সেকালের পৃথিবী তখন দুই পরাশক্তির হাতে। পশ্চিমে রোমের কায়সার, পূর্বে পারস্যের কিসরা। মদীনার ছোট্ট মুসলিম সমাজের কাছে এঁরা ছিলেন অজেয়। সেই সময় মহানবী (সা.) একটি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন:
এবার ইতিহাস দেখুন। মহানবী (সা.)-এর পরে কি রোমে আর কোনো কায়সার বসেননি? বসেছেন, বহু শতাব্দী ধরে। তাহলে কি নবী (সা.)-এর কথা ভুল হলো? কখনো নয়। অর্থ ছিল, সেই প্রতাপ আর মহিমার কোনো কিসরা বা কায়সার আর থাকবে না।
এই হাদীসটি মনে রেখে এবার সেই বিখ্যাত বাক্যটির দিকে তাকাই: লা নাবিয়্যা বা’দী, আমার পরে কোনো নবী নেই।
পুরো হাদীসটি পড়লে
অনেক সময় এই তিনটি শব্দ আলাদা করে শোনানো হয়। কিন্তু সহীহ বুখারীতে পুরো হাদীসটি এরকম। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন:
প্রসঙ্গটি দেখুন। কথা হচ্ছে বনী ইসরাঈলের সেই ধারার, যেখানে এক নবীর মৃত্যুর পর আরেক নবী এসে জাতির শাসনভার নিতেন। মহানবী (সা.) বলছেন, আমার পরে এমনটা হবে না; আমার পরে আসবেন খলীফারা। অর্থাৎ তাঁর ঠিক পরে পরে স্বাধীন, শাসক নবীদের সেই ধারা চলবে না।
“বা’দ” আর “লা” শব্দের ভাষা
আরবি বা’দ শব্দের অর্থ শুধু সময়ের “পরে” নয়। কুরআনেই এর উদাহরণ আছে:
“আল্লাহর পরে” মানে কি আল্লাহর মৃত্যুর পরে? নাউযুবিল্লাহ। হযরত শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) এই আয়াত দেখিয়েই বলেছেন, এখানে বা’দ মানে “ছাড়া” বা “বিপরীতে” (কুররাতুল আইনাইন, পৃষ্ঠা ২০৬)।
আর লা (না) শব্দটি সব সময় পুরো জাতিকে বাতিল করে না। কায়সারের হাদীস তার প্রমাণ। হযরত মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবী (রহ.) লিখেছেন: কায়সার ও কিসরার হাদীস নিয়ে ভেবে আমি বুঝেছি, “লা নাবিয়্যা বা’দী” বলে মহানবী (সা.) একই ধরনের কথা বলেছেন; নবুয়্যত পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি, শেষ হয়েছে শুধু নতুন শরীয়ত নিয়ে আসা নবুয়্যত (আল-ফুতূহাতুল মাক্কিয়্যা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০৩)।
ভাষায় এমন ব্যবহার আরও আছে। তালুতের সৈন্যরা বলেছিল, “আজ আমাদের মধ্যে জালুত এবং তাহার সৈন্যবাহিনীর সহিত মোকাবেলা করিবার আদৌ ক্ষমতা নাই” (সূরা আল-বাকারা ২:২৫০)। তাদের কি দেখার, শোনার, হাঁটার কোনো শক্তিই ছিল না? না, শুধু ওই যুদ্ধের শক্তি ছিল না। আবার মহানবী (সা.) বলেছেন, “মক্কা বিজয়ের পরে আর হিজরত নেই” (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৭৮৩)। অথচ আল্লাহর পথে হিজরত আজও চলছে; শেষ হয়েছে মক্কা থেকে মদীনার সেই বিশেষ হিজরত।
উম্মতের আলেমরা কী বুঝেছিলেন
হযরত আয়েশা (রা.) বলেছেন: “তোমরা বলো, তিনি খাতামান নাবিয়্যীন; কিন্তু এ কথা বলো না যে তাঁর পরে কোনো নবী নেই” (আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৬১৮)। ইমাম আব্দুল ওয়াহহাব শারানী (রহ.) লিখেছেন, “আমার পরে নবী নেই, রসূল নেই” মানে শুধু এই যে, তাঁর পরে কোনো শরীয়তবাহী নবী নেই (আল-ইয়াওয়াকীত ওয়াল জাওয়াহির, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৫)। হযরত শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.) লিখেছেন, এই কথা থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় তাঁর পরে নতুন শরীয়ত নিয়ে কোনো নবী আসবেন না (কুররাতুল আইনাইন, পৃষ্ঠা ৩১৯)।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
কথা তো স্পষ্ট: “আমার পরে কোনো নবী নেই।” ব্যাখ্যার কী দরকার?
