ত্রিশজন মিথ্যা দাবিদারের হাদীস: সতর্কবাণী, নাকি সব দরজা বন্ধের ঘোষণা?

মহানবী (সা.) সতর্ক করেছিলেন, তাঁর উম্মতে প্রায় ত্রিশজন মিথ্যা নবুয়্যতের দাবিদার আসবে। একই নবী (সা.) আবার এক সত্য আগমনকারীকে চারবার ‘আল্লাহর নবী’ বলেছেন। দুটি কথা একসঙ্গে কীভাবে বুঝব?

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

একজন দূরদর্শী পিতা সন্তানদের সতর্ক করেন: “আমি চলে যাওয়ার পর অনেকে এসে বলবে, তারা আমার পাঠানো লোক। সাবধান থেকো।” আবার তিনিই বলে যান: “তবে একজন আসবে, তাকে চিনে নিও, তার কথা মেনো।” দুটি নির্দেশ পরস্পরবিরোধী নয়। একটি ভুয়া লোকদের থেকে রক্ষা করে, অন্যটি আসল জনকে হারাতে দেয় না।

মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতকে ঠিক এমন দুটি নির্দেশ দিয়ে গেছেন।

প্রথম নির্দেশ: মিথ্যাবাদীদের থেকে সাবধান

وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي كَذَّابُونَ ثَلاَثُونَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لاَ نَبِيَّ بَعْدِي
হযরত সাওবান (রা.) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আর আমার উম্মতে ত্রিশজন মিথ্যাবাদী হবে, তাদের প্রত্যেকে দাবি করবে যে সে নবী; অথচ আমি খাতামান নাবিয়্যীন, আমার পরে কোনো নবী নেই।”
সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪২৫২; জামে তিরমিযী, হাদীস ২২১৯

সহীহ বুখারীর বর্ণনায় এসেছে, “প্রায় ত্রিশজন” দাজ্জাল ও মিথ্যাবাদী আবির্ভূত হবে, যাদের প্রত্যেকে দাবি করবে যে সে আল্লাহর রসূল (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকিব, হাদীস ৩৬০৯)।

আহমদীয়া জামাত এই হাদীস পুরোপুরি মানে। হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) বলেছেন: মহানবী (সা.) যে দরজা বন্ধ করেছেন, কেউ তা খুলতে পারে না; আর তিনি অন্য হাতে যে দরজা খুলেছেন, কেউ তা বন্ধও করতে পারে না। আসল প্রশ্ন এটাই।

দ্বিতীয় নির্দেশ: সত্য আগমনকারীকে চিনে নাও

একই মহানবী (সা.) শেষ যুগে আগমনকারী মসীহের কথা বলেছেন। সহীহ মুসলিমের কিতাবুল ফিতানে হযরত নাওয়াস বিন সামআন (রা.)-এর বর্ণনায় তিনি তাঁকে চারবার বলেছেন নাবিয়ুল্লাহ ঈসা, আল্লাহর নবী ঈসা। আর সুনান আবু দাউদে আছে:

لَيْسَ بَيْنِي وَبَيْنَهُ نَبِيٌّ يَعْنِي عِيسَى وَإِنَّهُ نَازِلٌ فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَاعْرِفُوهُ
“আমার ও তাঁর, অর্থাৎ ঈসার, মাঝে কোনো নবী নেই; আর তিনি অবশ্যই অবতরণ করবেন। যখন তোমরা তাঁকে দেখবে, তাঁকে চিনে নিও।”
সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল মালাহিম, হাদীস ৪৩২৪

অর্থাৎ ত্রিশজন হোক বা ত্রিশ লক্ষ, মিথ্যাবাদীদের সংখ্যা যত হোক না কেন, মহানবী (সা.) যাঁকে “আল্লাহর নবী” বলেছেন, তাঁর সেই মর্যাদা কেউ কেড়ে নিতে পারে না।

খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) এখানে রাশিয়ার জারের একটি গল্প শুনিয়েছেন। জার তাঁর দারোয়ানকে বলেছিলেন কাউকে ভেতরে ঢুকতে না দিতে। এক রাজপুত্র জোর করে ঢুকতে চাইলেন, দারোয়ান বাধা দিলেন। জার বেরিয়ে এসে দারোয়ানকে হুকুম দিলেন রাজপুত্রকে শাস্তি দিতে। রাজপুত্র আপত্তি করলেন, সাধারণ মানুষ কর্মকর্তাকে শাস্তি দিতে পারে না। জার দারোয়ানকে ক্যাপ্টেন বানালেন। আবার আপত্তি, আবার পদোন্নতি, শেষে দারোয়ানকে রাজপুত্রের মর্যাদাই দিয়ে দিলেন। যে ক্ষমতা একজন জারের ছিল, সেই অধিকার কি আমরা মহানবী (সা.)-কে দেব না? তিনি যাঁকে নবী বলেছেন, কোন নিয়ম দেখিয়ে আমরা তা অস্বীকার করব?

✦

ত্রিশ সংখ্যাটি পূর্ণ হয়েছিল কবে?

