হজের দিনগুলোতে কাবার এক কোণে মানুষের ভিড় সবচেয়ে বেশি। সবাই চান হাজরে আসওয়াদ, সেই কালো পাথরটিকে একবার স্পর্শ করতে, চুমু দিতে। যাঁরা কাছে পৌঁছাতে পারেন না, তাঁরা দূর থেকে হাত তুলে ইশারা করেন।
কেন এই পাথরের প্রতি এত ভালোবাসা? প্রশ্নটির উত্তর জানলে একটি আপত্তির উত্তরও সহজ হয়ে যায়।
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেকে হাজরে আসওয়াদ বলে দাবি করেছেন। তাঁদের মতে এটি কাবার পবিত্রতার অবমাননা, আর নিজেকে এমন কিছু বানানো যাকে মানুষ চুমু দেবে।
মূল লেখাটি কী
কথাটি এসেছে আল-ইস্তিফতা নামের আরবি পুস্তিকায়, যা হকীকাতুল ওহী-র পরিশিষ্ট হিসেবে ছাপা হয়েছে (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৬৬৩)। সেখানে তিনি মুসলমানদের সম্বোধন করে লিখছেন, এ যুগে ইসলামের অবস্থা কত করুণ, আর আল্লাহ কেন একজন ইমাম পাঠিয়েছেন। তারপর বলছেন:
“আল্লাহর কসম, এই বিষয়ে আমি অভাবীদের জন্য কাবার মতো, যেমন মক্কায় হাজীদের জন্য কাবা। আর আমিই সেই হাজরে আসওয়াদ, যার জন্য পৃথিবীতে গ্রহণযোগ্যতা রাখা হয়েছে, আর মানুষ যার স্পর্শে বরকত লাভ করে।”
ঠিক পরের বাক্যগুলো পড়লে উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়: “আমি এসেছি মানুষকে তৌহিদ ও নামাযের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে, নানা রকম দুনিয়াবি জিনিস দিতে নয়।”
আর এই অংশের সাথেই তাঁর নিজের একটি পাদটীকা আছে: “এটি আল্লাহ আমার প্রতি যা ওহী করেছেন তার সারাংশ, আর এটি মহানুভব আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রূপক। স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারীরাও বলেছেন, স্বপ্নবিদ্যায় হাজরে আসওয়াদ দ্বারা বোঝানো হয় জ্ঞানী, ফকীহ ও প্রজ্ঞাবান মানুষ।”
প্রসঙ্গটিও মনে রাখা দরকার। ঠিক আগের অংশে তিনি দুঃখ করে লিখছেন, মুসলমানরা দুনিয়ার পেছনে ছুটছে, নামায ছেড়ে দিচ্ছে, আর খ্রিস্টান মিশনারিরা অর্থের লোভ দেখিয়ে মুসলমানদের ধর্মান্তরিত করছে। এই অবস্থায় তিনি মুসলমানদের ডাকছেন: আল্লাহ তোমাদের জন্য একজন ইমাম পাঠিয়েছেন, তাঁর কাছে এসো। কাবা ও হাজরে আসওয়াদের উপমা এসেছে এই আহ্বানের মধ্যেই, যেন মানুষ বোঝে যে এই যুগে আধ্যাত্মিক কল্যাণের কেন্দ্র কোথায়।
অর্থাৎ তিনি নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন: এটি রূপক, আর এর অর্থ এমন একজন মানুষ, যাঁর কাছে এসে মানুষ দ্বীনের জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক বরকত পায়।
হাজরে আসওয়াদের আসল মর্যাদা কোথায়
এবার শুরুর প্রশ্নে ফিরি: মুসলমানরা পাথরটিকে চুমু দেন কেন? হযরত উমর (রা.) নিজেই এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে চুমু দিলেন, তারপর বললেন: “আমি জানি, তুমি একটি পাথর, কোনো ক্ষতিও করতে পার না, উপকারও না। আমি যদি নবী (সা.)-কে তোমাকে চুমু দিতে না দেখতাম, তবে তোমাকে চুমু দিতাম না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৫৯৭)
লক্ষ করুন: পাথরটির নিজের কোনো শক্তি নেই। তার মর্যাদা এসেছে আল্লাহর নির্দেশ আর মহানবী (সা.)-এর আমলের সাথে সম্পর্কের কারণে। মানুষ তাকে স্পর্শ করে আল্লাহর আনুগত্যে, আর তাতে বরকত পায়।
রূপকটির অর্থ এখানেই। আল্লাহ যাঁকে এ যুগে দ্বীনের সংস্কারের জন্য পাঠিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে মানুষ আধ্যাত্মিক কল্যাণ পায়, ঠিক যেমন আল্লাহর নির্দেশে স্থাপিত একটি পাথর স্পর্শ করে হাজীরা বরকত পান। তাঁর নিজের কোনো আলাদা শক্তি আছে, এমন দাবি নয়; দাবি হলো, আল্লাহ তাঁকে বরকতের উৎস বানিয়েছেন, আর তাঁর কাজ মানুষকে তৌহিদ ও নামাযের দিকে ডাকা।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
একজন মানুষকে পাথর বা প্রদীপের সাথে তুলনা করা কি ঠিক?
