মহানবী (সা.) নিজে তাঁর পরের নবুয়্যত নিয়ে কী বলেছেন?

এক শিশুপুত্রের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মহানবী (সা.) একটি কথা বলেছিলেন। খাতামান নাবিয়্যীনের আয়াত নাযিলের চার বছর পরে বলা সেই কথাটি অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

মদীনায় শোকের ছায়া। মহানবী (সা.)-এর শিশুপুত্র ইবরাহীম মারা গেছেন। নবী (সা.) নিজে তাঁর জানাযার নামায পড়ালেন। তারপর ভারী মনে এমন একটি কথা বললেন, যা আজও আলেমদের ভাবায়।

মনে রাখুন, খাতামান নাবিয়্যীনের আয়াত নাযিল হয়েছিল হিজরী পঞ্চম বছরে। আলইসলাম ডট অর্গের হিসাব অনুযায়ী ইবরাহীমের মৃত্যু তার প্রায় চার বছর পরে।

إِنَّ لَهُ مُرْضِعًا فِي الْجَنَّةِ وَلَوْ عَاشَ لَكَانَ صِدِّيقًا نَبِيًّا
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ইবরাহীমের মৃত্যুর পর রসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর জানাযা পড়ালেন এবং বললেন: “জান্নাতে তার জন্য একজন দুধমা আছেন। আর সে যদি বেঁচে থাকত, তাহলে সে হতো একজন সিদ্দীক নবী।”
সুনান ইবনে মাজাহ, কিতাবুল জানায়েয, হাদীস ১৫১১

একটি বাক্য, অনেক উত্তর

ভাবুন, মহানবী (সা.) যদি খাতামান নাবিয়্যীন বলতে বুঝতেন যে তাঁর পরে আর কোনো ধরনের নবী আসাই অসম্ভব, তাহলে তিনি কী বলতেন? হয়তো বলতেন, “ছেলেটি পবিত্র ছিল, কিন্তু হাজার বছর বাঁচলেও নবী হতো না, কারণ নবুয়্যতের দরজা বন্ধ।”

কিন্তু তিনি তা বলেননি। তিনি বললেন, বেঁচে থাকলে সে নবী হতো। খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) এই বিষয়টিই তুলে ধরেছেন: কোনো জিনিস একেবারে অসম্ভব হলে, “বেঁচে থাকলে হতো” কথাটির কোনো অর্থ থাকে না।

পরবর্তী যুগের বড় আলেমরাও এই অর্থ বুঝেছেন। বিখ্যাত হানাফী আলেম মোল্লা আলী কারী (রহ.) লিখেছেন: ইবরাহীম যদি বেঁচে থেকে নবী হতেন, তিনি হতেন মহানবী (সা.)-এর অনুসারী নবী, আর তা খাতামান নাবিয়্যীনের পরিপন্থী হতো না; কারণ খাতামান নাবিয়্যীনের অর্থ শুধু এই যে, তাঁর পরে এমন কোনো নবী আসবেন না যিনি তাঁর শরীয়ত রহিত করবেন এবং তাঁর উম্মতের নন (আল-আসরারুল মারফূআ, পৃষ্ঠা ১৯২)।

সৃষ্টির শুরুতেই খাতাম

আরেকটি হাদীস খাতামিয়্যাতকে সময়ের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে দেয়। হযরত ইরবায বিন সারিয়া (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন: আমি আল্লাহর কাছে তখনই খাতামান নাবিয়্যীন হিসেবে লিপিবদ্ধ ছিলাম, যখন আদম (আ.) তখনো তাঁর মাটির খামিরে মিশে ছিলেন (মিশকাতুল মাসাবীহ, কিতাবুল ফাযায়েল, বাবু ফাযায়েলি সাইয়িদিল মুরসালীন)।

হযরত খলীফাতুল মসীহ খামেস (আই.)-এর একটি উত্তরে উল্লেখ করা হয়েছে, এরপরেই বহু নবী পৃথিবীতে এসেছেন। অর্থাৎ মহানবী (সা.) খাতাম ছিলেন, আর তার পরেও নবীরা এসেছেন। খাতামিয়্যাত সময়ের তালিকার শেষ ঘর নয়, মর্যাদার সর্বোচ্চ আসন।

✦

শেষ যুগের মসীহকে “আল্লাহর নবী” বলা

সহীহ মুসলিমের কিতাবুল ফিতানে হযরত নাওয়াস বিন সামআন (রা.)-এর দীর্ঘ হাদীসে শেষ যুগের ঘটনাবলি বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আগমনকারী মসীহকে মহানবী (সা.) চারবার বলেছেন নাবিয়ুল্লাহ ঈসা, আল্লাহর নবী ঈসা।

ثُمَّ يَهْبِطُ نَبِيُّ اللَّهِ عِيسَى وَأَصْحَابُهُ إِلَى الأَرْضِ … فَيَرْغَبُ نَبِيُّ اللَّهِ عِيسَى وَأَصْحَابُهُ إِلَى اللَّهِ
“তারপর আল্লাহর নবী ঈসা ও তাঁর সঙ্গীরা (পাহাড় থেকে) সমতলে নেমে আসবেন… তখন আল্লাহর নবী ঈসা ও তাঁর সঙ্গীরা আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করবেন।”
সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, দাজ্জালের বর্ণনা-বিষয়ক অধ্যায়

