হকীকাতুল ওহী গ্রন্থে এর বর্ণনা দিয়েছেন (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৩৪৫-৩৪৬)। তার ভাবার্থ:

“৫ মার্চ ১৯০৫ তারিখে আমি স্বপ্নে দেখলাম, একজন ব্যক্তি, যাঁকে ফেরেশতা মনে হচ্ছিল, আমার সামনে এলেন এবং অনেক টাকা আমার কোলে ঢেলে দিলেন। আমি তাঁর নাম জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, নাম কিছু নেই। আমি বললাম, তবু কিছু তো নাম হবে। তিনি বললেন, আমার নাম টিচি। পাঞ্জাবি ভাষায় ‘টিচি’ বলা হয় নির্ধারিত সময়কে, অর্থাৎ ঠিক প্রয়োজনের মুহূর্তে যে আসে। তারপর আমার ঘুম ভেঙে গেল।”

এরপর কী হলো, সেটাও তিনি লিখেছেন: ডাকযোগে ও সরাসরি মানুষের হাত দিয়ে এত অর্থ আসতে লাগল যা কল্পনাও করা যায়নি, কয়েক হাজার টাকা। আর তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, কেউ যাচাই করতে চাইলে ৫ মার্চ ১৯০৫ থেকে বছরের শেষ পর্যন্ত ডাকঘরের রেজিস্টার দেখে নিক।

আপত্তিটি কী

বিরোধীরা বলেন, জিবরাঈল, মিকাঈলের মতো ফেরেশতাদের নাম আমরা জানি। “টিচি” আবার কেমন ফেরেশতা? তাঁদের মতে, এটি হাস্যকর এবং বানানো।

✦

নামটি আসলে একটি বার্তা

স্বপ্নের কথোপকথনটি আবার পড়ুন। ফেরেশতা প্রথমে বললেন, “নাম কিছু নেই।” অর্থাৎ এটি কোনো ফেরেশতার স্থায়ী নাম জানানোর ঘটনা নয়। পীড়াপীড়ি করায় তিনি যে নামটি বললেন, তা আসলে তাঁর কাজের বর্ণনা: “টিচি”, ঠিক সময়ে যে আসে। স্বপ্নে নাম অনেক সময় এভাবেই প্রতীক হয়, যার অর্থ ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে।

আর ঘটনাটি মিলেও গেল। ঠিক যখন অতিথিদের খাওয়ানোর অর্থ ফুরিয়ে আসছিল, তখনই সাহায্য এলো। নামটির মানে আর ঘটনার বাস্তবতা একই কথা বলছে: আল্লাহর সাহায্য প্রয়োজনের মুহূর্তে আসে।

“ফেরেশতা” শব্দটির মূল অর্থও এর সাথে মেলে। কুরআন ফেরেশতাদের পরিচয় দিয়েছে “বার্তাবাহক” হিসেবে:

اَلۡحَمۡدُ لِلّٰہِ فَاطِرِ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ جَاعِلِ الۡمَلٰٓئِکَۃِ رُسُلًا
“সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌রই যিনি আকাশসমূহের ও পৃথিবীর আদি-স্রষ্টা এবং ফিরিশ্‌তাগণকে বার্তাবহরূপে নিযুক্তকারী…”
সূরা আল-ফাতির ৩৫:২
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৩৫:১।

ফেরেশতার পরিচয় তার কাজে। এই স্বপ্নে কাজটি ছিল ঠিক সময়ে সাহায্য পৌঁছে দেওয়া, আর নামটি সেই কাজেরই বর্ণনা।

স্বপ্নের ভাষা যে প্রতীকের ভাষা, তা মহানবী (সা.)-এর স্বপ্ন থেকেই শেখা যায়। তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তাঁকে এক পেয়ালা দুধ দেওয়া হলো, তিনি পান করলেন, তারপর বাকিটা হযরত উমর (রা.)-কে দিলেন। সাহাবীরা ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বললেন: “জ্ঞান” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৮২)। স্বপ্নে দুধ ছিল, অর্থ ছিল জ্ঞান। তেমনি এই স্বপ্নে একটি নাম এসেছে, আর তার অর্থ ছিল আল্লাহর সাহায্য ঠিক সময়ে পৌঁছানো। যিনি স্বপ্নের প্রতীককে আক্ষরিক ধরে ঠাট্টা করেন, তিনি আসলে স্বপ্নের ইসলামী ব্যাখ্যারীতিটাই উপেক্ষা করেন।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

ফেরেশতার নাম পাঞ্জাবি ভাষায় কেন?

