রাস্তার মোড়ে একটি সাইনবোর্ড, তাতে লেখা “ঢাকা ২০ কিমি”। এটি একটি চিহ্ন, পথ বোঝার একটি আলামত। আবার আকাশে হঠাৎ রংধনু দেখে কেউ বলল, “কী অপূর্ব নিদর্শন!” দুটোকেই আমরা বাংলায় “চিহ্ন” বা “নিদর্শন” বলতে পারি, কিন্তু অর্থ এক নয়।
এক শব্দের একাধিক ব্যবহার। এই সাধারণ ব্যাপারটি না বুঝলেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। আজকের আপত্তিটি ঠিক এমনই এক বিভ্রান্তি থেকে এসেছে।
আপত্তিটি কী?
একজন সমালোচক “অযথা বিভ্রান্তি” নামের একটি আহমদী পুস্তকের উল্লেখ করে বলেছেন: মির্যা সাহেব লিখেছেন আলামত, মু’জিযা, কারামত আর খরকে আদত সব একই জিনিস (রূহানী খাযায়েন ২১/৬৩); অথচ ওই পুস্তকের লেখক বলেছেন, আলামত আর মু’জিযা এক জিনিস নয়। অর্থাৎ আহমদী মুসলমানরা নিজেরাই নিজেদের প্রতিষ্ঠাতার বিরোধিতা করছে।
প্রথম কথা: মূল লেখায় কোন শব্দ?
উৎস প্রবন্ধের লেখক জানিয়েছেন, রূহানী খাযায়েন ২১ খণ্ডের ৬৩ পৃষ্ঠার ওই উদ্ধৃতিতে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) “আলামত” শব্দটি ব্যবহারই করেননি। তালিকায় “আলামত” যোগ করেছেন সমালোচক নিজে।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) মু’জিযা বলতে কী বুঝিয়েছেন, তা বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খণ্ডে খুব পরিষ্কার। সেই অধ্যায়ের নাম “মু’জিযার প্রকৃত স্বরূপ ও তার প্রয়োজন”। সেখানে তিনি লিখেছেন: মু’জিযা এমন এক অসাধারণ ঘটনা যার মতো কিছু প্রতিপক্ষ দেখাতে পারে না; এর মূল উদ্দেশ্য সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য দেখিয়ে দেওয়া। তারপর লিখেছেন, পার্থক্য দেখিয়ে দেওয়ার এমন ঘটনাকে বলা হয় মু’জিযা, অর্থাৎ অন্য কথায় নিদর্শন।
লক্ষ করুন, তিনি মু’জিযাকে বলেছেন “নিদর্শন” (আরবিতে আয়াত, উর্দুতে নিশান)। “আলামত” নয়।
কুরআনে দুটি আলাদা শব্দ
পবিত্র কুরআনও এই দুটি শব্দ আলাদা অর্থে ব্যবহার করেছে। নবীর সত্যতার প্রমাণকে কুরআন বলে আয়াত:
আর পথ চেনার সাধারণ চিহ্নকে বলে আলামাত:
মূসা (আ.)-এর লাঠি আর পাহাড়ের গায়ে পথ চেনার দাগ, দুটোকে কেউ একই জিনিস বলবে না। আমাদের দেশেও “কিয়ামতের আলামত” বলতে বোঝায় শেষ যুগের কিছু লক্ষণ, যা ঘটবে বলে আগে থেকে জানানো হয়েছে। এগুলো সময় চেনার লক্ষণ; প্রতিপক্ষের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখানো মু’জিযা নয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
তাহলে কি “অযথা বিভ্রান্তি”-র লেখক আর প্রতিষ্ঠাতার কথায় বিরোধ আছে?
না। প্রতিষ্ঠাতা বলেছেন, মু’জিযা আর নিদর্শন (আয়াত) একই জিনিসের দুই নাম। পুস্তকের লেখক বলেছেন, আলামত (লক্ষণ) আর মু’জিযা এক নয়। দুজন দুটি আলাদা শব্দ নিয়ে কথা বলছেন, আর দুটি কথাই কুরআনের ব্যবহারের সাথে মেলে। বিরোধ তৈরি হয়েছে শুধু তখন, যখন প্রথম তালিকায় এমন একটি শব্দ ঢোকানো হয়েছে যা সেখানে নেই।
মু’জিযা আর কারামত কি আলাদা নয়?