আর হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন:

لَيْسَ بَيْنِي وَبَيْنَهُ نَبِيٌّ يَعْنِي عِيسَى وَإِنَّهُ نَازِلٌ
“আমার ও তাঁর, অর্থাৎ ঈসার, মাঝে কোনো নবী নেই; আর তিনি অবশ্যই অবতরণ করবেন।”
সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল মালাহিম, হাদীস ৪৩২৪

লক্ষ করুন, “আমার ও তাঁর মাঝে কোনো নবী নেই” কথাটির মধ্যেই আছে, তিনি নিজে একজন নবী। নইলে “মাঝে” শব্দের কোনো অর্থ থাকে না।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর উক্তিও এই সুরে বাঁধা: “তোমরা বলো, তিনি খাতামান নাবিয়্যীন; কিন্তু এ কথা বলো না যে তাঁর পরে কোনো নবী নেই” (আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৬১৮)।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

ইবনে মাজাহতেই তো আছে, “তাঁর পরে কোনো নবী নেই, তাই ইবরাহীম বাঁচেননি”?

হ্যাঁ, ঠিক আগের হাদীসে (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৫১০) ইসমাঈল বিন আবু খালিদ বলেন, তিনি সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আবু আওফা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। সাহাবী উত্তর দেন, যদি মুহাম্মদ (সা.)-এর পরে কোনো নবী হওয়া নির্ধারিত থাকত, তাঁর ছেলে বেঁচে থাকত।

দুটি বর্ণনা পাশাপাশি রাখুন। ১৫১০ নম্বরে কথাটি একজন সাহাবীর নিজের ব্যাখ্যা। ১৫১১ নম্বরে কথাটি মহানবী (সা.)-এর মুখের। আর মহানবী (সা.) তাঁর ছেলের মৃত্যুর কারণ হিসেবে নবুয়্যতের দরজা বন্ধ থাকার কথা বলেননি; বলেছেন, বেঁচে থাকলে সে নবী হতো। নবী (সা.)-এর কথাই চূড়ান্ত।

ইবরাহীম-বিষয়ক হাদীসের সনদ কি দুর্বল নয়?

কয়েকজন মুহাদ্দিস ইবনে মাজাহর এই সনদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এটি সত্য। কিন্তু আলইসলাম ডট অর্গে উল্লেখিত হযরত আলী (রা.)-এর বর্ণনায় একই ঘটনা আরও বিস্তারিত এসেছে: ইবরাহীমকে দাফনের পর মহানবী (সা.) কবরের উপর হাত রেখে বললেন, “আল্লাহর কসম, সে নবী এবং নবীর পুত্র” (ইবনে হাজার, আল-ফাতাওয়াল হাদীসিয়্যা, পৃষ্ঠা ১৭৬)। আর মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর মতো সমালোচক আলেম এই বক্তব্যের অর্থ মেনে নিয়েই ব্যাখ্যা করেছেন, যা আমরা উপরে দেখেছি। উম্মতের বড় আলেমরা এই কথাকে খাতামিয়্যাতের পরিপন্থী মনে করেননি।

নবী ঈসা (আ.) তো পুরোনো নবী, তাঁকে “নবী” বলায় নতুন কিছু প্রমাণ হয় কি?

বিরোধী আলেমদের বিশ্বাস অনুযায়ীও মহানবী (সা.)-এর পরে একজন নবী আসবেন, আর তিনি নবী হিসেবেই আসবেন। অর্থাৎ “তাঁর পরে কোনো ধরনের নবী আসবেন না” কথাটি দুই পক্ষের কেউই মানেন না। প্রশ্ন শুধু, তিনি কে হবেন। হযরত শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) মাপকাঠি দিয়েছেন: মহানবী (সা.)-এর পরে এমন কোনো নবী হতে পারেন না, যিনি তাঁর মাধ্যম ছাড়া স্বাধীনভাবে কল্যাণ পান (আল-খায়রুল কাসীর, পৃষ্ঠা ৭৮)। তাই আহমদীরা বিশ্বাস করেন, প্রতিশ্রুত মসীহ এই উম্মত থেকেই, মহানবী (সা.)-এর অনুসারী হয়ে আসার কথা ছিল, আর তিনি এসেছেন।

সংক্ষেপে

  1. খাতামান নাবিয়্যীনের আয়াতের চার বছর পরে মহানবী (সা.) বলেছেন, ইবরাহীম বেঁচে থাকলে সিদ্দীক নবী হতো (ইবনে মাজাহ ১৫১১)।
  2. আদম (আ.) সৃষ্টির আগেই তিনি খাতামান নাবিয়্যীন ছিলেন; তাই খাতামিয়্যাত সময়ের নয়, মর্যাদার বিষয়।
  3. শেষ যুগের মসীহকে মহানবী (সা.) চারবার “আল্লাহর নবী” বলেছেন (সহীহ মুসলিম), আর বলেছেন “আমার ও তাঁর মাঝে কোনো নবী নেই” (আবু দাউদ ৪৩২৪)।
  4. মোল্লা আলী কারী (রহ.)সহ বড় আলেমরা বলেছেন, অনুসারী নবী খাতামিয়্যাতের পরিপন্থী নয়।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.