“যখন কায়সার ধ্বংস হবে, তার পরে আর কোনো কায়সার নেই”, এই কথাও একই রকম স্পষ্ট শোনায়। তবু আমরা সবাই ইতিহাস দেখে মেনে নিই, এর অর্থ ছিল মর্যাদা ও প্রতাপের সমাপ্তি। একই বক্তার একই বাক্যরীতিকে এক জায়গায় এক অর্থে আর আরেক জায়গায় অন্য অর্থে নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। তাছাড়া বিরোধী আলেমরাও মানেন, ঈসা (আ.) নবী হিসেবে আসবেন। তাঁরাও তাহলে এই বাক্যকে আক্ষরিক অর্থে নেন না।
বুখারীর হাদীসেই তো বলা হয়েছে, নবী নয়, খলীফা আসবেন?
ঠিক, আর আহমদী মুসলমানরা এটা পুরোপুরি মানেন: মহানবী (সা.)-এর পরে বনী ইসরাঈলের মতো একের পর এক শাসক নবী আসেননি, এসেছেন খলীফারা। কিন্তু একই মহানবী (সা.) শেষ যুগের মসীহকে চারবার “নাবিয়ুল্লাহ” বলেছেন (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান), আর বলেছেন, “আমার ও তাঁর মাঝে কোনো নবী নেই” (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৪৩২৪)। দুটি কথাই সত্য, আর দুটি একসঙ্গে তখনই মেলে, যখন বুঝি: তাঁর পরে স্বাধীন বা শরীয়তবাহী নবী নেই, কিন্তু তাঁর অনুসারী এক নবীর আগমনের সংবাদ তিনি নিজেই দিয়েছেন।
“বা’দ” মানে “ছাড়া”, এটা কি জোর করে টানা অর্থ নয়?
অর্থটি কোনো আহমদী মুসলিম আলেমের বানানো নয়। হযরত শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.) কুরআনের ৪৫:৭ আয়াত দেখিয়ে নিজেই এই অর্থ করেছেন। আর বিবেচনা করুন: আমরা “পরে” অর্থ নিলেও প্রশ্ন থাকে, কোন ধরনের নবী? উপরের আলেমরা একবাক্যে জবাব দিয়েছেন: শরীয়তবাহী নবী। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বিশ্বাসও ঠিক এটুকু।
সংক্ষেপে
- “কায়সারের পরে কায়সার নেই” কথাটির মতোই “লা নাবিয়্যা বা’দী”-তে প্রতাপ ও ধরনের সমাপ্তি বোঝানো হয়েছে, পুরো জাতির নয়।
- বুখারীর পূর্ণ হাদীসে প্রসঙ্গ বনী ইসরাঈলের শাসক নবীদের ধারা; তাঁর পরে আসবেন খলীফারা।
- কুরআনে “বা’দ” শব্দ “ছাড়া” অর্থেও এসেছে; “লা” শব্দও সব সময় সর্বাত্মক নিষেধ বোঝায় না।
- হযরত আয়েশা (রা.), ইবনে আরাবী, শারানী ও শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.) একই কথা বলেছেন: শেষ হয়েছে শরীয়তবাহী নবুয়্যত।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The Real Significance of Hadith La Nabiyya Ba‘di · alislam.org
- The Meaning of Khatamiyyat According to Ahadith · alislam.org
- Ahmadis believe in Khatam-e-Nabuwwat · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.