“শত হুসাইন” কবিতা: ইমাম হুসাইন (রা.)-এর অবমাননা, নাকি ভালোবাসার ভাষা?

একটি ফারসি পঙ্‌ক্তি আর কয়েকটি আরবি শ্লোক তুলে বলা হয়, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ইমাম হুসাইন (রা.)-কে ছোট করেছেন। পুরো কবিতা আর যাঁকে উদ্দেশ করে লেখা, সেটি জানলে ছবিটা একেবারে বদলে যায়।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

মুহাররমের প্রথম দশ দিন। কাদিয়ানের একটি বাগানে খাটিয়ায় বসে আছেন হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)। কাছে খেলছে তাঁর ছোট দুই সন্তান। তিনি তাদের ডেকে কারবালার গল্প শোনাতে লাগলেন: কীভাবে মহানবী (সা.)-এর প্রিয় নাতিকে পানি থেকে বঞ্চিত করা হলো, কীভাবে আহলে বাইতকে ঘিরে ফেলা হলো।

বলতে বলতে তাঁর চোখ ভিজে গেল। গল্প শেষে তিনি বললেন, পাপিষ্ঠ ইয়াযীদ মহানবী (সা.)-এর নাতির ওপর এই জুলুম করেছিল, কিন্তু আল্লাহ দ্রুতই জালেমদের ওপর তাঁর আযাব নামিয়েছিলেন। (সীরাতে তাইয়্যেবা, বর্ণনা ৯, পৃষ্ঠা ৩১–৩২)

অথচ এই মানুষটির বিরুদ্ধেই একটি অভিযোগ শোনা যায়: তিনি নাকি ইমাম হুসাইন (রা.)-কে অপমান করেছেন। চলুন, অভিযোগটি আর তার পেছনের লেখাগুলো একে একে দেখি।

আপত্তিটি কী?

বিরোধীরা সাধারণত দুটি জায়গা থেকে উদ্ধৃতি দেন। প্রথমটি ১৯০২ সালে লেখা নুযূলুল মসীহ গ্রন্থের একটি ফারসি পঙ্‌ক্তি: “কারবালায়ীস্ত সাইরে হার আনাম, সদ হুসাইন অস্ত দর গরেবানাম।” অর্থাৎ, “প্রতিটি মুহূর্তে আমি কারবালার ভেতর দিয়ে হাঁটি; শত হুসাইন আছে আমার বুকের ভেতর।” (নুযূলুল মসীহ, রূহানী খাযায়েন, ১৮শ খণ্ড)

দ্বিতীয়টি একই বছরের আরবি কাসীদা ইজাযে আহমদী-র কয়েকটি শ্লোক, যেখানে “তোমাদের হুসাইন” কথাটি আছে। অভিযোগ হলো, এসব কথায় ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতকে তুচ্ছ করা হয়েছে।

ফারসি পঙ্‌ক্তিটি কোন কবিতার অংশ?

পঙ্‌ক্তিটি একটি দীর্ঘ ফারসি কবিতার মাঝখান থেকে নেওয়া। পুরো কবিতাটির বিষয় একটিই: আল্লাহর প্রেম। প্রেমিক কীভাবে নিজের অহংকার থেকে মুক্ত হয়, কীভাবে প্রিয়তমের জন্য নিজেকে বিলীন করে দেয়, সেই বর্ণনা।

ঠিক আগের পঙ্‌ক্তিগুলো পড়লেই অর্থ পরিষ্কার হয়। সেখানে বলা হয়েছে, প্রিয়তমের প্রেমিক একবার নয়, দুবার নয়, হাজারবারও নয়, অগণিতবার নিহত হয়; প্রতিটি নতুন সময়ে তিনি নতুন এক “নিহত প্রেমিক” চান। আর তারপরই আসে সেই পঙ্‌ক্তি: প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে কারবালা, শত হুসাইন আমার বুকের ভেতর। (The Descent of the Messiah, ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১০৭)

অর্থাৎ এখানে কারবালা হলো আল্লাহর পথে কুরবানির প্রতীক, আর হুসাইন (রা.) হলেন সেই কুরবানির সর্বোচ্চ উদাহরণ। কবি বলছেন, আল্লাহর প্রেমে ও সত্যের পথে প্রতিদিন তাঁকে বারবার সেই কুরবানির ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। কাউকে তুচ্ছ করার জন্য কেউ তাকে নিজের সবচেয়ে বড় আদর্শের প্রতীক বানায় না।

ফারসি ও উর্দু কাব্যে এই ভাষা নতুন নয়। কবিরা যুগ যুগ ধরে নিজের কষ্টকে কারবালার সাথে, নিজের ধৈর্যকে আইয়ুব (আ.)-এর সাথে, নিজের প্রেমকে মজনুর সাথে তুলনা করে এসেছেন। এতে কারবালার মর্যাদা কমে না, বরং প্রমাণ হয় যে কারবালাই কুরবানির সবচেয়ে উঁচু মাপকাঠি।

✦

আরবি শ্লোকগুলো কাকে উদ্দেশ করে লেখা?