কুরআন নিজেই মহানবী (সা.)-কে একটি বস্তুর নামে ডেকেছে:
মহানবী (সা.) আক্ষরিক অর্থে কোনো প্রদীপ ছিলেন না। প্রদীপ যেমন আলো দেয়, তিনি তেমনি হেদায়াতের আলো দিয়েছেন। রূপকের ভাষা এভাবেই কাজ করে। “হাজরে আসওয়াদ” শব্দটিও একই রকম: যার কাছে মানুষ বরকতের জন্য আসে।
এতে কি কাবা বা হাজরে আসওয়াদের অবমাননা হয় না?
বাক্যের ভাষাতেই উত্তর আছে: “অভাবীদের জন্য কাবার মতো, যেমন মক্কায় হাজীদের জন্য কাবা।” তুলনা করা হয়েছে, স্থান নেওয়ার কথা বলা হয়নি। মক্কার কাবা মক্কাতেই আছে, হজ সেখানেই হয়। কোনো জিনিসকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করা তার সম্মান, অবমাননা নয়; কারণ মানুষ উপমা দেয় সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ জিনিস দিয়েই।
স্বপ্ন ও ইলহামের ব্যাখ্যা এভাবে প্রতীক দিয়ে করা কি ঠিক?
মহানবী (সা.) বলেছেন, তিনি স্বপ্নে দুধের পেয়ালা পান করলেন, তারপর বাকিটা হযরত উমর (রা.)-কে দিলেন। সাহাবীরা ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বললেন: “জ্ঞান” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৮২)। দুধ মানে জ্ঞান, এটি প্রতীকের ভাষা। কুরআনেও হযরত ইউসুফ (আ.)-এর স্বপ্নে এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্র ছিল তাঁর ভাই ও বাবা-মা (সূরা ইউসুফ ১২:৫, ১২:১০১)। তাই স্বপ্নবিদ্যার আলেমরা যখন বলেন হাজরে আসওয়াদ মানে জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান মানুষ, তা এই পুরোনো ইসলামী রীতিরই অংশ।
সংক্ষেপে
- কথাটি আল-ইস্তিফতা-য় আছে (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৬৬৩), আর সেখানেই পাদটীকায় লেখা: এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে রূপক।
- স্বপ্নবিদ্যায় হাজরে আসওয়াদ মানে জ্ঞানী, ফকীহ ও প্রজ্ঞাবান মানুষ; তিনি নিজেই এ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
- হযরত উমর (রা.) বলেছেন, পাথরটির নিজের কোনো শক্তি নেই; তার মর্যাদা আল্লাহ ও রসূল (সা.)-এর সাথে সম্পর্কের কারণে (বুখারী ১৫৯৭)।
- একই বাক্যে তিনি বলেছেন, তিনি এসেছেন মানুষকে তৌহিদ ও নামাযে প্রতিষ্ঠিত করতে।
- কুরআন মহানবী (সা.)-কে “দীপ্তিমান প্রদীপ” বলেছে; রূপকের ভাষা কুরআনেরই রীতি।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Haqiqatul-Wahi (The Philosophy of Divine Revelation) · alislam.org
- Understanding shirk, and the significance of the Black Stone in Islam · alhakam.org
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.