পাতিয়ালা রাজ্যের একজন সহকারী সার্জন। নাম ডাক্তার আব্দুল হাকীম খান। এক সময় তিনি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর হাতে বয়আত করেছিলেন। নিজের টাকায় কুরআনের একটি উর্দু ও ইংরেজি তফসীর ছাপিয়েছিলেন, যাতে হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর সমর্থনে বহু কথা ছিল।
কয়েক বছর পর সেই মানুষটিই জামাত ছেড়ে দেন, আর হয়ে ওঠেন কঠোরতম বিরোধীদের একজন। এই গল্পটির মাঝখানেই একটি আপত্তির জন্ম।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, আব্দুল হাকীম সাহেবের তফসীর সম্পর্কে মির্যা সাহেব তিন রকম কথা বলেছেন। প্রথমে নাকি প্রশংসা করেছেন: অতি উত্তম, সুমধুর বর্ণনা, হৃদয়ে প্রভাব ফেলে। পরে বদর পত্রিকায় (৭ জুন ১৯০৬) লিখেছেন, তাঁর তাকওয়া থাকলে তিনি তফসীর লিখতেন না; তিনি এর যোগ্য নন, তাঁর তফসীরে আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া নেই। আবার বলেছেন, তিনি তফসীরটি পড়েননি। তাহলে না পড়ে দুটি রায় দিলেন কীভাবে?
প্রথম কথা: “প্রশংসা”-র শব্দগুলো কোথা থেকে?
জামাতের আলেমরা দেখিয়েছেন, “অতি উত্তম” বা “সুমধুর বর্ণনা” ধরনের প্রশংসাবাক্য হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর কোনো লেখায় পাওয়া যায় না। এগুলো এসেছে আব্দুল হাকীম সাহেবের নিজের পুস্তিকা যিকরুল হাকীম থেকে, যা তিনি জামাত ছাড়ার পর প্রকাশ করেন (৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩)। এর পক্ষে আর কোনো সূত্র তিনি দেননি।
যিনি পরে বিরোধী হয়েছেন, তাঁর একার দাবি থেকে “প্রথম রায়” দাঁড় করানো যায় না। তবু ধরে নিই, শুরুতে কোনো প্রশংসাসূচক কথা বলা হয়েছিল। তাতেও সমস্যা নেই, যা পরের অংশে স্পষ্ট হবে।
দ্বিতীয় কথা: না পড়েও জানা যায় কীভাবে?
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তফসীরটি ছাপা অবস্থায় পড়েননি, এ কথা ঠিক। কিন্তু তাঁর সামনে এর কিছু অংশ শোনানো হয়েছিল। আব্দুল হাকীম সাহেব নিজেই হযরত মওলানা নূরুদ্দীন (রা.)-কে লেখা এক চিঠিতে স্বীকার করেছেন, মির্যা সাহেব তাঁর তফসীরের কিছু ভুল সংশোধন করেছিলেন এবং কিছু নতুন সূক্ষ্ম কথা বলেছিলেন (যিকরুল হাকীম, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩)।
শুনে জানা আর পড়ে জানা আলাদা নয়। আর একটি তফসীরে আধ্যাত্মিকতা আছে কি না, তা বোঝার জন্য লেখকের চিন্তাধারা জানাই যথেষ্ট, বিশেষত যখন সেই চিন্তাধারা তিনি নিজেই প্রকাশ্যে ঘোষণা করছেন।
তৃতীয় কথা: মানুষটি বদলে গিয়েছিলেন
আসল উত্তর এখানে। আব্দুল হাকীম সাহেবের নিজের দুটি বক্তব্য পাশাপাশি রাখুন।
জামাতে থাকাকালে তিনি লিখেছিলেন, প্রায় ছয় হাজার রুপি খরচ করে তিনি তফসীরটি ছেপেছেন, তাতে মসীহ মওউদ (আ.)-এর সমর্থনের কথাগুলো যুক্ত করেছেন, আর এটাকেই তিনি ইসলামের সেবার উত্তম পথ মনে করেন (যিকরুল হাকীম, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩)।
পরে তিনি লিখলেন, তিনি বয়আত ফিরিয়ে নিচ্ছেন; তফসীরে মির্যা সাহেব সম্পর্কে যা লিখেছেন, তা এখন সন্দেহজনক মনে করেন, আর ভবিষ্যতে সেগুলো বাদ দিয়ে দেবেন (যিকরুল হাকীম, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯)।
