সব নবী কি একই রকম? কুরআনে নবুয়্যতের তিনটি রূপ

মূসা (আ.) এনেছিলেন নতুন শরীয়ত, হারুন (আ.) আনেননি, তবু দুজনই নবী। এই পার্থক্য বুঝলে খতমে নবুয়্যতের জট অনেকটাই খুলে যায়।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

তূর পাহাড়ের দিকে রওনা হওয়ার আগে হযরত মূসা (আ.) তাঁর জাতির দায়িত্ব দিয়ে গেলেন ভাই হারুন (আ.)-কে। হারুন (আ.) কোনো নতুন কিতাব আনেননি। তিনি চলতেন মূসা (আ.)-এর শরীয়ত অনুযায়ী। তবু কুরআন তাঁকে নবী বলেছে:

وَوَہَبۡنَا لَہٗ مِنۡ رَّحۡمَتِنَاۤ اَخَاہُ ہٰرُوۡنَ نَبِیًّا
“এবং আমরা তাহাকে আমাদের রহমত হইতে তাহার ভাই হারূনকে (সাহায্যকারীরূপে) দান করিয়াছিলাম, যাহাকে (আমরা) নবী করিয়াছিলাম।”
সূরা মারইয়াম ১৯:৫৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ১৯:৫৩।

এই ছোট্ট উদাহরণ একটি বড় সত্য দেখায়: নবী হওয়ার জন্য নতুন শরীয়ত আনা জরুরি নয়। কুরআন ও উম্মতের বুযুর্গদের লেখা থেকে নবুয়্যতের তিনটি রূপ পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

প্রথম রূপ: শরীয়তবাহী স্বাধীন নবুয়্যত

এই নবীরা আল্লাহর কাছ থেকে নতুন শরীয়ত বা আইন নিয়ে আসেন। যেমন হযরত মূসা (আ.) এনেছিলেন তওরাত। আর সবচেয়ে পূর্ণ ও চূড়ান্ত শরীয়ত নিয়ে এসেছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.), পবিত্র কুরআন।

আহমদীয়া জামাত বিশ্বাস করে, এই ধরনের নবুয়্যত মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে চিরতরে শেষ। কুরআনের পর আর কোনো শরীয়ত আসবে না।

দ্বিতীয় রূপ: শরীয়তবিহীন স্বাধীন নবুয়্যত

এই নবীরা নতুন শরীয়ত আনেননি, আগের শরীয়তের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু তাঁরা সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে নবুয়্যত পেয়েছিলেন, অন্য কোনো নবীর আনুগত্যের ফল হিসেবে নয়। কুরআন বলে, তওরাত অনুযায়ী বহু নবী ফয়সালা করতেন:

اِنَّاۤ اَنۡزَلۡنَا التَّوۡرٰٮۃَ فِیۡہَا ہُدًی وَّنُوۡرٌ ۚ یَحۡکُمُ بِہَا النَّبِیُّوۡنَ الَّذِیۡنَ اَسۡلَمُوۡا
“নিশ্চয় আমরা তওরাত নাযেল করিয়াছিলাম—উহাতে হেদায়াত এবং নূর ছিল, ইহা দ্বারা নবীগণ যাহারা আত্মসমর্পণকারী ছিল… ইহুদীদের জন্য ফয়সালা করিত…”
সূরা আল-মায়েদা ৫:৪৫

হযরত হারুন, দাউদ, সুলায়মান ও ঈসা (আ.) এই শ্রেণির। আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত “Truth Prevails” বইয়ে বলা হয়েছে, হারুন (আ.) নতুন শরীয়তের নবী ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন মুস্তাকিল, অর্থাৎ স্বাধীন নবী। আর এই ধরনের স্বাধীন নবীদের সারিতে মহানবী (সা.)-ই শেষ।

✦

তৃতীয় রূপ: উম্মতী বা যিল্লী নবুয়্যত

এটি এক অনন্য মর্যাদা, যা শুধু মহানবী (সা.)-এর উম্মতের জন্য। এই নবী নতুন শরীয়ত আনেন না, আর সরাসরি স্বাধীনভাবেও নবুয়্যত পান না। তিনি নবুয়্যত পান মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্যের ফলে, তাঁর আলোর প্রতিফলন হিসেবে। তাই তাঁকে বলা হয় উম্মতী নবী, অথবা যিল্লী (ছায়া) নবী।

কুরআনের প্রতিশ্রুতি এই দরজাটির কথাই বলে: যে আল্লাহ ও “এই রসূলের” আনুগত্য করবে, সে নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহদের অন্তর্ভুক্ত হবে (সূরা আন-নিসা ৪:৭০)। প্রতি রাকাতে আমরা সূরা ফাতিহায় দোয়া করি, “তাহাদের পথে, যাহাদিগকে তুমি পুরস্কৃত করিয়াছ” (সূরা আল-ফাতিহা ১:৭)।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন: মুহাম্মদী নবুয়্যত ছাড়া সব নবুয়্যত শেষ হয়েছে; কোনো শরীয়তবাহী নবী আসতে পারেন না; শরীয়তবিহীন নবী আসতে পারেন, কিন্তু তাঁকে প্রথমে উম্মতী হতে হবে (তাজাল্লিয়াতে ইলাহিয়্যা, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ৪১২)।

