শত শত বছর ধরে হজের পথের ছবিটি ছিল একই রকম। মরুভূমির বুক চিরে চলেছে উটের দীর্ঘ কাফেলা। মক্কা থেকে মদীনা যেতে লাগত অনেক দিন। উট ছাড়া আরবের জীবন কল্পনাই করা যেত না।
এখন কল্পনা করুন, সপ্তম শতাব্দীর আরবে কেউ বলছে: একদিন আসবে যখন এই উটগুলো বেকার পড়ে থাকবে, কেউ আর তাদের পিঠে চড়ে দ্রুত সফর করবে না। শ্রোতারা নিশ্চয়ই অবাক হতো।
অথচ ঠিক এই কথাটিই কুরআন আর হাদীসে আছে।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা তাযকিরাতুশ শাহাদাতাইন গ্রন্থের (রূহানী খাযায়েন, ২০শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫) উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন কুরআন, হাদীস ও পূর্ববর্তী কিতাবে আছে যে এ যুগে একটি নতুন বাহন আবিষ্কৃত হবে যা আগুনে চলবে। তাঁদের প্রশ্ন: কুরআনের কোথায় আগুনে চলা বাহনের কথা আছে? না থাকলে কি এটি কুরআনের নামে ভুল কথা নয়?
উত্তরটি বোঝার জন্য দেখতে হবে, এই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে তিনি নিজে বিস্তারিত কী লিখেছেন।
কুরআন ও হাদীসের ভবিষ্যদ্বাণী
সূরা আত-তাকভীরে শেষ যুগের কয়েকটি লক্ষণ বলা হয়েছে। তার একটি:
দশ মাসের গর্ভবতী উটনী ছিল আরবদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। সেটিও পরিত্যক্ত হবে, অর্থাৎ উটের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে।
সহীহ মুসলিমে, যেখানে ঈসা ইবনে মরিয়মের আগমনের কথা আছে, ঠিক সেখানেই মহানবী (সা.) বলেছেন:
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) চশমায়ে মা‘রেফত গ্রন্থে এই দুটি একসাথে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন, কুরআনে শেষ যুগের যে নতুন অবস্থার খবর আছে, তার একটি হলো উট বেকার হয়ে যাওয়া। আর কোনো বাহন বেকার হয় তখনই, যখন তার ওপর চড়ার প্রয়োজন থাকে না। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, উটের জায়গায় অন্য কোনো বাহন আসবে। হাদীসের “ইউস‘আ” (দৌড়ে চলা) শব্দটি বলছে, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর কাজে উটের চেয়ে ভালো বাহন বের হবে। (রূহানী খাযায়েন, ২৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২০–৩২১)
“আগুন” কথাটি কোথা থেকে?
এবার আসল প্রশ্ন। একই আলোচনায় তিনি লিখেছেন: আল্লাহ যখন এই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ করতে চাইলেন, তখন এক মানুষের হৃদয়ে এই চিন্তা ঢেলে দিলেন যে, সে এমন একটি বাহন আবিষ্কার করুক, যা আগুনের সাহায্যে হাজার হাজার ক্রোশ পথ পৌঁছে দেয়। (রূহানী খাযায়েন, ২৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২২)
অর্থাৎ কুরআন ও হাদীস যে বাহনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, তার বাস্তব রূপ ছিল তাঁর যুগের রেলগাড়ি। আর সে যুগের রেলগাড়ি চলত বাষ্পীয় ইঞ্জিনে, যার ভেতরে কয়লার আগুন জ্বলত। “আগুনে চলা” কথাটি সেই পূর্ণ হওয়া বাস্তবতার বর্ণনা।
হাকীকাতুল ওহী-তেও তিনি মসীহ মওউদের যুগের নিদর্শনের তালিকায় এই কথাটি রেখেছেন: নতুন বাহনের আবির্ভাব, যেমন কুরআনে আছে “ওয়া ইযাল ইশারু উত্তিলাত” আর মুসলিমের হাদীসে আছে “ওয়া লাইউতরাকান্নাল কিলাস”। তিনি লিখেছেন, হজের সময় মক্কা থেকে মদীনা উটনীতে সফর হয়; সেই দিন খুব কাছে যখন এ পথে রেল চালু হবে। (রূহানী খাযায়েন, ২২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৫–২০৬)
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
কুরআনে তো “আগুন” শব্দটি নেই?
