প্রতিদিন নামাজে আমরা সূরা ফাতিহা পড়ি। শুরুতে বলি, “সকল প্রশংসা আল্লাহ্রই, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক।” এখানে আল্লাহর কথা বলা হচ্ছে তৃতীয় পুরুষে: “তিনি”। তারপর হঠাৎ বলি, “আমরা তোমারই ইবাদত করি।” এবার আল্লাহকে সরাসরি সম্বোধন: “তুমি”।
একই সূরায়, কয়েক আয়াতের ব্যবধানে, “তিনি” বদলে “তুমি” হয়ে গেল। এতে কারো মনে বিভ্রান্তি জাগে না। আরবি ভাষার এই সৌন্দর্যকে বলে ইলতিফাত, অর্থাৎ সর্বনামের মোড় ঘোরানো। আজকের আপত্তি বুঝতে এটুকুই যথেষ্ট।
আপত্তিটি কী?
আপত্তিতে তাযকিরাহ (পৃষ্ঠা ৭৭, ৪র্থ সংস্করণ) থেকে একটি ইলহাম উদ্ধৃত হয়: “কুরআন আল্লাহর কিতাব ও আমার মুখের কথা।” বলা হয়, এখানে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কুরআনকে নিজের মুখের কথা বলেছেন।
ইলহামটি কী প্রসঙ্গে?
তাযকিরাহতে দেখা যায়, এটি ১৮৮৩ সালের কয়েকটি উর্দু ইলহামের অংশ, যা বারাহীনে আহমদীয়া চতুর্থ খণ্ডে (পৃষ্ঠা ৫২২, পাদটীকা; রূহানী খাযায়েন ১ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬২৩) ছাপা হয়েছিল। ইলহামগুলোর মর্ম: “পবিত্র মুহাম্মদ মুস্তফা, নবীগণের নেতা। আল্লাহ তোমার সব কাজ ঠিক করে দেবেন, আর তোমার সব ইচ্ছা পূর্ণ করবেন। বাহিনীসমূহের প্রভু এদিকে মনোযোগ দেবেন। এই নিদর্শনের উদ্দেশ্য হলো, পবিত্র কুরআন আল্লাহর কিতাব এবং আমার মুখের কথা…”
এর ঠিক আগে একই সময়ের কয়েকটি ইলহাম ইংরেজিতেও এসেছিল, যা তাযকিরাহতে আছে: “The days shall come when God shall help you. Glory be to this Lord God, Maker of earth and heaven.” অর্থাৎ পুরো ইলহামমালার বক্তা ও কেন্দ্র আল্লাহ, যিনি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
লক্ষ করুন, উর্দু ইলহামটি শুরু হয়েছে মহানবী (সা.)-এর প্রশংসা দিয়ে, আর বলা হয়েছে নিদর্শনের উদ্দেশ্য কুরআনকে আল্লাহর কিতাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। পুরো বক্তা এখানে আল্লাহ।
তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল
এই প্রশ্ন নতুন নয়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর জীবদ্দশাতেই তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: এই ইলহামে “আমার” বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে, কার মুখের কথা? তাঁর উত্তর তাযকিরাহর পাদটীকায় লিপিবদ্ধ আছে:
“এর অর্থ আল্লাহর মুখের কথা। আল্লাহ তা’লা বলছেন, ‘আমার মুখের কথা।’ পবিত্র কুরআনে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে একই বিষয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সর্বনাম ব্যবহার হয়েছে।” (বদর পত্রিকা, ৬ খণ্ড, সংখ্যা ২৮, ১১ জুলাই ১৯০৭, পৃষ্ঠা ৬)
যিনি ইলহাম পেয়েছেন, তিনি নিজেই বলে দিয়েছেন “আমার” মানে আল্লাহ। এর পর অন্য অর্থ চাপানোর সুযোগ থাকে না।
কুরআনে সর্বনামের মোড়
তিনি যে কুরআনের উদাহরণের কথা বলেছেন, তার একটি সূরা লুকমানে:
একই আয়াতে প্রথমে “তিনি” সৃষ্টি করেছেন, তারপর “আমরা” বৃষ্টি বর্ষণ করি। কেউ কি বলবেন, “আমরা” মানে মহানবী (সা.), কারণ কুরআন তাঁর মুখে উচ্চারিত হয়েছে? নাউযুবিল্লাহ। সবাই বোঝেন, দুটি সর্বনামই আল্লাহর।
সূরা বনী ইসরাঈলের প্রথম আয়াতেও একই ধারা: “তিনি পরম পবিত্র ও মহিমাময়, যিনি রাত্রিযোগে স্বীয় বান্দাকে… লইয়া গেলেন, যাহার চতুষ্পার্শ্বকে আমরা বরকতমণ্ডিত করিয়াছি…” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:২)। “যিনি” থেকে “আমরা”, বক্তা একজনই।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
আল্লাহর কি মুখ আছে, যে “আমার মুখের কথা” বলা হবে?
