ধরুন, আপনার খুব প্রিয় একজন মানুষ দূর দেশে থাকেন। কেউ সেখানে যাচ্ছে শুনে আপনি বললেন, “তাঁর সঙ্গে দেখা হলে আমার সালাম জানিয়ো।” এই ছোট্ট বাক্যে কত ভালোবাসা আর কত সম্মান লুকিয়ে থাকে!
মহানবী (সা.) শেষ যুগের এক আগমনকারীর জন্য ঠিক এমন একটি বার্তা রেখে গেছেন। আর সেখান থেকেই বোঝা যায়, কেন আহমদী মুসলমানরা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নামের পরে “আলাইহিস সালাম” বা (আ.) বলেন।
“আলাইহিস সালাম” মানে কী?
প্রথমে শব্দটির অর্থ বুঝে নিই। আলাইহিস সালাম মানে “তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক”। এটি একটি দোয়া। আর কুরআন শেখায়, আল্লাহ নিজে তাঁর মনোনীত বান্দাদের ওপর এই সালাম পাঠান:
সূরা আস-সাফফাতে আল্লাহ নবীদের নাম ধরে ধরে সালাম পাঠিয়েছেন: “সকল জগদ্বাসীর মধ্যে নূহের উপর শান্তি বর্ষিত হউক” (৩৭:৮০), “ইব্রাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হউক!” (৩৭:১১০)। এখান থেকেই মুসলমানদের মধ্যে নবীদের নামের পরে (আ.) বলার রীতি এসেছে।
প্রথম কারণ: মহানবী (সা.) নিজে সালাম পাঠিয়েছেন
আলইসলাম ডট অর্গে উদ্ধৃত একটি হাদীসে মহানবী (সা.) বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যে ঈসা ইবনে মারইয়ামের সাক্ষাৎ পাবে, সে যেন তাঁকে আমার সালাম পৌঁছে দেয়।” (আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন)
একটু থেমে ভাবুন। সর্বশ্রেষ্ঠ নবী (সা.) নিজে যাঁকে সালাম পাঠাচ্ছেন, আমরা তাঁর নামের সঙ্গে সালাম যোগ করব না? যাঁর জন্য মহানবী (সা.) “আলাইহিস সালাম” বলেছেন, আমাদের মুখে তাঁর জন্য “আলাইহিস সালাম” আসাটাই স্বাভাবিক, এবং মহানবী (সা.)-এর নির্দেশের প্রতি সম্মান।
আরেকটি বিষয়ও লক্ষ করার মতো। মহানবী (সা.) এই সালাম পাঠিয়েছেন ভবিষ্যতের এক মানুষের জন্য, যাঁকে তিনি নিজের জীবদ্দশায় দেখেননি। অর্থাৎ শত শত বছর আগে থেকেই তিনি এই আগমনকারীকে ভালোবাসা আর সম্মানের আসনে বসিয়ে রেখেছেন। যে উম্মত তাঁর সত্যিকারের অনুসারী, সে এই ভালোবাসার উত্তরাধিকারও বহন করে। তাই আহমদী মুসলমানদের কাছে (আ.) শুধু একটি সংক্ষিপ্ত চিহ্ন নয়, এটি মহানবী (সা.)-এর পাঠানো সালামেরই প্রতিধ্বনি।
দ্বিতীয় কারণ: “আল্লাহর নবী”
সহীহ মুসলিমে হযরত নাওয়াস বিন সামআন (রা.)-এর দীর্ঘ বর্ণনায় মহানবী (সা.) আগমনকারী মসীহকে চারবার “নবীউল্লাহ ঈসা”, অর্থাৎ আল্লাহর নবী ঈসা বলেছেন:
যাঁকে মহানবী (সা.) আল্লাহর নবী বলেছেন, নবীদের জন্য প্রচলিত সম্মানসূচক দোয়া তাঁর প্রাপ্য। আর আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বিশ্বাস হলো, আগমনকারী মসীহ আর ইমাম মাহদী একই ব্যক্তি। তাই প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নামের সঙ্গে (আ.) বলা হয়।
তৃতীয় কারণ: আল্লাহর খলীফা
সুনান ইবনে মাজাহতে হযরত সাওবান (রা.)-এর বর্ণনায় মহানবী (সা.) মাহদী সম্পর্কে বলেছেন:
