হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। একসময় যিনি ইসলামের কঠোর শত্রু ছিলেন, ইসলাম গ্রহণের পর তিনিই হয়ে উঠলেন এর অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ। তাঁর ন্যায়বিচার, দূরদৃষ্টি আর আল্লাহভীতি ইতিহাসে প্রবাদ।
এই মহান সাহাবী সম্পর্কে জামে তিরমিযীতে একটি বর্ণনা আছে, যা খতমে নবুয়্যতের আলোচনায় বারবার উদ্ধৃত হয়।
বিরোধী আলেমরা বলেন: উমর (রা.) মহানবী (সা.)-এর পরে বেঁচে ছিলেন, অথচ নবী হননি। অতএব নবুয়্যতের সব দরজা বন্ধ।
ইমাম তিরমিযী নিজে কী লিখেছেন
যে কথাটি সাধারণত বাদ পড়ে যায়, তা হলো হাদীসটির ঠিক পরেই ইমাম তিরমিযী (রহ.)-এর নিজের মন্তব্য:
অর্থাৎ পুরো হাদীসটি টিকে আছে একজন মাত্র বর্ণনাকারীর উপর। হাদীস-বিশারদদের জীবনী-গ্রন্থ তাহযীবুত তাহযীবে (খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ১৫৫) ইবনে হিব্বানের মন্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে: মিশরাহ দুর্বল বর্ণনাকারীদের একজন, তাঁর উপর নির্ভর করা যায় না, বিশেষ করে যখন তিনি একা কোনো বর্ণনা করেন। আলইসলাম ডট অর্গে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি হাজ্জাজের সেই বাহিনীতে ছিলেন, যারা হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রা.)-কে অবরোধ করে কাবার দিকে পাথর ছুড়েছিল।
যে বিশ্বাসকে ইসলামের একটি মৌলিক বিষয় বলা হয়, তার ভিত্তি কি এমন একক সূত্রের বর্ণনার উপর রাখা যায়?
একই কথার অন্য বর্ণনাগুলো
উমর (রা.)-এর মর্যাদা নিয়ে আরও বর্ণনা আছে, যেগুলো এই হাদীসের অর্থ পরিষ্কার করে। আলইসলাম ডট অর্গে উদ্ধৃত:
“হে উমর, আমি যদি নবী হিসেবে প্রেরিত না হতাম, তাহলে তুমি প্রেরিত হতে” (মিরকাতুল মাফাতীহ শরহে মিশকাত, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৪০৩)।
“আমি যদি তোমাদের মধ্যে প্রেরিত না হতাম, তাহলে উমর প্রেরিত হতো” (কুনূযুল হাকায়েক, ইমাম আব্দুর রউফ মুনাভী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৪)।
এবার অর্থটি পরিষ্কার। কথা হচ্ছে উমর (রা.)-এর ভেতরের যোগ্যতার। মহানবী (সা.) প্রেরিত না হলে সেই দায়িত্ব হয়তো উমর (রা.)-কে দেওয়া হতো। এখানে বা’দী শব্দটি “আমি ছাড়া” অর্থে এসেছে, ঠিক যেমন হযরত শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.) অন্য হাদীসে এর অর্থ করেছেন গাইরী, “আমি ছাড়া”।
ইবরাহীমের হাদীসের পাশে রাখলে
উমর (রা.)-এর হাদীসের পাশে আরেকটি হাদীস রাখুন। শিশুপুত্র ইবরাহীমের মৃত্যুর পর মহানবী (সা.) বলেছেন: “সে যদি বেঁচে থাকত, তাহলে সিদ্দীক নবী হতো” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৫১১)।
মোল্লা আলী কারী (রহ.) দুটি হাদীস একসঙ্গে ব্যাখ্যা করে লিখেছেন: ইবরাহীম যদি বেঁচে থেকে নবী হতেন, আর উমরও যদি নবী হতেন, দুজনই হতেন মহানবী (সা.)-এর অনুসারী নবী, আর তা খাতামান নাবিয়্যীনের পরিপন্থী হতো না; কারণ খাতামান নাবিয়্যীন মানে শুধু এই যে, তাঁর পরে এমন কোনো নবী আসবেন না যিনি তাঁর শরীয়ত রহিত করবেন এবং তাঁর উম্মতের নন (আল-আসরারুল মারফূআ, পৃষ্ঠা ১৯২)।
খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) আরেকটি বর্ণনাও উল্লেখ করেছেন, যা হযরত আলী (রা.) থেকে এসেছে। ইবরাহীমকে দাফনের পর মহানবী (সা.) কবরের উপর হাত রেখে বলেছিলেন, “আল্লাহর কসম, সে নবী এবং নবীর পুত্র” (ইবনে হাজার, আল-ফাতাওয়াল হাদীসিয়্যা, পৃষ্ঠা ১৭৬)। আলী (রা.) ছিলেন পরিবারেরই সদস্য, তাই তাঁর বর্ণনা আরও বিস্তারিত।
একটি দিকে মিশরাহর একক সূত্রের বর্ণনা, অন্য দিকে নবুয়্যতের ধারণাকে সম্ভব বলে দেখানো একাধিক বর্ণনা আর উম্মতের বড় আলেমদের ব্যাখ্যা। কোন দিকে ভার বেশি, তা পাঠক নিজেই বিচার করতে পারেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“হাসান” হাদীস তো গ্রহণযোগ্য; তাহলে একে দুর্বল বলা কেন?
