একজন তরুণী মা, তখনো সন্তান জন্ম দেননি। ফেরেশতারা এসে তাঁকে সুসংবাদ দিলেন: আল্লাহ তোমাকে এক পুত্রের সুখবর দিচ্ছেন, যার নাম হবে মসীহ, ঈসা ইবনে মরিয়ম। তারপর সেই সন্তান সম্পর্কে আরও কিছু কথা:
একজন মায়ের কাছে এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে? তাঁর সন্তান শিশু বয়স থেকে প্রজ্ঞার কথা বলবে, আর পরিণত বয়স পর্যন্ত বেঁচে থেকে মানুষকে পথ দেখাবে।
কিন্তু এই আয়াত থেকেই একটি আপত্তি তোলা হয়। বলা হয়, ঈসা (আ.)-কে মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে আকাশে তুলে নেওয়া হয়েছিল, তিনি প্রৌঢ় বয়সে পৌঁছানোর সুযোগই পাননি। তাই আয়াতের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ করতে তাঁকে আকাশ থেকে ফিরে আসতে হবে, আর তখন তিনি প্রৌঢ় বয়সে মানুষের সাথে কথা বলবেন।
“কাহল” মানে কোন বয়স?
আয়াতে “প্রৌঢ়াবস্থা” বোঝাতে যে আরবি শব্দটি এসেছে, তা হলো কাহল। লেইন ও আকরাবুল মাওয়ারিদ অভিধানের বরাতে এর অর্থ হলো: মধ্যবয়সী মানুষ, যার চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে; অথবা যার বয়স ত্রিশ বা চৌত্রিশ থেকে একান্ন বছরের মধ্যে। ইমাম সা’লাবীর মতে চল্লিশ থেকে একান্ন বছর।
এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। একই তফসীরে বলা হয়েছে, প্রসিদ্ধ আলেম ইবনুল কাইয়্যিম লিখেছেন, কিছু আলেম ত্রিশ বা তেত্রিশ বছর বয়সে ঈসা (আ.)-এর ক্রুশ ও তথাকথিত আকাশে ওঠার ঘটনা অস্বীকার করেছেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, কুরআন অনুযায়ী ঈসা (আ.)-কে “কাহল” বয়সে মানুষের সাথে কথা বলতে হবে।
অর্থাৎ আমাদের আগের যুগের আলেমরাও এই আয়াত থেকে বুঝেছিলেন যে ঈসা (আ.) পৃথিবীতেই পরিণত বয়সে পৌঁছেছিলেন।
সুসংবাদটি আসলে কিসের?
এখানে আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। “কথা বলবে” মানে শুধু কথা বলা নয়। শুধু কথা তো সব শিশু আর সব বড় মানুষই বলে। এখানে বোঝানো হয়েছে প্রজ্ঞার কথা, আল্লাহর পথের কথা।
আর দুটি সময়ের কথা পাশাপাশি বলার মধ্যে একটি ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে: এই সন্তান অল্প বয়সে মারা যাবে না, বরং পরিণত বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। তফসীরের ভাষায়, মরিয়ম (আ.)-কে দেওয়া সুসংবাদ ছিল এই যে, তাঁর পুত্র শুধু বুদ্ধিমান সন্তানই হবে না, বরং আল্লাহর একজন নেক বান্দা হিসেবে পূর্ণ বয়স পর্যন্ত বাঁচবে। শেষ দিকে তিনি মানুষের সাথে কথা বলবেন একজন নবী হিসেবে।
এই সূরার বাইরেও কথাটি আরেকবার এসেছে। সূরা আল-মায়েদায় আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে তাঁর প্রতি দেওয়া নেয়ামতগুলো স্মরণ করিয়ে দেবেন, আর সেখানে বলা হয়েছে: “তুমি দোলনায় ও পৌঢ় বয়সে লোকদের সহিত কথা বলিতে” (সূরা আল-মায়েদা ৫:১১১)। একই তালিকায় আছে তাঁকে কিতাব, হিকমত, তওরাত ও ইন্জীল শেখানো, রোগী আরোগ্য করা, আর বনী ইসরাঈলের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে যাওয়ার কথা। অর্থাৎ প্রৌঢ় বয়সে কথা বলাটি তাঁর বনী ইসরাঈলের মাঝে করা মিশনেরই অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্য কোনো উম্মতের মাঝে ভবিষ্যতে ফিরে এসে নয়।
এখন ভাবুন। যদি সন্তানটি তেত্রিশ বছরে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, আর দুই হাজার বছর পর ফিরে এসে প্রৌঢ় বয়সে কথা বলে, তাহলে কি একজন মায়ের জন্য এটা সুসংবাদ থাকে? মা তো সেই দিন দেখবেন না।
ঈসা (আ.) কত দিন বেঁচেছিলেন?
