আগমনকারী মসীহ কেন “যুলকারনাইন”? সূরা কাহফের এক লুকানো ভবিষ্যদ্বাণী

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেকে যুলকারনাইন বলেছেন। বিরোধীরা বলেন, এর কোনো ভিত্তি নেই। তিনি নিজে কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন, আর কুরআন এ নিয়ে কী ইঙ্গিত দেয়, চলুন পড়ি।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

সূরা কাহফ। প্রতি শুক্রবার অনেক মুসলমান এই সূরাটি পড়েন। এর শেষ দিকে আছে এক রহস্যময় মানুষের গল্প: যুলকারনাইন। তিনি পশ্চিমে যান, পূর্বে যান, তারপর দুই পাহাড়ের মাঝে লোহা আর গলিত তামা দিয়ে এক মজবুত প্রাচীর গড়ে তোলেন, যাতে ইয়াজুজ-মাজুজ পার হতে না পারে।

গল্পটি শুরু হয় একটি প্রশ্ন দিয়ে। মানুষ মহানবী (সা.)-কে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। উত্তরে আল্লাহ বললেন:

وَیَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنۡ ذِی الۡقَرۡنَیۡنِ ؕ قُلۡ سَاَتۡلُوۡا عَلَیۡکُمۡ مِّنۡہُ ذِکۡرًا
“এবং তাহারা তোমাকে যুলকারনায়ন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট তাহার সম্পর্কে কিছু বৃত্তান্ত বর্ণনা করিব।’”
সূরা আল-কাহফ ১৮:৮৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ১৮:৮৩।

লক্ষ করুন, “কিছু বৃত্তান্ত”। পুরোটা নয়, কিছু অংশ। বাকিটা কি তবে ভবিষ্যতের জন্য তোলা রইল?

আপত্তিটি কী?

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, কিছু হাদীসে আছে যে আগমনকারী মসীহের একটি চিহ্ন হলো তিনি যুলকারনাইন হবেন, আর আল্লাহর বাণী অনুযায়ী তিনিই সেই যুলকারনাইন (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ১১৮)। বিরোধীরা বলেন, এ কথার কোনো ভিত্তি নেই; মসীহ যুলকারনাইন হবেন, এমন কিছু ইসলামি শিক্ষায় নেই।

তিনি নিজে কী বলেছেন

কথাটি এসেছে বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খণ্ডে। প্রসঙ্গটি পুরোটা পড়লে বোঝা যায় তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন। তাঁর কথার সারাংশ:

তাঁর ওপর একটি ইলহাম হয়েছিল: “জারিউল্লাহি ফী হুলালিল আম্বিয়া”, অর্থাৎ “আল্লাহর রসূল, সকল নবীর পোশাকে।” তিনি লিখেছেন, এই ইলহামের দাবি হলো, অতীতের সব নবীর কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য তাঁর মধ্যে থাকবে। আর সূরা কাহফ থেকে প্রমাণিত যে যুলকারনাইনও ওহীপ্রাপ্ত ছিলেন, কারণ আল্লাহ তাঁকে সম্বোধন করে বলেছেন, “হে যুলকারনায়ন!” (১৮:৮৭)। তাই এই উম্মতের জন্য তিনি যুলকারনাইন হিসেবেও এসেছেন।

তারপর তিনি নামটির অর্থ খুলে বলেছেন। “কারন” শব্দের একটি অর্থ শতাব্দী। যুলকারনাইন মানে, যিনি দুই শতাব্দী দেখেছেন। তিনি লিখেছেন, সে সময় তাঁর বয়স প্রায় ৬৭ বছর, আর হিজরী, খ্রিষ্টীয় ও বিক্রমী, সব পঞ্জিকা অনুযায়ীই তিনি দুই শতাব্দী পেয়েছেন। সত্যিই তাই: তাঁর জন্ম ১৮৩৫ সালে, অর্থাৎ হিজরী তেরো শতাব্দী ও খ্রিষ্টীয় উনিশ শতকে; আর তাঁর কাজ বিস্তৃত হয়েছে হিজরী চৌদ্দ শতাব্দী ও খ্রিষ্টীয় বিশ শতক পর্যন্ত।

✦

গল্পের ভেতরে ভবিষ্যদ্বাণী

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, তিনি এই আয়াতগুলোর অতীত ঘটনার অর্থ অস্বীকার করেন না। কিন্তু কুরআন কোনো গল্পকারের বই নয়; এর প্রতিটি কাহিনির ভেতরে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত আছে। যুলকারনাইনের কাহিনিতে আছে প্রতিশ্রুত মসীহের যুগের ভবিষ্যদ্বাণী।

পরের আয়াতটি দেখুন:

اِنَّا مَکَّنَّا لَہٗ فِی الۡاَرۡضِ وَاٰتَیۡنٰہُ مِنۡ کُلِّ شَیۡءٍ سَبَبًا
“নিশ্চয় আমরা তাহাকে পৃথিবীতে শাসন ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলাম এবং আমরা তাহাকে প্রত্যেক বিষয় (অর্জন করার) সম্পর্কে উপকরণ দান করিয়াছিলাম।”
সূরা আল-কাহফ ১৮:৮৫