এই তৃতীয় রূপ মহানবী (সা.)-এর এক বিশেষ মর্যাদা। আর কোনো নবীর আনুগত্য করে কেউ নবী হননি। শুধু তাঁর অনুসরণের মধ্যেই এই শক্তি রাখা হয়েছে।

একটি সহজ উপমা দিয়ে তিনটি রূপ মনে রাখা যায়। প্রথম রূপ যেন সূর্য, নিজের আলো নিয়ে আসে, নতুন দিন শুরু করে। দ্বিতীয় রূপ যেন আরেকটি প্রদীপ, যা আলাদাভাবে জ্বালানো, কিন্তু আগের দিনের আলোতেই পথ দেখায়। আর তৃতীয় রূপ যেন চাঁদ, যার নিজের কোনো আলো নেই; সূর্যের আলো প্রতিফলিত করেই সে রাতের অন্ধকার দূর করে। চাঁদ যত উজ্জ্বলই হোক, তার আলো সূর্যেরই আলো। উম্মতী নবীর নবুয়্যতও তেমনি মহানবী (সা.)-এরই নবুয়্যতের আলো।

এই কারণেই এমন নবীর আগমন মহানবী (সা.)-এর খাতামিয়্যাতকে ভাঙে না, বরং তার প্রমাণ দেয়। চাঁদের আলো দেখে মানুষ সূর্যের অস্তিত্বই বুঝতে পারে।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

এই শ্রেণিবিভাগ কি আহমদীদের বানানো?

না। শায়খুল আকবর ইবনে আরাবী (রহ.) চার ভাগের কথা বলেছেন: বেলায়েত, বেলায়েতের নবুয়্যত, শরীয়তের নবুয়্যত ও রিসালাত। তাঁর মতে শরীয়তের নবুয়্যত ও রিসালাত মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে শেষ, বাকিগুলো চলমান। সাইয়েদ আব্দুল করীম জীলী (রহ.) লিখেছেন, শরীয়তবাহী নবুয়্যত মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে পূর্ণ হয়েছে, আর এই অর্থে তিনি খাতামান নাবিয়্যীন (আল-ইনসানুল কামিল, অধ্যায় ৩৬)। মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) লিখেছেন, বেলায়েত হলো নবুয়্যতের ছায়া (মাকতুবাত, দ্বিতীয় খণ্ড, মাকতুব ৭১)। “যিল্ল” বা ছায়ার ধারণা তাই উম্মতের জ্ঞানচর্চায় বহু পুরোনো।

ঈসা (আ.)-ও তো শরীয়ত আনেননি; তাহলে তিনি এলে সমস্যা কোথায়?

সমস্যা হলো, তিনি দ্বিতীয় রূপের নবী, স্বাধীন নবী। তিনি নবুয়্যত পেয়েছিলেন মহানবী (সা.)-এর বহু আগে, তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে নয়। হযরত শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.)-এর ভাষায়, মহানবী (সা.)-এর পরে এমন কেউ নবী হতে পারেন না, যিনি তাঁর মাধ্যম ছাড়া স্বাধীনভাবে কল্যাণ পান (আল-খায়রুল কাসীর, পৃষ্ঠা ৭৮)। স্বাধীন নবীদের সারি মহানবী (সা.)-এ শেষ, তাই সেই সারির কারো ফিরে আসা খাতামিয়্যাতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। খোলা আছে শুধু তৃতীয় দরজা।

উম্মতী নবী এলে কি ঈমানের নতুন শর্ত যুক্ত হয়?

উম্মতী নবী কোনো নতুন শরীয়ত বা নতুন কালেমা আনেন না। তিনি আসেন কুরআন আর মহানবী (সা.)-এর সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে। আর তাঁকে চেনা ও মানার নির্দেশ মহানবী (সা.) নিজেই দিয়ে গেছেন: আগমনকারী মসীহ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “যখন তোমরা তাঁকে দেখবে, তাঁকে চিনে নিও” (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৪৩২৪)। তাঁকে মানা আসলে মহানবী (সা.)-এর কথাকেই মানা।

এই তিনটি রূপ মনে রাখলে খতমে নবুয়্যতের অনেক প্রশ্নের উত্তর সহজ হয়ে যায়। যখন কেউ বলেন “নবুয়্যত শেষ”, তখন জিজ্ঞেস করা যায়: কোন রূপের নবুয়্যত? প্রথম দুইটি, হ্যাঁ, শেষ। তৃতীয়টি মহানবী (সা.)-এর জীবন্ত কল্যাণের নাম, আর তা কিয়ামত পর্যন্ত খোলা।

সংক্ষেপে

  1. প্রথম রূপ, শরীয়তবাহী স্বাধীন নবুয়্যত (যেমন মূসা (আ.)), মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে চিরতরে শেষ।
  2. দ্বিতীয় রূপ, শরীয়তবিহীন স্বাধীন নবুয়্যত (যেমন হারুন ও ঈসা (আ.)), এর সারিও তাঁর সঙ্গে শেষ।
  3. তৃতীয় রূপ, উম্মতী বা যিল্লী নবুয়্যত, শুধু মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্য থেকে জন্মায়; এটি তাঁর অনন্য মর্যাদা।
  4. ইবনে আরাবী, আব্দুল করীম জীলী ও মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)-এর লেখায় এই ধারণার শিকড় আছে।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.