একটি মামলার কথা ভাবুন। এক পক্ষ বলছে, “ওরা খতমে নবুয়্যত মানে না।” অন্য পক্ষ বলছে, “আমরা মানি, আর তোমাদের চেয়ে অনেক গভীরভাবে মানি।” বিচারক কী করবেন? তিনি দুই পক্ষের কথা শুনবেন, তারপর দেখবেন কার বিশ্বাস আয়াতের সঙ্গে সত্যিই মেলে।
এই লেখায় আমরা সেই কাজটিই করব। শান্তভাবে, প্রমাণ দিয়ে।
আহমদীরা নিজেরা কী বলেন
যেকোনো মানুষের বিশ্বাস জানতে হয় তার নিজের মুখ থেকে। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ, মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন: আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, যা নিয়ে আমরা বেঁচে আছি আর আল্লাহর কৃপায় যা নিয়েই এ দুনিয়া ছেড়ে যাব, তা হলো আমাদের নেতা ও প্রভু মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) খাতামান নাবিয়্যীন ও খায়রুল মুরসালীন। তাঁর মাধ্যমে ধর্ম পূর্ণ হয়েছে (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৬৯–১৭০)।
তিনি আরও লিখেছেন, আমাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ যে আমরা মহানবী (সা.)-কে খাতামান নাবিয়্যীন মানি না, এটি এক বড় মিথ্যা অপবাদ। যে শক্তি, প্রত্যয় আর গভীর উপলব্ধি নিয়ে আমরা তাঁকে খাতামান নাবিয়্যীন মানি, তা অন্যদের বিশ্বাসের চেয়ে লক্ষ গুণ দৃঢ়; তারা পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুধু একটি শব্দ পেয়েছে, এর গভীর তাৎপর্য বোঝেনি (মালফূযাত, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২২৭–২২৮)।
আহমদীয়া জামাতে যে কেউ যোগ দিতে চান, তাঁকে এই বিশ্বাসের স্বীকারোক্তি দিয়েই আসতে হয়।
দুই অর্থে পরীক্ষা
বিরোধী আলেমরা বলেন, খাতামান নাবিয়্যীন মানে সব নবীর ধারা শেষ হয়ে গেছে। ভালো কথা। এবার এই অর্থটি দুইভাবে পরীক্ষা করি।
প্রথম পরীক্ষা: দৈহিক অর্থে। যদি অর্থ হয়, মহানবী (সা.)-এর আগমনে আগের সব নবীর জীবনকাল শেষ, তাহলে আহমদীরা তা পুরোপুরি মানেন। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর আগের সব নবী মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু বিরোধী আলেমরা বলেন, একজন নবী, হযরত ঈসা (আ.), আজও আকাশে জীবিত। তাহলে “সব শেষ” কথাটি তাঁদের বিশ্বাসেই টেকে না।
দ্বিতীয় পরীক্ষা: আধ্যাত্মিক অর্থে। যদি অর্থ হয়, মহানবী (সা.)-এর আগমনে আগের নবীদের কল্যাণধারা বন্ধ হয়ে গেছে, এখন সব কল্যাণ আসবে শুধু তাঁর মাধ্যমে, তাহলে আহমদীরা তাও মানেন। কিন্তু বিরোধী আলেমরা বলেন, শেষ যুগে উম্মতকে বাঁচাতে বনী ইসরাঈলের নবী ঈসা (আ.)-কে বাইরে থেকে আসতে হবে।
কুরআন জানায়, ঈসা (আ.) ছিলেন একটি নির্দিষ্ট জাতির রসূল:
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর আধ্যাত্মিক প্রভাব কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে; তাই এই উম্মতের প্রয়োজন নেই যে বাইরে থেকে কোনো মসীহ আসবে; তাঁর কল্যাণে একজন সাধারণ মানুষও মসীহ হতে পারে, যেমন আল্লাহ আমার ক্ষেত্রে করেছেন (চশমায়ে মসীহী, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ৩৮৯)।
একজন বুযুর্গের মাপকাঠি
দ্বাদশ হিজরী শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হযরত শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) লিখেছেন: মহানবী (সা.)-এর পরে এমন কোনো নবী হতে পারেন না, যিনি তাঁর মাধ্যম ছাড়া স্বাধীনভাবে আল্লাহর কল্যাণ পান (আল-খায়রুল কাসীর, পৃষ্ঠা ৭৮)।
এবার মাপকাঠিটি দুই বিশ্বাসের উপর রাখুন। হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) দেখিয়েছেন, ঈসা (আ.) তাঁর নবুয়্যত পেয়েছিলেন মহানবী (সা.)-এর বহু আগে, তাঁর মাধ্যম ছাড়াই। তিনি পড়েছিলেন তওরাত আর ইঞ্জিল, কুরআন নয়। তিনি ফিরে এলে কি কোনো আলেমের কাছে বসে কুরআন-হাদীস শিখবেন? নাকি সরাসরি ওহী পাবেন? দুই অবস্থাতেই তিনি এমন এক নবী, যিনি মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে নবুয়্যত পাননি।
অন্যদিকে আহমদীরা যাঁকে প্রতিশ্রুত মসীহ মানেন, তিনি জন্মেছেন এই উম্মতেই, পেয়েছেন মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্যের ফলে। শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.)-এর মাপকাঠিতে কোন বিশ্বাস টেকে, তা পাঠক নিজেই বিচার করুন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
ঈসা (আ.) তো নবী হিসেবে নয়, একজন উম্মতী হিসেবে আসবেন?