এই হাদীসে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা আছে, “প্রায় ত্রিশ”। যদি মহানবী (সা.)-এর পরে নবুয়্যতের প্রত্যেক দাবিদারই মিথ্যাবাদী হতো, তাহলে সংখ্যা বেঁধে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন থাকত না।

আর সেই সংখ্যা কবে পূর্ণ হলো? সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইকমালু ইকমালিল মুআল্লিমে ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-উব্বী লিখেছেন: এই হাদীসের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে; মহানবী (সা.)-এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত নবুয়্যতের মিথ্যা দাবিদারদের গুনলে এই সংখ্যা পূর্ণ হয়ে যায় (খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৫৮)।

পরে, হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর সমসাময়িক আহলে হাদীস আলেম নওয়াব সিদ্দীক হাসান খানও লিখেছেন: এই উম্মতে দাজ্জালদের আগমন সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছে এবং তাদের সংখ্যা পূর্ণ হয়ে গেছে (হিজাজুল কারামা, পৃষ্ঠা ২৩৯)। মিথ্যাবাদীদের তালিকা যখন আলেমদের নিজেদের স্বীকৃতিতে বন্ধ, তখনই সত্য আগমনকারীর সময়।

এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। হাদীসে মিথ্যাবাদীদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়েছে, আর তাদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে “দাজ্জাল ও কাযযাব”, প্রতারক ও মিথ্যাবাদী হিসেবে। অন্যদিকে আগমনকারী মসীহের পরিচয় দেওয়া হয়েছে “নাবিয়ুল্লাহ”, আল্লাহর নবী হিসেবে। মহানবী (সা.) দুই দলকে এক কাতারে রাখেননি। একজন সতর্ক পাহারাদারের মতো তিনি মিথ্যার দরজায় তালা দিয়েছেন, আর সত্যের জন্য একটি দরজা নিজের হাতে খুলে রেখেছেন।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

হযরত মির্যা সাহেবকেই তো এই ত্রিশজনের একজন বলা হয়?

সত্য ও মিথ্যা দাবিদারকে চেনার মাপকাঠি কুরআন দিয়েছে:

کَتَبَ اللّٰہُ لَاَغۡلِبَنَّ اَنَا وَرُسُلِیۡ
“আল্লাহ্ ফয়সলা করিয়া লইয়াছেনঃ ‘নিশ্চয় আমি এবং আমার রসূলগণই বিজয়ী হইব।…’”
সূরা আল-মুজাদালা ৫৮:২২
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৫৮:২১।

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) লিখেছেন: পৃথিবীর শুরু থেকে বহু মিথ্যা দাবিদার এসেছে, শুরুতে কিছু জাঁকজমক দেখিয়েছে, কিন্তু উদ্দেশ্যে সফল হয়নি, দীর্ঘ সময়ও পায়নি; আল্লাহর নবী ও তাঁদের অনুসারীরা তাদের নিশ্চিহ্ন করেছেন; এটাই আল্লাহর চিরন্তন রীতি (যাদুল মাআদ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫০০–৫০১)।

এবার মাপকাঠিটি ব্যবহার করুন। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) শুরু করেছিলেন একা, প্রায় সবার বিরোধিতার মধ্যে। দাবির পর এক শতাব্দীরও বেশি পেরিয়েছে। প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও তাঁর জামাত পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, আর তাঁর খেলাফত আজও চলমান। মিথ্যাবাদীদের পরিণতি আর এই পরিণতি এক নয়।

হাদীসেই তো সঙ্গে বলা হয়েছে, “আমার পরে কোনো নবী নেই”?

হ্যাঁ, আর এর অর্থ আমরা উম্মতের বুযুর্গদের ভাষায় দেখেছি: তাঁর পরে কোনো শরীয়তবাহী বা স্বাধীন নবী নেই। এই অর্থেই ত্রিশজনের দাবি মিথ্যা। আর একই মহানবী (সা.) বলেছেন, তাঁর ও আগমনকারী মসীহের মাঝে কোনো নবী নেই, এবং সেই মসীহকে বলেছেন আল্লাহর নবী। খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) হাফেয তাবারানীর আল-মুজামুল আওসাত থেকে একটি বর্ণনাও উল্লেখ করেছেন: আমার ও মসীহের মাঝে কোনো নবী বা রসূল নেই; তিনি আমার পরে আমার উম্মতে আমার খলীফা। অর্থাৎ মহানবী (সা.) নিজেই মিথ্যাবাদী আর প্রতিশ্রুত মসীহকে আলাদা করে দিয়েছেন: প্রথমদের থেকে সাবধান, দ্বিতীয়জনকে চিনে নাও।

সংক্ষেপে

  1. প্রায় ত্রিশজন মিথ্যা দাবিদারের হাদীস আহমদীরা পুরোপুরি মানেন; এটি এক সতর্কবাণী।
  2. একই মহানবী (সা.) আগমনকারী মসীহকে চারবার “আল্লাহর নবী” বলেছেন এবং তাঁকে চিনে নিতে বলেছেন।
  3. ইমাম উব্বী ও নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান লিখেছেন, ত্রিশজনের সংখ্যা আগেই পূর্ণ হয়েছে।
  4. কুরআন ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর মাপকাঠি: মিথ্যাবাদী টেকে না, আল্লাহর রসূল বিজয়ী হন।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.