একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। আল্লাহ কি শুধু আরবদের রব? শুধু বনী ইসরাঈলের? নাকি চীন, ভারত, আফ্রিকা, আমেরিকার মানুষেরও রব?
কুরআনের প্রথম সূরার প্রথম আয়াতেই উত্তর আছে:
যিনি সব জাতির শরীরের খাবার দিয়েছেন, তিনি কি তাদের আত্মার খাবার, অর্থাৎ হেদায়াত, দেননি? এই প্রশ্নটিই আজকের আলোচনার পটভূমি।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, মহানবী (সা.)-কে অন্য দেশের নবীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, প্রত্যেক দেশেই নবী এসেছেন; তিনি আরও বলেছিলেন, ভারতে একজন শ্যামবর্ণ নবী ছিলেন, যাঁর নাম ছিল কাহেন (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২৩, পৃষ্ঠা ৩৮২)। বিরোধীরা বলেন, কোনো হাদীস গ্রন্থে এমন হাদীস নেই।
প্রসঙ্গটি কী ছিল
এই কথাগুলো এসেছে একটি বড় আলোচনার ভেতরে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেখানে ইসলামের একটি অনন্য সৌন্দর্য তুলে ধরছিলেন। অনেক ধর্মের অনুসারীরা মনে করেন, আল্লাহ শুধু তাদের জাতিকেই হেদায়াত দিয়েছেন, অন্য কোনো জাতিকে নয়। যেন বিশ্বজগতের প্রভু একটি জাতির খোদা হয়ে বসে আছেন।
কুরআন এই সংকীর্ণ ধারণা ভেঙে দিয়েছে:
আরও সংক্ষেপে বলা হয়েছে, “ওয়া লিকুল্লি কাওমিন হাদ”, “এবং প্রত্যেক জাতির জন্য হেদায়াতদাতা আছে” (সূরা আর-রা‘দ ১৩:৮)।
তাহলে ভারতবর্ষের মতো প্রাচীন ও বিশাল একটি দেশে কি আল্লাহর কোনো প্রেরিত পুরুষ আসেননি? কুরআনের নিয়ম অনুযায়ী অবশ্যই এসেছেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই নিয়মের একটি উদাহরণ হিসেবেই বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন।
বর্ণনাটির উৎস
হযরত মির্যা তাহের আহমদ (রহ.)-এর An Elementary Study of Islam গ্রন্থে বর্ণনাটি এভাবে এসেছে: “ভারতে আল্লাহর একজন নবী ছিলেন, যিনি ছিলেন শ্যামবর্ণ, আর তাঁর নাম ছিল ‘কাহান’।” এর সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তারীখে হামদান দায়লামী, বাবুল কাফ।
অর্থাৎ বর্ণনাটি হাদীস সাহিত্যের একটি ইতিহাসগ্রন্থে আছে। হযরত মির্যা সাহেব কিছু বানাননি; যা আগে থেকে লেখা ছিল, তা-ই উল্লেখ করেছেন।
এই বর্ণনার সাথে একটি চমৎকার মিলও আছে। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণকে সব সময় শ্যামবর্ণ বলে বর্ণনা করা হয়। তাঁর আরেক নাম “কানহাইয়া”, যাতে “কাহান”-এর মতোই ক, ন, হ ব্যঞ্জনগুলো আছে। তাই অনেকে মনে করেন, এই বর্ণনা তাঁর দিকেই ইঙ্গিত করে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“এটি তো বুখারী-মুসলিমের হাদীস নয়, তাহলে ‘হাদীস’ বলা কেন?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, ছয় কিতাবে নেই মানেই এটি হাদীস নয়। কিন্তু হাদীস সাহিত্য শুধু ছয় কিতাবে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক বর্ণনা ইতিহাস ও অন্যান্য সংকলনে সংরক্ষিত আছে, আর আলেমরা সেগুলো উদ্ধৃত করে আসছেন। হযরত মির্যা তাহের আহমদ (রহ.) সততার সাথে এটাও লিখেছেন যে বর্ণনাটি নিয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে মতভেদ আছে। আমরা এটিকে এর চেয়ে বেশি মর্যাদা দাবি করি না।
“তাহলে কি আহমদী মুসলমানরা কৃষ্ণকে নিশ্চিতভাবে নবী বলে?”
কোনো অনারব নবীর নাম হাদীসে এসেছে কি না, সেটি একটি জ্ঞানগত আলোচনা মাত্র। আসল কথা হলো কুরআনের ঘোষণা: প্রত্যেক অঞ্চলে, প্রত্যেক যুগে আল্লাহ নবী পাঠিয়েছেন। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম না জানলেও এই মূল নীতিতে কোনো সন্দেহ নেই। আর যাঁর শিক্ষা পরবর্তীতে বিকৃত হয়েছে, তাঁর মূল শিক্ষাকে সেই বিকৃতি দিয়ে বিচার করা যায় না।
“অন্য ধর্মের নেতাদের সম্মান করলে কি ইসলাম দুর্বল হয়?”
উল্টো, এতে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বই প্রকাশ পায়। কুরআন মুসলমানদের শিখিয়েছে, “আমরা তাহাদের কাহারও মধ্যে প্রভেদ করি না” (সূরা আল-বাকারা ২:১৩৭)। যে ধর্ম সব জাতির নবীদের সত্যতা স্বীকার করে, সেই ধর্মই সব জাতির জন্য সেতু হতে পারে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এই বর্ণনা দিয়ে ঠিক এ কথাটিই বলতে চেয়েছেন: ইসলাম বিশ্বজনীন, কারণ এর খোদা “রাব্বুল আলামীন”।
সংক্ষেপে
- কুরআন বলে, এমন কোনো জাতি নেই যেখানে আল্লাহর সতর্ককারী আসেননি (৩৫:২৫, ১৬:৩৭, ১৩:৮)।
- “ভারতে শ্যামবর্ণ নবী কাহান” বর্ণনাটি তারীখে হামদান দায়লামী, বাবুল কাফে আছে বলে উল্লেখ আছে।
- বর্ণনাটি নিয়ে মতভেদ আছে, এটি খোলাখুলিই স্বীকার করা হয়; কিন্তু মূল নীতি কুরআন দ্বারা নিশ্চিত।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এটি উল্লেখ করেছেন ইসলামের বিশ্বজনীনতা দেখাতে, কিছু বানাতে নয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The Prophets (An Elementary Study of Islam) · alislam.org
- The Promised Messiah – Prophecies Fulfilled · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.