অনেক আলেম এই উত্তর দেন। চলুন দেখি হাদীস কী বলে। সহীহ মুসলিমের কিতাবুল ফিতানে, দাজ্জাল-বিষয়ক অধ্যায়ে হযরত নাওয়াস বিন সামআন (রা.)-এর দীর্ঘ বর্ণনায় মহানবী (সা.) শেষ যুগের মসীহকে চারবার বলেছেন নাবিয়ুল্লাহ ঈসা, অর্থাৎ আল্লাহর নবী ঈসা। সেখানে এটাও আছে, আল্লাহ ঈসার প্রতি ওহী করবেন।
তাই যিনি আসবেন, তিনি নবীই হবেন। প্রশ্ন শুধু এটুকু: তিনি কি বাইরের, বনী ইসরাঈলের নবী, নাকি মহানবী (সা.)-এর উম্মত থেকে, তাঁর অনুসারী হয়ে?
ঈসা (আ.) তো পুরোনো নবী; নিষেধ শুধু নতুন নবীর জন্য?
আয়াতে “নতুন” বা “পুরোনো” কোনো শব্দ নেই। যদি খাতামান নাবিয়্যীন মানে হয় সব রকম নবুয়্যতের দরজা বন্ধ, তবে পুরোনো নবীর জন্যও তা বন্ধ। আর যদি পুরোনো নবীর জন্য দরজা খোলা থাকে, তাহলে স্বীকার করতে হয় যে আয়াতটি সব নবীর আগমন বন্ধ করেনি। আহমদীরা বলেন, দরজা খোলা শুধু একটি পথে: মহানবী (সা.)-এর উম্মতী হয়ে।
আহমদীরা হযরত মির্যা সাহেবকে নবী মানেন, এটাই কি অস্বীকার নয়?
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন: মহানবী (সা.)-কে খাতামান নাবিয়্যীন বলার কারণ হলো, নবুয়্যতের সব গুণ তাঁর মধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, আর তাঁর পরে কোনো শরীয়তবাহী নবী বা তাঁর উম্মতের বাইরের কোনো নবী আসতে পারেন না; যিনিই ঐশী বাক্যালাপের মর্যাদা পান, তা পান তাঁরই মাধ্যমে, আর তিনি উম্মতী নবী, স্বাধীন নবী নন (তাতিম্মা চশমায়ে মারেফাত, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২৩, পৃষ্ঠা ৩৮০)।
যে নবুয়্যত মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য থেকে জন্মায়, তা তাঁর মোহরকে ভাঙে না, বরং তাঁর মোহরেরই সাক্ষ্য দেয়। তাই প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার: যে বিশ্বাস বাইরের একজন নবীকে এনে এই উম্মতকে তাঁর মুখাপেক্ষী করে, খতমে নবুয়্যতের সঙ্গে সংঘাত সেখানেই।
সংক্ষেপে
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) স্পষ্ট লিখেছেন, তিনি ও তাঁর জামাত মহানবী (সা.)-কে খাতামান নাবিয়্যীন বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।
- “সব নবী শেষ” অর্থ ধরলে, ঈসা (আ.)-কে জীবিত মানা আর বাইরে থেকে তাঁর আগমনের অপেক্ষা সেই অর্থের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
- শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.)-এর মাপকাঠি: মহানবী (সা.)-এর মাধ্যম ছাড়া কেউ নবুয়্যত পেতে পারে না; বনী ইসরাঈলী ঈসা (আ.) এই শর্তে পড়েন না।
- আহমদীয়া বিশ্বাসে শুধু উম্মতী নবুয়্যত সম্ভব, যা মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য থেকে জন্মায় ও তাঁর মোহরের সাক্ষ্য দেয়।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Advent of a Prophet within the Ummah is Not in Conflict with ‘Khatm-e-Nubuwwat’ · alislam.org
- The Finality of Prophethood · alislam.org
- Nubuwwat within the Ummah of the Holy Prophet(sa) · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.