মক্কার কাফেররা মহানবী (সা.)-কে নিয়ে প্রায়ই ঠাট্টা করত। “এ কেমন রসূল? খাবার খায়, বাজারে ঘোরে! আসল রসূল হলে তো ফিরিশতার মতো হতো।” প্রতিটি যুগেই নবীদের বিরুদ্ধে এই একই আপত্তি উঠেছে।
আল্লাহ এর উত্তরে একটি চিরন্তন নিয়ম জানিয়ে দিয়েছেন। সেই নিয়মগুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর দেয়: দুই হাজার বছর ধরে কোনো মানুষ কি আকাশে জীবিত থাকতে পারেন?
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তাঁর “ইযালায়ে আওহাম” গ্রন্থে কুরআনের ত্রিশটি আয়াত তুলে ধরেছেন, যেগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু প্রমাণ করে (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪২৩-৪৩৭, আলইসলাম.অর্গের উল্লেখ অনুযায়ী)। এখানে তার কয়েকটি দেখব।
কুরআনের চারটি নিয়ম
প্রথম নিয়ম: নবীদের দেহ খাবারের মুখাপেক্ষী
নবীরা সাধারণ মানুষের মতো খেতেন, আর চিরকাল বাঁচার জন্য তাঁদের সৃষ্টি করা হয়নি। আলইসলাম.অর্গের ভাষায়, খাবার ছাড়া কোনো দেহ টিকে থাকে না, এটিই আল্লাহর নিয়ম। ঈসা (আ.)-কে কেন এর বাইরে ভাবব?
দ্বিতীয় নিয়ম: কোনো মানুষকে চিরস্থায়ী জীবন দেওয়া হয়নি
আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে সম্বোধন করে বলছেন, তোমার আগে কোনো মানুষকেই চিরস্থায়ী জীবন দিইনি। তুমিও মারা যাবে। এখানে কোনো ব্যতিক্রমের কথা নেই। যিনি সৃষ্টির সেরা, সেই মহানবী (সা.) যখন ইহজগৎ ছেড়ে গেছেন, তখন অন্য কোনো মানুষ আকাশে জীবিত থাকবেন, এ কথা মহানবী (সা.)-এর মর্যাদার সঙ্গেও মেলে না।
তৃতীয় নিয়ম: দীর্ঘ জীবন মানে ক্রমশ দুর্বলতা
কেউ বলতে পারেন, ঈসা (আ.) চিরঞ্জীব নন, শুধু দীর্ঘজীবী; শেষ যুগে নেমে এসে তিনি মারা যাবেন। কিন্তু কুরআন দীর্ঘ জীবনের পরিণতিও বলে দিয়েছে:
আরেক জায়গায় আল্লাহ মানুষের জীবনের পুরো পথটি এঁকে দিয়েছেন: “তিনিই আল্লাহ্ যিনি তোমাদিগকে দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করেন এবং দুর্বলতার পর তোমাদিগকে শক্তি দান করেন, এবং সেই শক্তির পর পুনরায় দুর্বলতা ও বার্ধক্য দেন” (সূরা আর-রূম ৩০:৫৫)। আর বলেছেন, কাউকে কাউকে “জরাজীর্ণ বার্ধক্যে উপনীত করা হয়, ফলে সে জ্ঞানার্জনের পর সম্পূর্ণ জ্ঞান-হারা হইয়া পড়ে” (সূরা আল-হজ্জ ২২:৬)।
তাহলে ভাবুন, দুই হাজার বছর পর একজন মানুষের শরীর আর মনের কী অবস্থা হওয়ার কথা? যিনি শেষ যুগে এসে দাজ্জালের মোকাবিলা করবেন, পৃথিবীর সংস্কার করবেন, তিনি কি এমন জরাজীর্ণ অবস্থায় আসবেন? আর যদি বলা হয় তাঁর বয়স একটুও বাড়েনি, তাহলে তো আল্লাহর ঘোষিত নিয়মটিই তাঁর বেলায় অকার্যকর ধরা হলো।
চতুর্থ নিয়ম: মানুষ আকাশে ওঠে না
মক্কার কাফেররা মহানবী (সা.)-এর কাছে দাবি করেছিল, তিনি আকাশে উঠে দেখান। আল্লাহ তাঁকে এর উত্তরে কী বলতে বললেন?
