দুই হাজার বছরের প্রশ্ন: কুরআনের আরও কয়েকটি সাক্ষ্য

নবীরা খেতেন, বুড়ো হতেন, মারা যেতেন। কুরআন এই নিয়মের কথা বারবার বলেছে, আর কোথাও ঈসা (আ.)-কে ব্যতিক্রম বলেনি। কয়েকটি আয়াত হাতে নিয়ে দেখা যাক।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

মক্কার কাফেররা মহানবী (সা.)-কে নিয়ে প্রায়ই ঠাট্টা করত। “এ কেমন রসূল? খাবার খায়, বাজারে ঘোরে! আসল রসূল হলে তো ফিরিশতার মতো হতো।” প্রতিটি যুগেই নবীদের বিরুদ্ধে এই একই আপত্তি উঠেছে।

আল্লাহ এর উত্তরে একটি চিরন্তন নিয়ম জানিয়ে দিয়েছেন। সেই নিয়মগুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর দেয়: দুই হাজার বছর ধরে কোনো মানুষ কি আকাশে জীবিত থাকতে পারেন?

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তাঁর “ইযালায়ে আওহাম” গ্রন্থে কুরআনের ত্রিশটি আয়াত তুলে ধরেছেন, যেগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু প্রমাণ করে (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪২৩-৪৩৭, আলইসলাম.অর্গের উল্লেখ অনুযায়ী)। এখানে তার কয়েকটি দেখব।

কুরআনের চারটি নিয়ম

প্রথম নিয়ম: নবীদের দেহ খাবারের মুখাপেক্ষী

وَمَا جَعَلۡنٰہُمۡ جَسَدًا لَّا یَاۡکُلُوۡنَ الطَّعَامَ وَمَا کَانُوۡا خٰلِدِیۡنَ
“এবং আমরা সেই সব রসূল কে না এমন দেহ দিয়াছিলাম যে তাহারা আহার করিত না এবং না তাহারা চিরকাল বাঁচিয়া থাকিবার অধিকারী ছিল।”
সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৯
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২১:৮।

নবীরা সাধারণ মানুষের মতো খেতেন, আর চিরকাল বাঁচার জন্য তাঁদের সৃষ্টি করা হয়নি। আলইসলাম.অর্গের ভাষায়, খাবার ছাড়া কোনো দেহ টিকে থাকে না, এটিই আল্লাহর নিয়ম। ঈসা (আ.)-কে কেন এর বাইরে ভাবব?

দ্বিতীয় নিয়ম: কোনো মানুষকে চিরস্থায়ী জীবন দেওয়া হয়নি

وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٍ مِّنۡ قَبۡلِکَ الۡخُلۡدَ ؕ اَفَا۠ئِنۡ مِّتَّ فَہُمُ الۡخٰلِدُوۡنَ
“এবং আমরা তোমার পূর্বে কোন মানুষকে চিরস্থায়ী জীবন দিই নাই। অতঃপর যদি তুমি মরিয়া যাও তাহা হইলে তাহারা কি চিরকাল (এখানে) জীবিত থাকিবে?”
সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৩৫

আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে সম্বোধন করে বলছেন, তোমার আগে কোনো মানুষকেই চিরস্থায়ী জীবন দিইনি। তুমিও মারা যাবে। এখানে কোনো ব্যতিক্রমের কথা নেই। যিনি সৃষ্টির সেরা, সেই মহানবী (সা.) যখন ইহজগৎ ছেড়ে গেছেন, তখন অন্য কোনো মানুষ আকাশে জীবিত থাকবেন, এ কথা মহানবী (সা.)-এর মর্যাদার সঙ্গেও মেলে না।

✦

তৃতীয় নিয়ম: দীর্ঘ জীবন মানে ক্রমশ দুর্বলতা

কেউ বলতে পারেন, ঈসা (আ.) চিরঞ্জীব নন, শুধু দীর্ঘজীবী; শেষ যুগে নেমে এসে তিনি মারা যাবেন। কিন্তু কুরআন দীর্ঘ জীবনের পরিণতিও বলে দিয়েছে:

وَمَنۡ نُّعَمِّرۡہُ نُنَکِّسۡہُ فِی الۡخَلۡقِ ؕ اَفَلَا یَعۡقِلُوۡنَ
“এবং আমরা যাহাকে দীর্ঘায়ু দান করি— তাহাকে শারীরিক গঠনে ক্ষয়প্রাপ্ত ও দুর্বল করিতে থাকি। তবুও কি তাহারা বুঝে না?”
সূরা ইয়াসীন ৩৬:৬৯

আরেক জায়গায় আল্লাহ মানুষের জীবনের পুরো পথটি এঁকে দিয়েছেন: “তিনিই আল্লাহ্ যিনি তোমাদিগকে দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করেন এবং দুর্বলতার পর তোমাদিগকে শক্তি দান করেন, এবং সেই শক্তির পর পুনরায় দুর্বলতা ও বার্ধক্য দেন” (সূরা আর-রূম ৩০:৫৫)। আর বলেছেন, কাউকে কাউকে “জরাজীর্ণ বার্ধক্যে উপনীত করা হয়, ফলে সে জ্ঞানার্জনের পর সম্পূর্ণ জ্ঞান-হারা হইয়া পড়ে” (সূরা আল-হজ্জ ২২:৬)।

তাহলে ভাবুন, দুই হাজার বছর পর একজন মানুষের শরীর আর মনের কী অবস্থা হওয়ার কথা? যিনি শেষ যুগে এসে দাজ্জালের মোকাবিলা করবেন, পৃথিবীর সংস্কার করবেন, তিনি কি এমন জরাজীর্ণ অবস্থায় আসবেন? আর যদি বলা হয় তাঁর বয়স একটুও বাড়েনি, তাহলে তো আল্লাহর ঘোষিত নিয়মটিই তাঁর বেলায় অকার্যকর ধরা হলো।

চতুর্থ নিয়ম: মানুষ আকাশে ওঠে না

মক্কার কাফেররা মহানবী (সা.)-এর কাছে দাবি করেছিল, তিনি আকাশে উঠে দেখান। আল্লাহ তাঁকে এর উত্তরে কী বলতে বললেন?