ইজাযে আহমদী-র সেই অংশের পাশে স্পষ্ট লেখা আছে, এটি মৌলভী আলী হায়েরী নামের একজন শিয়া আলেমের আক্রমণের জবাব। সেই আলেম এবং তাঁর মতের লোকেরা ইমাম হুসাইন (রা.)-কে এমন উচ্চতায় তুলেছিলেন, যা ইসলামের শিক্ষার সাথে মেলে না।

শ্লোকগুলো নিজেই সেই বাড়াবাড়ির কথা বলে দেয়। সেখানে প্রশ্ন করা হয়েছে: তোমরা কি হুসাইনকে সমস্ত সৃষ্টির চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে কর? হুসাইন কি সব নবীর চেয়ে উত্তম ছিলেন? তিনি কি নবীদের জন্য সুপারিশকারী? আর বলা হয়েছে, খ্রিস্টানরা ঈসা (আ.)-কে নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে, এ যেন সেই একই কথা। (The Miracle of Ahmad, ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১২৮–১২৯)

পরের অংশে আরও স্পষ্ট করে লেখা আছে, তাঁরা বিশ্বাস করতেন হুসাইন (রা.) কিয়ামতের দিন এমনকি মহানবী (সা.)-এর জন্যও সুপারিশ করবেন, আর প্রত্যেক নবী তাঁরই সুপারিশে মুক্তি পাবেন। এর জবাবে বলা হয়েছে, এমন বিশ্বাস নবীদের মর্যাদার অবমাননা। (The Miracle of Ahmad, পৃষ্ঠা ১৫৩–১৫৪)

এখন একটু ভাবুন। যে মুসলমান বিশ্বাস করেন মহানবী (সা.) সব নবীর নেতা, তিনি কি এই বাড়াবাড়ি মেনে নিতে পারেন? “তোমাদের হুসাইন” বলতে তাই সেই ছবিটিকে বোঝানো হয়েছে, যা ওই আলেম নিজের কল্পনায় গড়েছিলেন: নবীদের চেয়ে বড়, মহানবী (সা.)-এর সুপারিশকারী। আসল ইমাম হুসাইন (রা.) এমন দাবি কখনো করেননি।

ইমাম হুসাইন (রা.) সম্পর্কে তাঁর নিজের কথা

যিনি সত্যিই ইমাম হুসাইন (রা.)-কে অপমান করতে চান, তাঁর লেখায় শ্রদ্ধার কথা থাকার কথা নয়। কিন্তু হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর একটি ইশতেহারে আছে:

“নিঃসন্দেহে তিনি জান্নাতের সরদারদের একজন। তাঁর প্রতি বিন্দুমাত্র বিদ্বেষ রাখাও ঈমান হারানোর কারণ। এই ইমামের তাকওয়া, আল্লাহর প্রেম, ধৈর্য, দৃঢ়তা, আত্মনিবেদন ও ইবাদত আমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ।” (মজমুআয়ে ইশতেহারাত, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪৫)

“জান্নাতের সরদার” কথাটি তিনি নিজে বানাননি। এটি মহানবী (সা.)-এরই বাণী:

الْحَسَنُ وَالْحُسَيْنُ سَيِّدَا شَبَابِ أَهْلِ الْجَنَّةِ
“হাসান ও হুসাইন জান্নাতবাসী যুবকদের সরদার।”
জামে তিরমিযী, কিতাবুল মানাকিব, হাদীস ৩৭৬৮

আর ইজাযে আহমদী-তেই, যে বই থেকে আপত্তি তোলা হয়, তিনি লিখেছেন: কাসীদায় ইমাম হুসাইন (রা.) বা হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে যা লেখা হয়েছে, তা মানুষের নিজস্ব ধারণা থেকে নয়। আল্লাহর পূর্ণ ও সৎ বান্দাদের সম্পর্কে যে নিজের প্রবৃত্তি থেকে মন্দ কথা বলে, সে বড়ই মন্দ। “আমার দৃঢ় বিশ্বাস, হুসাইন ও হযরত ঈসার মতো পুণ্যবানদের সম্পর্কে ধৃষ্টতাপূর্ণ কথা বলে কেউ এক রাতও টিকে থাকতে পারে না।” (The Miracle of Ahmad, পৃষ্ঠা ৬৬)

কুরআন আল্লাহর পথে নিহতদের সম্পর্কে যা বলে, তিনি ইমাম হুসাইন (রা.)-কে সেই আলোতেই দেখতেন:

وَلَا تَقُوۡلُوۡا لِمَنۡ یُّقۡتَلُ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ اَمۡوَاتٌ ؕ بَلۡ اَحۡیَآءٌ وَّلٰکِنۡ لَّا تَشۡعُرُوۡنَ
“এবং যাহারা আল্লাহ্‌র পথে নিহত হয় তাহাদের সম্বন্ধে বলিও না যে তাহারা মৃত, বরং তাহারা জীবিত কিন্তু তোমরা উপলব্ধি করিতে পারিতেছ না।”
সূরা আল-বাকারা ২:১৫৫
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২:১৫৪।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“শত হুসাইন আমার বুকে” বলা কি নিজেকে হুসাইন (রা.)-এর চেয়ে বড় বানানো নয়?