ইমাম তিরমিযী একে “হাসান গরীব” বলেছেন, আর সঙ্গে জানিয়েছেন এর একটিমাত্র সূত্র। আমরা সেই কথাই হুবহু তুলে ধরেছি। আর বর্ণনাকারী সম্পর্কে ইবনে হিব্বানের সমালোচনাও আমাদের নয়, হাদীস-শাস্ত্রের বই থেকে। তবে আসল কথা হলো: হাদীসটি গ্রহণ করলেও, উপরের অন্য বর্ণনাগুলো দেখিয়ে দেয় এর অর্থ উমর (রা.)-এর যোগ্যতার প্রশংসা, নবুয়্যতের সব রূপের চিরসমাপ্তি নয়।
উমর (রা.) নবী হননি, এটাই কি প্রমাণ নয় যে দরজা বন্ধ?
নবুয়্যত কারো যোগ্যতার পুরস্কার হিসেবে আপনা-আপনি আসে না। এটি সম্পূর্ণ আল্লাহর নির্বাচন, যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী:
খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) এই আলোচনার শিরোনামই দিয়েছেন “যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী নবীর আগমন”। মহানবী (সা.) জীবিত ছিলেন, তাঁর পরে খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; তখন নতুন কোনো নবীর প্রয়োজন ছিল না। উমর (রা.) নবী না হওয়ায় শুধু এটুকুই প্রমাণ হয় যে সেই সময় আল্লাহ কাউকে নবী করেননি। ভবিষ্যতে কখনো করবেন না, তা প্রমাণ হয় না। আর শেষ যুগের জন্য মহানবী (সা.) নিজেই “আল্লাহর নবী ঈসা”-র আগমনের সংবাদ দিয়ে গেছেন (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান)।
আর হযরত উমর (রা.)-এর মর্যাদার কথা বললে, আহমদীরা তাঁকে উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন বলে বিশ্বাস করেন, মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় খলীফা। এই হাদীস তাঁর মর্যাদার সাক্ষ্য; একে নবুয়্যতের সব দরজা বন্ধের দলিল বানানোর প্রয়োজন নেই।
সংক্ষেপে
- ইমাম তিরমিযী নিজেই হাদীসটিকে “হাসান গরীব” বলেছেন এবং জানিয়েছেন এর একমাত্র সূত্র মিশরাহ বিন হাআন; ইবনে হিব্বান তাঁকে নির্ভরযোগ্য মনে করেননি।
- অন্য বর্ণনায় এসেছে, “আমি প্রেরিত না হলে উমর প্রেরিত হতো”, যা উমর (রা.)-এর যোগ্যতার প্রশংসা।
- মোল্লা আলী কারী (রহ.) বলেছেন, উমর বা ইবরাহীম নবী হলে তাঁরা হতেন অনুসারী নবী, যা খাতামিয়্যাতের পরিপন্থী নয়।
- নবুয়্যত আল্লাহর নির্বাচন; কোনো একজন নবী না হওয়া দরজা চিরতরে বন্ধের প্রমাণ নয়।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Advent of a Prophet According to the Need of the Time · alislam.org
- Ahmadis believe in Khatam-e-Nabuwwat · alislam.org
- The Real Significance of Hadith La Nabiyya Ba‘di · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.