اَوۡ تَرۡقٰی فِی السَّمَآءِ … قُلۡ سُبۡحَانَ رَبِّیۡ ہَلۡ کُنۡتُ اِلَّا بَشَرًا رَّسُوۡلًا
“…অথবা তুমি আকাশে আরোহণ কর… তুমি বল, ‘আমার প্রতিপালক পবিত্র! আমি কেবল একজন মানব-রসূল।’”
সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৯৪

অর্থাৎ সশরীরে আকাশে ওঠা মানব-রসূলের জন্য আল্লাহর নিয়ম নয়। আলইসলাম.অর্গের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঈসা (আ.) সশরীরে আকাশে গেছেন বললে এই আয়াতের যুক্তি অচল হয়ে যায়। কাফেররা বলতে পারত, “ঈসা যদি পারেন, আপনি কেন পারবেন না?”

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

ঈসা (আ.) তো চিরঞ্জীব নন; ফিরে এসে মারা যাবেন, তাহলে সমস্যা কোথায়?

এখানে কেউ কেউ বলেন, আয়াতগুলো চিরস্থায়ী জীবন অস্বীকার করে, দীর্ঘ জীবন নয়। চলুন দেখি। কুরআন দীর্ঘ জীবনের জন্যও নিয়ম দিয়েছে: দীর্ঘায়ু মানে ক্রমশ ক্ষয় ও দুর্বলতা (৩৬:৬৯)। আর মানুষের জন্য নির্ধারিত দুটি পথের কথা বলেছে: কেউ স্বাভাবিক বয়সে মারা যায়, কেউ চরম বার্ধক্যে পৌঁছে জ্ঞানহারা হয় (২২:৬)। ঈসা (আ.)-এর জন্য তৃতীয় কোনো পথ, অর্থাৎ বয়স না বেড়ে হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকা, কুরআনে কোথাও নেই। তা ছাড়া মহানবী (সা.) যখন এই জগৎ ছেড়েছেন, তখন অন্য কারও এভাবে বেঁচে থাকার দাবি মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বড় মর্যাদা তাঁকে দিয়ে দেয়।

ঈসা (আ.) নিজেই তো বলেছেন, “যতদিন জীবিত থাকি”?

হ্যাঁ, আর এই কথাটিও একটি সাক্ষ্য। কুরআনে ঈসা (আ.)-এর মুখে আছে, আল্লাহ “যতদিন আমি জীবিত থাকি তিনি আমাকে নামায ও যাকাত আদায় করার বিশেষ নির্দেশ দিয়াছেন” (সূরা মারইয়াম ১৯:৩২)। আলইসলাম.অর্গে প্রশ্ন তোলা হয়েছে: তিনি যদি আকাশে জীবিত থাকেন, তাহলে সেখানে যাকাত দেবেন কাকে? যাকাত তো পৃথিবীর মানুষের জন্য। তার ঠিক পরেই তিনি নিজের জীবনের তিনটি দিনের কথা বলেছেন: জন্মের দিন, মৃত্যুর দিন, আর পুনরুত্থানের দিন (১৯:৩৪)। সশরীরে আকাশে যাওয়া আর নেমে আসার মতো বিশাল ঘটনা থাকলে তা এই তালিকায় থাকার কথা ছিল।

যাঁদের ডাকা হয়, তাঁরা কি সবাই মৃত?

আল্লাহ বলেন, মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ডাকে, তারা “সকলেই মৃত, জীবিত নহে” (সূরা আন-নাহল ১৬:২২)। কোটি কোটি মানুষ আজ ঈসা (আ.)-কে ডাকে, তাঁর কাছে প্রার্থনা করে। আলইসলাম.অর্গের ব্যাখ্যায় তাই বলা হয়েছে, এই আয়াতের আওতায় ঈসা (আ.)-ও আছেন; তিনিও মৃত।

সংক্ষেপে

  1. নবীদের দেহ খাবারের মুখাপেক্ষী ছিল এবং তাঁরা চিরকাল বাঁচার জন্য ছিলেন না (২১:৯)।
  2. মহানবী (সা.)-এর আগে কোনো মানুষকে চিরস্থায়ী জীবন দেওয়া হয়নি (২১:৩৫)।
  3. দীর্ঘ জীবন মানে ক্রমশ দুর্বলতা ও বার্ধক্য; দুই হাজার বছর অপরিবর্তিত থাকা কুরআনের নিয়মের বিপরীত।
  4. মানব-রসূলের সশরীরে আকাশে ওঠা আল্লাহর নিয়ম নয় (১৭:৯৪); হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এমন ত্রিশটি আয়াত তুলে ধরেছেন।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.