এখানে কেউ কেউ বলেন, কুরআনে আগুনে চলা গাড়ির কথা নেই, তাই দাবিটি ভুল। চলুন দেখি। কুরআন যে কথা বলেছে, তা হলো উট পরিত্যক্ত হবে, অর্থাৎ নতুন বাহন আসবে। কুরআন আরও বলেছে, আল্লাহ মানুষের জন্য আরও বাহন সৃষ্টি করবেন:
ঘোড়া, খচ্চর ও গাধার কথা বলার পর কুরআন এ-ও বলেছে, “এবং তিনি আরও এমন কিছু সৃষ্টি করিবেন যাহা তোমরা (এখন) জান না।” (সূরা আন-নাহল ১৬:৯)
নতুন বাহনের মূল ভবিষ্যদ্বাণী কুরআন ও হাদীসের। আর সেই বাহন কীসে চলবে, তার বিবরণ এসেছে ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়ার পর, বাস্তব রেলগাড়ি দেখে। চশমায়ে মা‘রেফত-এ তিনি ঠিক এভাবেই আলাদা করে লিখেছেন। ভবিষ্যদ্বাণী আর তার পূর্ণতার বর্ণনাকে এক করে ফেললেই এই আপত্তি তৈরি হয়।
উট তো আজও আছে, তাহলে ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হলো কীভাবে?
হাদীসের শব্দ লক্ষ করুন: “তাদের পিঠে চড়ে আর কেউ দ্রুত চলবে না।” প্রশ্নটি উট থাকা না থাকার নয়, দূরের সফরে উটের প্রয়োজন থাকা না থাকার। আজ কোনো হাজী উটের কাফেলায় মক্কা থেকে মদীনা যান না। রেল, বাস, গাড়ি আর বিমান সেই জায়গা নিয়েছে। মক্কা ও মদীনার মাঝে এখন দ্রুতগতির রেলপথও চালু আছে। উট আছে, কিন্তু সফরের বাহন হিসেবে তা সত্যিই পরিত্যক্ত।
এটি তো প্রযুক্তির স্বাভাবিক উন্নতি, এতে ভবিষ্যদ্বাণীর কী আছে?
আজ আমাদের কাছে এটি স্বাভাবিক মনে হয়, কারণ আমরা এর পরের যুগে বাস করি। কিন্তু হযরত মসীহ মওউদ (আ.) মনে করিয়ে দিয়েছেন, মহানবী (সা.) তেরোশো বছর আগে এমন একটি জিনিসের খবর দিয়েছেন, যার তখন পৃথিবীতে কোনো অস্তিত্বই ছিল না। কুরআন আল্লাহর বাণী না হলে মানুষের পক্ষে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব ছিল না। (রূহানী খাযায়েন, ২৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২২)
আর লক্ষ করার মতো বিষয়, সহীহ মুসলিমে এই উট পরিত্যক্ত হওয়ার কথা এসেছে ঠিক মসীহ ইবনে মরিয়মের আগমনের বর্ণনার মধ্যে। অর্থাৎ নতুন বাহন সেই যুগের একটি চিহ্ন। যে যুগে রেলগাড়ি এসেছে, সেই যুগেই প্রতিশ্রুত মসীহ হওয়ার দাবিদারও উপস্থিত ছিলেন।
সংক্ষেপে
- সূরা তাকভীর (৮১:৫) ও সহীহ মুসলিমের হাদীস শেষ যুগে উট পরিত্যক্ত হওয়ার, অর্থাৎ নতুন বাহন আসার ভবিষ্যদ্বাণী করেছে।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ব্যাখ্যায় এর বাস্তব রূপ রেলগাড়ি, যা তখন বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আগুনে চলত।
- “আগুনে চলা” কথাটি ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়ার বর্ণনা; তিনি চশমায়ে মা‘রেফত-এ দুটিকে আলাদা করেই লিখেছেন।
- আজ দূরের সফরে উট সত্যিই পরিত্যক্ত; তাই ভবিষ্যদ্বাণীটি স্পষ্টভাবে পূর্ণ হয়েছে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Blessings of Prayers (Friday Sermon, 21 November 2014) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.