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন, সত্য প্রচারের জন্য তাঁকে এমন সব উপকরণ দেওয়া হয়েছে, যা আগের কোনো নবীর যুগে ছিল না: জাতিতে জাতিতে যোগাযোগ সহজ হয়েছে, বছরের পথ কয়েক দিনে পার হওয়া যায়, মিনিটে হাজার মাইল দূরে খবর পৌঁছায়, আর ছাপাখানার কল্যাণে দশ বছরের কাজ দশ দিনে হয়।

এই কাহিনির শেষে আছে ইয়াজুজ-মাজুজের প্রসঙ্গ, আর ইসলামি ঐতিহ্যে ইয়াজুজ-মাজুজের প্রকাশ শেষ যুগের, অর্থাৎ মসীহের যুগের, একটি বড় নিদর্শন। যে কাহিনির শেষ অংশ মসীহের যুগের দিকে ইশারা করে, তার নায়কের ছায়া সেই যুগের সংস্কারকের ওপর পড়বে, এটিই স্বাভাবিক।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“যুলকারনাইন তো অতীতের একজন রাজা, তাঁকে ভবিষ্যতের সাথে জোড়া কেন?”

এখানে কেউ কেউ বলেন, যুলকারনাইনের ঘটনা শেষ হয়ে গেছে, এতে ভবিষ্যদ্বাণী খোঁজা ঠিক নয়। কিন্তু কুরআন নিজেই বলেছে, “আমি তাহার সম্পর্কে কিছু বৃত্তান্ত বর্ণনা করিব।” হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এই আয়াতের টীকায় লিখেছেন, অতীতের যুলকারনাইনের উল্লেখ একটি ছোট অংশ মাত্র; ভবিষ্যতেও একজন যুলকারনাইন আসবেন।

কুরআনের ধারাও তাই। ফেরাউন, নূহ (আ.)-এর জাতি, আদ ও সামূদ, সবার কাহিনি পরবর্তী যুগের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকে। অতীতের অর্থ মেনে নিয়েও ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেখা কুরআনের প্রতি অসম্মান নয়, বরং তার গভীরতার স্বীকৃতি।

“কোন হাদীসে আছে যে মসীহ যুলকারনাইন হবেন?”

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, কিছু হাদীসে এমন বর্ণনা আছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, তিনি এই নাম দাবির ভিত্তি কোনো একটি বর্ণনার ওপর রাখেননি। তিনি পরিষ্কার লিখেছেন, “আল্লাহর বাণী অনুযায়ী আমি যুলকারনাইন।” অর্থাৎ ভিত্তি হলো আল্লাহর ইলহাম আর কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা।

আর এই দাবি যাচাইযোগ্য। দুই শতাব্দী পাওয়ার কথা তিনি নিজের জীবদ্দশায় সবার সামনে বলেছেন, যে কেউ পঞ্জিকা মিলিয়ে দেখতে পারত। কোনো হাদীস সংকলনের নাম জানা থাকা বা না থাকার ওপর এই সত্য নির্ভর করে না।

“দুই শতাব্দী তো আরও অনেকেই দেখেছেন”

ঠিক। শুধু দুই শতাব্দী দেখা কাউকে যুলকারনাইন বানায় না। কিন্তু যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে মসীহ হওয়ার দাবি করেছেন, যাঁর যুগে ইয়াজুজ-মাজুজের মতো শক্তিগুলো পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যাঁর হাতে এসেছে প্রচারের সব আধুনিক উপকরণ, আর যিনি একই সাথে দুই শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর মধ্যে এই সব চিহ্ন একসাথে মিলে গেছে। চিহ্ন একটি একটি করে নয়, একসাথে মিলিয়ে দেখতে হয়।

তাই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কোনো মনগড়া উপাধি নেননি। তিনি সূরা কাহফের একটি কাহিনির ভবিষ্যৎ-অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন, আর নিজের জীবন দিয়ে তার একটি চিহ্ন সবার সামনে রেখেছেন।

সংক্ষেপে

  1. বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খণ্ডে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, “সকল নবীর পোশাকে” ইলহামের দাবি অনুযায়ী তাঁর মধ্যে যুলকারনাইনের বৈশিষ্ট্যও আছে।
  2. যুলকারনাইন মানে যিনি দুই শতাব্দী দেখেছেন; তিনি সব প্রচলিত পঞ্জিকায় দুই শতাব্দী পেয়েছেন।
  3. কুরআন বলেছে যুলকারনাইন সম্পর্কে “কিছু” বৃত্তান্ত বলা হবে; কাহিনিটি মসীহের যুগ আর ইয়াজুজ-মাজুজের দিকে ইশারা করে।
  4. তাঁর দাবির ভিত্তি আল্লাহর ইলহাম ও কুরআনের ব্যাখ্যা, কোনো একক বর্ণনা নয়।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.