প্রচলিত একটি ছবি অনেকের মনে গাঁথা। শেষ যুগে ইমাম মাহদী আসবেন, মুসলমানদের নেতা হবেন। একদিন নামাযের সময় আকাশ থেকে ঈসা (আ.) নেমে আসবেন, আর মাহদীর পেছনে দাঁড়িয়ে নামায পড়বেন।
এই ছবিতে দুজন মানুষ। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর হাদীসগুলো মন দিয়ে পড়লে একটি ভিন্ন ছবি ফুটে ওঠে। সেখানে মসীহ্ আর মাহদী একজনই, শুধু কাজের দিক থেকে দুটি নাম।
“ঈসা ছাড়া কোনো মাহদী নেই”
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) শেষ যুগের অবস্থা বলতে গিয়ে একটি কথা যোগ করেছিলেন:
কথাটি খুব সরল। যিনি ঈসা, তিনিই মাহদী। দুজন আলাদা মানুষ নন।
আরেকটি বর্ণনায় দুটি উপাধি একসাথে একজনের উপরই রাখা হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে বেঁচে থাকবে সে হয়তো ঈসা ইবনে মরিয়মকে পাবে, যিনি হবেন ইমাম মাহদী ও ন্যায়বিচারক মীমাংসাকারী; তিনি ক্রুশ ভাঙবেন, শূকর হত্যা করবেন (মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১১)।
“তোমাদের ইমাম, তোমাদের মধ্য থেকে”
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে একটি প্রসিদ্ধ হাদীস আছে। মহানবী (সা.) বলেছেন:
অনেকে বলেন, এখানে দুজনের কথা: ইবনে মরিয়ম আর আলাদা একজন ইমাম। কিন্তু সহীহ মুসলিমেই এই হাদীসের আরেকটি বর্ণনা আছে, যা প্রশ্নের মীমাংসা করে দেয়:
এখানে ইমামতি করছেন ইবনে মরিয়ম নিজেই। আর তিনি “তোমাদের মধ্য থেকে”, অর্থাৎ মুসলমানদেরই একজন। একই বর্ণনায় বর্ণনাকারী ইবনে আবী যি’ব ব্যাখ্যা করেছেন: তিনি তোমাদের প্রতিপালকের কিতাব আর তোমাদের নবী (সা.)-এর সুন্নত দিয়ে তোমাদের নেতৃত্ব দেবেন।
তাহলে যিনি আসবেন তিনি উম্মতে মুহাম্মদীয়ারই একজন, কুরআন ও সুন্নতের অনুসারী। বাইরে থেকে আসা বনী ইসরাঈলের কোনো নবী নন।
দুই ঈসা, দুই চেহারা
মহানবী (সা.) ঈসা (আ.)-কে দেখেছেন, এমন দুটি বর্ণনা সহীহ বুখারীতে পাশাপাশি আছে। আর দুটির বর্ণনা মেলে না।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনায় মহানবী (সা.) বলেন, তিনি ঈসা, মূসা ও ইবরাহীম (আ.)-কে দেখেছেন; ঈসা (আ.) ছিলেন লালচে বর্ণের, কোঁকড়া চুল, চওড়া বুক (সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৪৩৮)। এখানে তিনি অন্য অতীত নবীদের সাথে আছেন।
কিন্তু হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) কসম খেয়ে বলেছেন, মহানবী (সা.) ঈসাকে লাল বর্ণের বলেননি। তিনি স্বপ্নে নিজেকে কা‘বা তাওয়াফ করতে দেখলেন, আর দেখলেন একজন বাদামি বর্ণের, সোজা চুলের মানুষ; জিজ্ঞেস করলে বলা হলো, ইনি ইবনে মরিয়ম। সেই একই স্বপ্নে তিনি দাজ্জালকেও দেখলেন (সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৪৪১)।
যে স্বপ্নে দাজ্জাল আছে, সেটি শেষ যুগের দৃশ্য। সেখানে দেখা ইবনে মরিয়মের চেহারা আর অতীত নবীদের মাঝে দেখা ঈসা (আ.)-এর চেহারা আলাদা। এ থেকে বোঝা যায়, যিনি আসবেন তিনি পুরনো ঈসা (আ.) নন, তাঁরই গুণ নিয়ে আসা আরেকজন।
কুরআনের একটি আক্ষেপ
কুরআন যেন আগেই জানিয়ে দিয়েছে, এই বিষয়টি নিয়ে মানুষ হৈচৈ করবে:
“দৃষ্টান্ত স্বরূপ” মরিয়মের পুত্র। অর্থাৎ ইবনে মরিয়ম নামটি উপমা হিসেবে আসবে, আর তখন মহানবী (সা.)-এর জাতির অনেকে আপত্তি তুলবে। আজ ঠিক তা-ই দেখা যাচ্ছে।
তাহলে দুটি নাম কেন? আহমদীয়া মুসলিম জামাতের ব্যাখ্যা হলো: খ্রিষ্টান জগতের কাছে ইসলামের আলো পৌঁছানোর দায়িত্বের কারণে তিনি মসীহ্ বা ইবনে মরিয়ম, আর মুসলমানদের হৃদয় খাঁটি ইসলামে আলোকিত করার কারণে তিনি মাহদী। একজন মানুষ, দুটি দায়িত্ব। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) এই দুই দাবিই একসাথে করেছিলেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“ঈসা ছাড়া কোনো মাহদী নেই” হাদীসটি তো দুর্বল?