যে লেখক নিজেই নিজের তফসীরের মূল অংশ বাতিল করে দেন, সেই তফসীর সম্পর্কে মত বদলানো কি অস্বাভাবিক? হযরত মসীহ মওউদ (আ.) হাকীকাতুল ওহী-তে লিখেছেন, আব্দুল হাকীম তাঁর জামাতের সদস্য ছিলেন, কিন্তু কম সাক্ষাৎ ও সাহচর্যের অভাবে ধর্মের গভীর সত্য থেকে বঞ্চিত থেকে গেছেন; অহংকার ও কুধারণায় আক্রান্ত হয়ে জামাত ছেড়ে শত্রু হয়েছেন। (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ২২৮–২২৯) তিনি আরও জানিয়েছেন, আব্দুল হাকীম মনে করতেন, মহানবী (সা.)-কে না মেনেও শুধু একত্ববাদ দিয়ে মুক্তি পাওয়া যায় (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১৩০)। যে ব্যক্তি এমন ধারণা পোষণ করেন, তিনি কুরআনের তফসীর লেখার যোগ্য নন: এ রায় বিস্ময়কর নয়।
কুরআনও এমন মানুষের দৃষ্টান্ত দিয়েছে, যাকে আল্লাহ নিদর্শন দিয়েছিলেন, কিন্তু সে তা থেকে খসে পড়েছে:
যার অবস্থা বদলায়, তার সম্পর্কে রায়ও বদলায়। এটি স্ববিরোধ নয়, ন্যায়বিচার।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
একই বই সম্পর্কে ভালো ও মন্দ দুই মত কি একসঙ্গে সত্য হতে পারে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, বই তো বদলায়নি, তাহলে রায় বদলাল কেন? চলুন ভাবি। একজন ছাত্র যখন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে লেখে, তখন তার লেখার ভালো দিকগুলোর প্রশংসা করা হয়, ভুলগুলো সংশোধন করা হয়। সেই ছাত্রই পরে যদি ঘোষণা দেয় যে বইয়ের মূল কথাগুলোকেই সে এখন সন্দেহজনক মনে করে এবং সেগুলো মুছে দেবে, তখন বইটির মূল্যায়ন বদলাতেই হবে। কারণ লেখক নিজেই বইটির ভিত্তি সরিয়ে নিয়েছেন।
“পড়িনি” বলার পর মন্তব্য করা কি স্ববিরোধ নয়?
না। “পড়িনি” মানে ছাপা বইটি নিজে পড়েননি। কিন্তু অংশবিশেষ শোনা ও সংশোধনের কথা আব্দুল হাকীম সাহেব নিজেই স্বীকার করেছেন। তা ছাড়া বদর-এর মন্তব্যের মূল কথা তফসীরের পাতা নয়, লেখকের তাকওয়া ও আধ্যাত্মিক অবস্থা, যা তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্য থেকেই সবার কাছে স্পষ্ট ছিল।
আব্দুল হাকীম সাহেবের বিরোধিতার পরিণতি কী হয়েছিল?
তিনি হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-কে মিথ্যাবাদী ও প্রতারক বলে প্রচার করেন এবং একটি “ইলহাম” দাবি করে তিন বছরের মধ্যে তাঁর ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী করেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এর জবাবে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে লিখেছেন: “আমি যদি সত্যিই তেমন হই, যেমন আব্দুল হাকীম ও তার মতো লোকেরা ভাবে, তাহলে আল্লাহর চেয়ে বড় শত্রু আমার কেউ নেই; আর যদি আল্লাহর দৃষ্টিতে আমি তেমন না হই, তাহলে এই অভিযোগের জবাব আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়াই উত্তম।” (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ২২৬) সত্যের বিচার মানুষের রায়ে নয়, আল্লাহর ফয়সালায় হয়।
সংক্ষেপে
- “অতি উত্তম, সুমধুর” প্রশংসার শব্দগুলো হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর কোনো লেখায় নেই; এগুলো আব্দুল হাকীম সাহেবের নিজের পুস্তিকা থেকে এসেছে।
- তফসীরের অংশবিশেষ তাঁকে শোনানো হয়েছিল এবং তিনি সংশোধনও করেছিলেন; তাই মন্তব্য করার ভিত্তি ছিল।
- আব্দুল হাকীম সাহেব নিজেই বয়আত ফিরিয়ে নিয়ে নিজের তফসীরের মূল অংশ বাতিল করেন; মানুষ বদলালে রায় বদলানো স্বাভাবিক।
- তাই এখানে কোনো স্ববিরোধ নেই, আছে একজন মানুষের বদলে যাওয়ার দুঃখজনক গল্প।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The fate of Abdul Hakeem Patialvi in light of the Promised Messiah’s writings · alhakam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.