কুরআন নিজেই আল্লাহর জন্য এমন রূপক ব্যবহার করে। বয়আতের কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:
আরেক জায়গায়: “তোমরা যেদিকে মুখ ফিরাও সেই দিকেই আল্লাহ্র চেহারা বিরাজমান” (সূরা আল-বাকারা ২:১১৬)। আল্লাহর “হাত”, “চেহারা” যেমন রূপক, “আমার মুখের কথা”-ও তেমনি। এর অর্থ: কুরআন সরাসরি আল্লাহর বাণী, কোনো মানুষের রচনা নয়।
ইলহামে সরাসরি “আল্লাহর মুখের কথা” বলা হলো না কেন?
কারণ বক্তা নিজেই আল্লাহ। বাক্যের প্রথম অংশে নিজের কথা তৃতীয় পুরুষে (“আল্লাহর কিতাব”), দ্বিতীয় অংশে প্রথম পুরুষে (“আমার মুখের কথা”), ঠিক সূরা লুকমানের আয়াতের মতো। আরবি-উর্দু ভাষার এই রীতি জানা থাকলে প্রশ্নই ওঠে না। আর তিনি নিজে এই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন।
তাহলে কুরআন সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাস কী?
এই ইলহামটিই তার উত্তর: নিদর্শনের উদ্দেশ্য কুরআনকে আল্লাহর কিতাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর পুরো জীবন কেটেছে কুরআনের সত্যতা প্রমাণে; বারাহীনে আহমদীয়া বইটিই লেখা হয়েছিল কুরআন আর মহানবী (সা.)-এর সত্যতার পক্ষে প্রমাণ দিতে। যে ইলহাম কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে ঘোষণা করে, তাকে কুরআনের অবমাননা বলা যায় না।
কুরআন নিজেও কি নিজেকে এক রসূলের “কথা” বলেনি?
হ্যাঁ, আর এটি সর্বনাম ও সম্বন্ধের ভাষা বোঝার আরেকটি সুন্দর উদাহরণ। কুরআন বলে:
এখানে কুরআনকে বলা হয়েছে “এক সম্মানিত রসূলের কালাম”। কোনো মুসলমান এর অর্থ এই করেন না যে কুরআন মহানবী (সা.)-এর রচনা; সবাই বোঝেন, রসূল তা পৌঁছে দিয়েছেন, বাণী আল্লাহর। কথার সম্বন্ধ বোঝা যায় প্রসঙ্গ থেকে। আর আলোচ্য ইলহামের বেলায় প্রসঙ্গের দরকারও নেই, কারণ ইলহামপ্রাপক নিজেই বলে দিয়েছেন “আমার” মানে আল্লাহ।
সব মিলিয়ে: “আমার মুখের কথা”-র “আমার” কে, এই প্রশ্নের উত্তর ইলহামপ্রাপক নিজেই দিয়ে গেছেন: আল্লাহ। কুরআনেই সর্বনামের এমন মোড় বারবার আছে। আর ইলহামের মূল বক্তব্য কুরআনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, তা খাটো করা নয়।
সংক্ষেপে
- ইলহামটি বারাহীনে আহমদীয়া ৪র্থ খণ্ডে ছাপা কয়েকটি উর্দু ইলহামের অংশ, যা শুরু হয়েছে মহানবী (সা.)-এর প্রশংসা দিয়ে।
- “আমার” কে, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন: আল্লাহ (বদর, ১১ জুলাই ১৯০৭, পৃষ্ঠা ৬)।
- কুরআনেই একই বক্তার জন্য সর্বনাম বদলায় (১:২-৫; ৩১:১১; ১৭:২)।
- ইলহামের ঘোষিত উদ্দেশ্য কুরআনকে আল্লাহর কিতাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Tadhkirah · alislam.org
- Tadhkirah (English, PDF) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.