যাঁকে আল্লাহ নিজে নিযুক্ত করেন, যাঁর হাতে বয়আত করা মুসলমানদের দায়িত্ব, তিনি আল্লাহর মনোনীত বান্দা। আর সূরা আন-নামল বলেছে, আল্লাহর মনোনীত বান্দাদের ওপর সালাম।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“(আ.) তো শুধু নবীদের জন্য; এটা বলা মানে কি নতুন নবী মানা?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, (আ.) লিখে আহমদী মুসলমানরা খতমে নবুওয়ত অস্বীকার করছেন। চলুন দুটি বিষয় আলাদা করে দেখি। প্রথমত, সালাম শুধু নবীদের জন্য সংরক্ষিত নয়। প্রতিটি নামাযের তাশাহহুদে প্রত্যেক মুসলমান বলেন, “আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন”, অর্থাৎ শান্তি বর্ষিত হোক আমাদের ওপর এবং আল্লাহর সব নেক বান্দার ওপর (সহীহ বুখারী, কিতাবুল আযান, হাদীস ৮৩১)। কুরআনও আল্লাহর সব মনোনীত বান্দাকে সালাম দিয়েছে (২৭:৬০)।
দ্বিতীয়ত, হ্যাঁ, আহমদী মুসলমানরা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে সেই নবী মানেন, যাঁকে সহীহ মুসলিমে মহানবী (সা.) নিজে “আল্লাহর নবী” বলেছেন। আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত The Truth about Ahmadiyyat গ্রন্থে স্পষ্ট করা হয়েছে, তিনি নতুন শরীয়ত আনেননি, স্বাধীন নবীও নন; তাঁর মর্যাদা সম্পূর্ণভাবে মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য থেকে এসেছে। যিনি খাতামান নাবিয়্যীন, তাঁরই মুখে উচ্চারিত উপাধি তাঁর মোহরের বিরোধী হতে পারে না।
“পুরোনো আলেমরা কি আগমনকারীর নামের সঙ্গে ‘আলাইহিস সালাম’ বলতেন?”
হাদীসের কিতাবগুলোই এর উত্তর দেয়। সুনান নাসাঈতে হযরত সাওবান (রা.)-এর বর্ণনায় আছে, আমার উম্মতের দুটি দলকে আল্লাহ আগুন থেকে রক্ষা করেছেন: একটি দল হিন্দুস্তানে যুদ্ধ করবে, আরেকটি দল থাকবে “ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম”-এর সঙ্গে (কিতাবুল জিহাদ, হাদীস ৩১৭৫)। আগমনকারী মসীহর নামের সঙ্গে সালাম যুক্ত করার রীতি তাই নতুন কিছু নয়। প্রশ্নটা কখনো সালাম নিয়ে ছিল না; প্রশ্ন শুধু এটুকু, আগমনকারী কে। আর যিনি সত্যিই এসেছেন, সালাম তাঁরই প্রাপ্য।
“তিনি যদি মাহদী হন, তাহলে তো তিনি শুধু একজন ইমাম, নবী নন?”
এই প্রশ্ন আসে মাহদী আর মসীহকে দুজন আলাদা মানুষ ভাবা থেকে। কিন্তু হাদীসে একই আগমনকারীকে কখনো “ঈসা ইবনে মারইয়াম”, কখনো “মাহদী” বলা হয়েছে, আর আহমদীয়া মুসলিম জামাত বিশ্বাস করে যে এঁরা একই ব্যক্তি। তাঁর এক পরিচয় “আল্লাহর নবী” (মুসলিম ২৯৩৭), আরেক পরিচয় “আল্লাহর খলীফা” (ইবনে মাজাহ ৪০৮৪)। দুটি পরিচয়ই মহানবী (সা.)-এর দেওয়া, আর দুটিই (আ.) বলার যথেষ্ট কারণ।
সংক্ষেপে
- “আলাইহিস সালাম” একটি দোয়া; কুরআন বলে, আল্লাহর মনোনীত বান্দাদের ওপর সালাম (২৭:৬০)।
- মহানবী (সা.) নিজে আগমনকারী মসীহর কাছে সালাম পৌঁছে দিতে বলেছেন (আল-মুস্তাদরাক)।
- সহীহ মুসলিমে (২৯৩৭) তাঁকে চারবার “আল্লাহর নবী” বলা হয়েছে, আর ইবনে মাজাহতে (৪০৮৪) মাহদীকে “আল্লাহর খলীফা”।
- এই নবুওয়ত মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের অধীন, তাই (আ.) বলা খাতামান নাবিয়্যীনের বিরোধী নয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- When I believe in Allah and the Holy Prophet (sa), why do I have to believe in the Promised Messiah (as)? · alislam.org
- Need for Imam Mahdi · alislam.org
- Claim of the Promised Messiah (The Truth about Ahmadiyyat) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.