অর্থাৎ সশরীরে আকাশে ওঠা মানব-রসূলের জন্য আল্লাহর নিয়ম নয়। আলইসলাম.অর্গের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঈসা (আ.) সশরীরে আকাশে গেছেন বললে এই আয়াতের যুক্তি অচল হয়ে যায়। কাফেররা বলতে পারত, “ঈসা যদি পারেন, আপনি কেন পারবেন না?”
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
ঈসা (আ.) তো চিরঞ্জীব নন; ফিরে এসে মারা যাবেন, তাহলে সমস্যা কোথায়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, আয়াতগুলো চিরস্থায়ী জীবন অস্বীকার করে, দীর্ঘ জীবন নয়। চলুন দেখি। কুরআন দীর্ঘ জীবনের জন্যও নিয়ম দিয়েছে: দীর্ঘায়ু মানে ক্রমশ ক্ষয় ও দুর্বলতা (৩৬:৬৯)। আর মানুষের জন্য নির্ধারিত দুটি পথের কথা বলেছে: কেউ স্বাভাবিক বয়সে মারা যায়, কেউ চরম বার্ধক্যে পৌঁছে জ্ঞানহারা হয় (২২:৬)। ঈসা (আ.)-এর জন্য তৃতীয় কোনো পথ, অর্থাৎ বয়স না বেড়ে হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকা, কুরআনে কোথাও নেই। তা ছাড়া মহানবী (সা.) যখন এই জগৎ ছেড়েছেন, তখন অন্য কারও এভাবে বেঁচে থাকার দাবি মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বড় মর্যাদা তাঁকে দিয়ে দেয়।
ঈসা (আ.) নিজেই তো বলেছেন, “যতদিন জীবিত থাকি”?
হ্যাঁ, আর এই কথাটিও একটি সাক্ষ্য। কুরআনে ঈসা (আ.)-এর মুখে আছে, আল্লাহ “যতদিন আমি জীবিত থাকি তিনি আমাকে নামায ও যাকাত আদায় করার বিশেষ নির্দেশ দিয়াছেন” (সূরা মারইয়াম ১৯:৩২)। আলইসলাম.অর্গে প্রশ্ন তোলা হয়েছে: তিনি যদি আকাশে জীবিত থাকেন, তাহলে সেখানে যাকাত দেবেন কাকে? যাকাত তো পৃথিবীর মানুষের জন্য। তার ঠিক পরেই তিনি নিজের জীবনের তিনটি দিনের কথা বলেছেন: জন্মের দিন, মৃত্যুর দিন, আর পুনরুত্থানের দিন (১৯:৩৪)। সশরীরে আকাশে যাওয়া আর নেমে আসার মতো বিশাল ঘটনা থাকলে তা এই তালিকায় থাকার কথা ছিল।
যাঁদের ডাকা হয়, তাঁরা কি সবাই মৃত?
আল্লাহ বলেন, মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ডাকে, তারা “সকলেই মৃত, জীবিত নহে” (সূরা আন-নাহল ১৬:২২)। কোটি কোটি মানুষ আজ ঈসা (আ.)-কে ডাকে, তাঁর কাছে প্রার্থনা করে। আলইসলাম.অর্গের ব্যাখ্যায় তাই বলা হয়েছে, এই আয়াতের আওতায় ঈসা (আ.)-ও আছেন; তিনিও মৃত।
সংক্ষেপে
- নবীদের দেহ খাবারের মুখাপেক্ষী ছিল এবং তাঁরা চিরকাল বাঁচার জন্য ছিলেন না (২১:৯)।
- মহানবী (সা.)-এর আগে কোনো মানুষকে চিরস্থায়ী জীবন দেওয়া হয়নি (২১:৩৫)।
- দীর্ঘ জীবন মানে ক্রমশ দুর্বলতা ও বার্ধক্য; দুই হাজার বছর অপরিবর্তিত থাকা কুরআনের নিয়মের বিপরীত।
- মানব-রসূলের সশরীরে আকাশে ওঠা আল্লাহর নিয়ম নয় (১৭:৯৪); হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এমন ত্রিশটি আয়াত তুলে ধরেছেন।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- 30 Verses of the Holy Quran which prove the Natural Death of Jesus Christ (as) · alislam.org
- Jesus Christ died a natural death · alislam.org
- Death of Hazrat Jesus (as) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.