হ্যাঁ, হাদীস বিশারদদের অনেকে এর সনদকে দুর্বল বলেছেন। কিন্তু দুটি কথা মনে রাখা দরকার। প্রথমত, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) হাকীকাতুল মাহদীতে দেখিয়েছেন, হাদীসটি শুধু ইবনে মাজাহতে নয়, হাকেমের মুসতাদরাকেও আনাস ইবনে মালেক (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এর বক্তব্য একা দাঁড়িয়ে নেই। সহীহ বুখারী বলছে, আগমনকারী ইবনে মরিয়মের সাথে “তোমাদের ইমাম তোমাদের মধ্য থেকে”; সহীহ মুসলিম বলছে, ইবনে মরিয়ম নিজেই “তোমাদের মধ্য থেকে” ইমামতি করবেন। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দুই গ্রন্থের কথা আর ইবনে মাজাহর কথা এক দিকেই নির্দেশ করে। উল্টো দিকে, আলাদা এক যোদ্ধা মাহদীর কাহিনী বুখারী বা মুসলিমে একটিও নেই।
একটি বর্ণনায় তো আছে: শুরুতে আমি, শেষে ঈসা, মাঝে মাহদী?
মিশকাতে আবু নুআয়মের সূত্রে এমন একটি বর্ণনা আছে: যে উম্মতের শুরুতে আমি, শেষে ঈসা ইবনে মরিয়ম আর মাঝখানে মাহদী, সে উম্মত ধ্বংস হতে পারে না। এখানে কিন্তু মাহদীকে রাখা হয়েছে “মাঝখানে”, শেষ যুগে নয়। শেষে আছেন শুধু ইবনে মরিয়ম।
আসলে “মাহদী” শব্দের অর্থ “হেদায়াতপ্রাপ্ত”। মহানবী (সা.) এই শব্দটি গুণবাচক অর্থেও ব্যবহার করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, “তোমরা আমার সুন্নত এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত সঠিক পথের খলীফাদের সুন্নত আঁকড়ে ধরো” (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুস সুন্নাহ, হাদীস ৪৬০৭)। এখানে খলীফারা সবাই “মাহদী”। তাই মাঝখানের মাহদী উম্মতের মাঝের কোনো হেদায়াতপ্রাপ্ত সংস্কারক হতে পারেন; শেষ যুগের প্রতিশ্রুত মাহদী তিনিই, যিনি ইবনে মরিয়ম।
ঈসা (আ.) কি মাহদীর পেছনে নামায পড়বেন না?
এই ছবিটি বহু ওয়াজে শোনা যায়। কিন্তু বুখারী-মুসলিমের হাদীসে এমন কথা নেই। সহীহ মুসলিমের যে বর্ণনা উপরে দেখলাম, সেখানে ইমামতি করছেন ইবনে মরিয়ম নিজেই, আর বর্ণনাকারী ব্যাখ্যা করেছেন, তিনি আল্লাহর কিতাব ও নবী (সা.)-এর সুন্নত দিয়ে নেতৃত্ব দেবেন। নির্ভরযোগ্য বর্ণনা যখন একজনকেই ইমাম বলছে, তখন দুজনের ছবি আঁকার সুযোগ থাকে না।
সংক্ষেপে
- ইবনে মাজাহর হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়েছে: ঈসা ইবনে মরিয়ম ছাড়া কোনো মাহদী নেই।
- সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় ইবনে মরিয়ম নিজেই মুসলমানদের মধ্য থেকে হয়ে ইমামতি করবেন।
- বুখারীতে অতীতের ঈসা (আ.) আর শেষ যুগের ইবনে মরিয়মের চেহারা আলাদা বর্ণিত হয়েছে।
- তাই মসীহ্ ও মাহদী একই ব্যক্তি, উম্মতে মুহাম্মদীয়ার মধ্য থেকে আগত।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Imam Mahdi · alislam.org
- The Advent of the Messiah and Mahdi · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.