এখানে কেউ কেউ বলেন, এক হুসাইন নয়, “শত হুসাইন” বলার মানেই বড়াই। চলুন দেখি। আগের পঙ্‌ক্তিতেই বলা হয়েছে, প্রেমিক অগণিতবার নিহত হয়। “শত হুসাইন” তাই অগণিত কুরবানির কাব্যিক রূপ: একবারের কারবালা নয়, প্রতিদিনের কারবালা। তিনি নিজের দুঃখ-কষ্টকে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কুরবানির আলোয় দেখছেন। যে মানুষ নিজের পরীক্ষাকে কারবালার সাথে তুলনা করেন, তিনি কারবালাকে ছোট করেন না, বরং তাকেই সর্বোচ্চ মাপকাঠি মানেন।

তাহলে “তোমাদের হুসাইন” কথাটির মানে কী?

যেমন খ্রিস্টানদের কল্পনার “খোদা যিশু” আর কুরআনের নবী ঈসা (আ.) এক নন, তেমনি যে “হুসাইন” সব নবীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, এমনকি মহানবী (সা.)-এর সুপারিশকারী, সেই ছবিটি ইতিহাসের ইমাম হুসাইন (রা.) নন। শ্লোকগুলোর লক্ষ্য ছিল সেই বাড়াবাড়ি, কোনো সাহাবী বা আহলে বাইতের সদস্য নন। এ কারণেই একই বইয়ে তিনি ইমাম হুসাইন (রা.)-কে আল্লাহর “পূর্ণ ও সৎ বান্দা” বলেছেন। ব্যক্তি আর তাঁকে ঘিরে তৈরি বাড়াবাড়ি, দুটিকে আলাদা করলে আপত্তিটি আর টেকে না।

তিনি কি নিজেকে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর চেয়ে উচ্চ মর্যাদার বলেননি?

বলেছেন, এবং কেন বলেছেন সেটিও স্পষ্ট। তাঁর দাবি ছিল, তিনিই সেই প্রতিশ্রুত মসীহ, যাঁর আগমনের সুসংবাদ মহানবী (সা.) দিয়ে গেছেন। সহীহ মুসলিমের দাজ্জাল-সংক্রান্ত দীর্ঘ হাদীসে সেই আগন্তুক মসীহকে বারবার বলা হয়েছে “নাবিয়্যুল্লাহ ঈসা”, অর্থাৎ আল্লাহর নবী ঈসা। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ২৯৩৭)

এখন প্রত্যেক মুসলমানকে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে: যে মসীহের অপেক্ষায় আমরা আছি, তিনি এলে কি তাঁর মর্যাদা একজন সাহাবীর ওপরে হবে না? প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ীও আগমনকারী মসীহ একজন নবী, আর নবীর মর্যাদা যে কোনো অ-নবীর ওপরে। তাই প্রশ্নটি আসলে মর্যাদার তুলনা নিয়ে নয়, তিনি সত্যিই প্রতিশ্রুত মসীহ কি না, তা নিয়ে। সেই আলোচনা আলাদা। কিন্তু মর্যাদার তুলনা করা আর অপমান করা এক জিনিস নয়।

সংক্ষেপে

  1. “শত হুসাইন” পঙ্‌ক্তিটি আল্লাহর প্রেম নিয়ে লেখা একটি দীর্ঘ কবিতার অংশ; সেখানে কারবালা আল্লাহর পথে বারবার কুরবানির প্রতীক।
  2. ইজাযে আহমদী-র শ্লোকগুলো সেই শিয়া আলেমের জবাব, যিনি হুসাইন (রা.)-কে নবীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং মহানবী (সা.)-এর সুপারিশকারী মনে করতেন।
  3. হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ইমাম হুসাইন (রা.)-কে জান্নাতের সরদার ও আমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ বলেছেন; তাঁর প্রতি বিদ্বেষকে ঈমান হারানোর কারণ বলেছেন।
  4. প্রতিশ্রুত মসীহের মর্যাদা নিয়ে কথা বলা অপমান নয়; হাদীসেই আগমনকারী মসীহকে “আল্লাহর নবী” বলা হয়েছে।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.