কানযুল উম্মাল গ্রন্থের বরাতে মহানবী (সা.)-এর একটি বাণী পাওয়া যায়: ঈসা ইবনে মরিয়ম একশো বিশ বছর বেঁচে ছিলেন। বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) তাঁর শেষ অসুস্থতার সময় হযরত ফাতিমা (রা.)-কে এ কথা জানিয়েছিলেন।
আহমদীয়া মুসলিম জামাতের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর “মসীহ হিন্দুস্তান মেঁ” (ভারতে যিশু) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ক্রুশ থেকে প্রাণে বেঁচে ঈসা (আ.) বনী ইসরাঈলের হারানো গোত্রগুলোর খোঁজে পূর্ব দিকে যাত্রা করেন এবং শেষ পর্যন্ত কাশ্মীরে পৌঁছে সেখানেই স্বাভাবিকভাবে ইন্তেকাল করেন। এই দীর্ঘ জীবনেই তিনি পরিণত বয়সে মানুষকে আল্লাহর বাণী শুনিয়েছেন। আয়াতের সুসংবাদ পূর্ণ হয়েছে তাঁর জীবদ্দশাতেই।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
ইতিহাস তো বলে ঈসা (আ.)-এর প্রকাশ্য প্রচার চলেছিল ত্রিশের কোঠায়। তাহলে “কাহল” বয়স পূর্ণ হলো কোথায়?
প্রথমত, অভিধানের একটি সংজ্ঞা অনুযায়ী ত্রিশ বা চৌত্রিশ বছরেই “কাহল” বয়স শুরু হয়। সেই হিসাবে আপত্তিকারীদের ধারণা মেনে নিলেও তিনি “কাহল” বয়সে কিছু সময় কথা বলেছেন; ফিরে আসার প্রয়োজন পড়ে না। দ্বিতীয়ত, তেত্রিশ বছরে আকাশে তুলে নেওয়ার কথা কুরআন বা সহীহ হাদীসে কোথাও নেই। বরং ইবনুল কাইয়্যিমের উল্লেখ করা আলেমরা এই আয়াত দিয়েই সেই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর মহানবী (সা.)-এর বাণী অনুযায়ী তিনি দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন।
আকাশে তাঁর বয়স হয়তো থেমে আছে। ফিরে এসে তিনি সেখান থেকেই শুরু করবেন?
এখানে কেউ কেউ এমন সম্ভাবনার কথা বলেন। কিন্তু কুরআন নবীদের সম্পর্কে বলেছে:
নবীদের দেহ খাবারের মুখাপেক্ষী, আর তাঁদের জীবন সীমিত। দুই হাজার বছর খাবার ছাড়া, বয়স না বেড়ে বেঁচে থাকা মানে এই দুই নিয়মের বাইরে চলে যাওয়া। তাই বলা যায়: জন্মের দুই হাজার বছর পরও ঈসা (আ.)-কে জীবিত বলা মানে তাঁকে মানুষের চেয়ে বেশি কিছু বানিয়ে ফেলা। আল্লাহর নিয়ম বদলায় না।
সংক্ষেপে
- “কাহল” মানে মধ্যবয়স; অভিধানে ত্রিশ বা চৌত্রিশ থেকে একান্ন বছর।
- আয়াতটি মরিয়ম (আ.)-এর জন্য সুসংবাদ: তাঁর পুত্র অল্প বয়সে মারা যাবে না, পরিণত বয়স পর্যন্ত প্রজ্ঞার কথা বলবে।
- ইবনুল কাইয়্যিমের বর্ণনা অনুযায়ী আগের যুগের কিছু আলেমও এই আয়াত দিয়ে তেত্রিশ বছরে আকাশে ওঠার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
- ঈসা (আ.) দীর্ঘ জীবন পেয়েছেন; প্রৌঢ় বয়সে কথা বলার ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর জীবদ্দশাতেই পূর্ণ হয়েছে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Holy Quran 3:47 (with commentary) · alislam.org
- Death of Hazrat Jesus (as) · alislam.org
- Jesus Christ died a natural death · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.