আলেমদের পরিভাষায় নবীর হাতে প্রকাশিত অসাধারণ নিদর্শনকে সাধারণত মু’জিযা আর ওলী-বুযুর্গের হাতে প্রকাশিতটিকে কারামত বলা হয়। কিন্তু দুটির উৎস এক: আল্লাহ, যিনি নিজের নিয়মের সাধারণ ধারা ভেঙে (একেই বলে খরকে আদত, অর্থাৎ অভ্যাসের ব্যতিক্রম) তাঁর বান্দার সত্যতা দেখান। মানুষ বদলালে নাম বদলায়, ভেতরের সত্য বদলায় না। তাই কোনো আলোচনায় এগুলোকে একই শ্রেণিতে রাখা আর অন্য আলোচনায় আলাদা নামে ডাকা, এ দুয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
এই শব্দের তর্ক কি আদৌ গুরুত্বপূর্ণ?
গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, কুরআন বলে, “যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নাই উহার পশ্চাদনুসরণ করিও না” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৩৭)। মূল উর্দু-আরবি না দেখে শুধু অনুবাদের ওপর ভরসা করলে এমন ভুল সহজেই হয়। যাচাই করে পড়লে দেখা যায়, এখানে আপত্তির কিছুই নেই।
হযরত মির্যা সাহেবের কাছে নিদর্শনের গুরুত্ব কতটা?
খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর সে কারণেই তিনি শব্দগুলোর অর্থ পরিষ্কার করেছেন। বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খণ্ডের সেই অধ্যায়েই তিনি লিখেছেন, নিদর্শন এতই জরুরি যে তা ছাড়া আল্লাহর অস্তিত্বেও পূর্ণ বিশ্বাস জন্মানো সম্ভব নয়। শুধু যুক্তি বলে “একজন স্রষ্টা থাকা উচিত”; কিন্তু নিদর্শন দেখায় “স্রষ্টা আছেন”। তাঁর ভাষায়, যে ধর্ম মানুষকে শুধু “থাকা উচিত” পর্যন্ত নিয়ে থেমে যায়, তা মানুষের ব্যবহারিক জীবন বদলাতে পারে না; সত্য ধর্মের চিহ্ন হলো, তা এমন জীবন্ত নিদর্শন দেখায় যা মানুষের হাতকে আল্লাহর হাতের সাথে যুক্ত করে দেয়।
এই আলোচনায় তাঁর শব্দ “মু’জিযা” আর “নিদর্শন”। লক্ষণ বা আলামতের আলোচনা এটি নয়। দুটি আলোচনা গুলিয়ে ফেললেই কল্পিত বিরোধ তৈরি হয়।
পবিত্র কুরআনও নিদর্শনকে সত্য চেনার মাপকাঠি বলেছে। আল্লাহ বলেন, তিনি মূসা (আ.)-কে নয়টি সমুজ্জ্বল নিদর্শন দিয়েছিলেন; আর তা দেখেও ফেরাউন বলেছিল, “হে মূসা! আমি নিশ্চয় তোমাকে যাদুগ্রস্ত মনে করি” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:১০২)। নিদর্শন সত্য দেখায়, কিন্তু মেনে নেওয়া না-নেওয়া মানুষের হাতে।
শেষ কথা
মু’জিযার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে তিনি নিজেই দেখিয়েছেন পবিত্র কুরআনকে। বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খণ্ডে লিখেছেন, কুরআন আরবের সব মানুষের সামনে পেশ করা হয়েছিল; বাহ্যত তা মানুষের ভাষার মতোই মনে হলেও গোটা আরব তার মতো কিছু রচনা করতে পারেনি, আর তেরোশো বছর পরেও কোনো প্রতিপক্ষ সেই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে পারেনি। মু’জিযার স্বরূপ বোঝার জন্য এটিই তাঁর কাছে উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর কাছে মু’জিযা মানে আল্লাহর এমন নিদর্শন, যা সত্য আর মিথ্যাকে আলাদা করে দেয়। আলামত হলো লক্ষণ। দুটি আলাদা শব্দকে এক তালিকায় বসিয়ে বিরোধ বানানো যায়, কিন্তু মূল লেখায় সেই বিরোধ নেই।
সংক্ষেপে
- উৎস প্রবন্ধ অনুযায়ী রূহানী খাযায়েন ২১/৬৩-তে “আলামত” শব্দটিই নেই।
- বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খণ্ডে তিনি মু’জিযাকে বলেছেন “নিদর্শন” (আয়াত), যা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য দেখায়।
- কুরআনও “আয়াত” (১৭:১০২) আর “আলামাত” (১৬:১৭) আলাদা অর্থে ব্যবহার করেছে।
- তাই প্রতিষ্ঠাতা আর আহমদী মুসলিম লেখকের কথায় কোনো বিরোধ নেই।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Barahin-e-Ahmadiyya Part V · alislam.org
- Barahin-e-Ahmadiyya Part V (English, PDF) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.