এখানে কেউ কেউ বলেন, ফেরেশতার নাম তো আরবি হওয়ার কথা। কিন্তু আল্লাহ মানুষের সাথে তার বোধগম্য ভাষাতেই কথা বলেন:

وَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا مِنۡ رَّسُوۡلٍ اِلَّا بِلِسَانِ قَوۡمِہٖ لِیُبَیِّنَ لَہُمۡ
“এবং আমরা প্রত্যেক রসূলকেই তাহার জাতির ভাষায় ওহী (করিয়া) পাঠাইয়াছি, এইজন্য যেন সে তাহাদের নিকট (বিষয়াবলী) স্পষ্ট করিয়া বর্ণনা করিতে পারে…”
সূরা ইবরাহীম ১৪:৫

যিনি স্বপ্ন দেখছেন তিনি পাঞ্জাবের মানুষ, তাঁর চারপাশের মানুষও পাঞ্জাবি বোঝে। স্বপ্নের বার্তাটি তাই এমন শব্দে এলো, যার মানে তিনি ও তাঁর লোকেরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝবেন। এতে হাসির কিছু নেই, এটি আল্লাহর রীতি।

ফেরেশতা কি মানুষের রূপে, অপরিচিত পরিচয়ে আসতে পারেন?

সহীহ বুখারীর বিখ্যাত হাদীসে আছে, একদিন মহানবী (সা.)-এর কাছে একজন মানুষ হেঁটে এসে ঈমান, ইসলাম ও ইহসান সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর সাহাবীরা খুঁজে আর তাঁকে পেলেন না। তখন মহানবী (সা.) বললেন: “ইনি জিবরাঈল, মানুষকে তাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৭৭৭)। সাহাবীরা সেদিন তাঁকে চেনেননি, একজন সাধারণ মানুষ মনে করেছিলেন। ফেরেশতার রূপ ও পরিচয় আল্লাহ যেভাবে চান সেভাবেই প্রকাশ পায়, তা আমাদের প্রত্যাশামতো হতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই।

এটা কি অর্থের প্রতি আগ্রহের প্রমাণ নয়?

দোয়াটি ছিল লঙ্গরখানার জন্য, অর্থাৎ যে অতিথিরা ধর্ম জানতে কাদিয়ানে আসতেন তাঁদের খাওয়ানোর জন্য। মহানবী (সা.)-এর কাছে একবার মুযার গোত্রের একদল অভাবী মানুষ এলে, তাঁদের অবস্থা দেখে তিনি বিচলিত হলেন এবং সাহাবীদের দান করতে উৎসাহিত করলেন (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০১৭)। দ্বীনের কাজে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া আর তা পূর্ণ হওয়া কোনো দোষ নয়, বরং দোয়া কবুলের একটি নিদর্শন। আর সাহায্যটি এমনভাবে এসেছিল যে তিনি সবার সামনে ডাকঘরের নথি যাচাই করার আহ্বান জানাতে পেরেছিলেন।

সংক্ষেপে

  1. ৫ মার্চ ১৯০৫ সালের স্বপ্নটি এসেছিল লঙ্গরখানার অর্থসংকটের সময়, দোয়ার পর (হকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৩৪৫-৩৪৬)।
  2. ফেরেশতা প্রথমে বলেছিলেন “নাম কিছু নেই”; “টিচি” নামটি তাঁর কাজের বর্ণনা: পাঞ্জাবিতে, ঠিক প্রয়োজনের সময়ে যে আসে।
  3. স্বপ্নের পর অপ্রত্যাশিত পরিমাণ অর্থসাহায্য আসে, আর তিনি ডাকঘরের রেজিস্টার দেখে যাচাইয়ের আহ্বান জানান।
  4. কুরআন বলে, আল্লাহ প্রত্যেক রসূলের কাছে তাঁর জাতির ভাষায় বার্তা পাঠান (১৪:৫); ফেরেশতারা বার্তাবাহক (৩৫:২)।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.