বিপদের অন্ধকার রাত। একজন নবী আল্লাহকে ডাকছেন, আর তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে এই কথাগুলো: “কিন্তু আমি তো কীট, মানুষ নই; মানুষের কাছে নিন্দিত, লোকের কাছে তুচ্ছ।”
এটি বাইবেলের গীতসংহিতা, অর্থাৎ যবূরের ২২ অধ্যায়ের ৬ পদ। মুসলমানরা হযরত দাউদ (আ.)-কে আল্লাহর নবী বলে জানেন, আর যবূরকে তাঁর ওপর নাযিলকৃত কিতাব। এই প্রার্থনা কি তাঁর নবুওয়তকে ছোট করে?
মজার ব্যাপার হলো, খ্রিস্টানরা যে প্রার্থনাকে গভীর আধ্যাত্মিক মর্যাদার নিদর্শন মনে করে, এটি সেই অধ্যায়েরই অংশ। এই অধ্যায়ের প্রথম পদ, “হে আমার ঈশ্বর, হে আমার ঈশ্বর, তুমি কেন আমাকে ত্যাগ করেছ?”, ইঞ্জিলের বর্ণনায় ক্রুশের ওপর ঈসা (আ.)-এর মুখেও এসেছে (মথি ২৭:৪৬)। অর্থাৎ আল্লাহর প্রিয় বান্দারা চরম বিনয় ও অসহায়ত্বের ভাষাতেই তাঁকে ডাকেন।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর একটি উর্দু কবিতার পঙ্ক্তির ভাব এমন: আমি মাটির এক কীট, আদমসন্তানও নই; মানুষের ঘৃণার পাত্র, মানুষের লজ্জা। বিরোধীরা বলেন, যিনি নিজেকে মানুষ বলেই মানেন না, বরং লাঞ্ছনার পাত্র বলেন, তিনি নবী হন কী করে?
নবীদের দোয়ার ভাষা
আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে নবীরা কখনো নিজেদের বড় করে দেখাননি। কুরআনেই এর উদাহরণ আছে। মাছের পেটের অন্ধকারে হযরত ইউনুস (আ.) বলেছিলেন:
একজন নবী নিজেকে “যালেমদের অন্তর্ভুক্ত” বলছেন! কেউ কি এ থেকে বলবে, তিনি নবী ছিলেন না? মিসর থেকে পালিয়ে মাদইয়ানে পৌঁছে, গাছের ছায়ায় বসে হযরত মূসা (আ.) বলেছিলেন:
এ হলো দোয়া ও বিনয়ের ভাষা। আল্লাহর মহত্ত্বের সামনে বান্দা যত নিজেকে ছোট করে, আল্লাহ তাকে তত উঁচু করেন। মহানবী (সা.) বলেছেন:
আল্লাহ নিজেই তাঁর বিনয়ের সাক্ষী
হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর বিনয় শুধু কবিতার ভাষা ছিল না, ছিল তাঁর জীবনের রং। ১৯০৭ সালের ১৮ মার্চ তিনি একটি ইলহাম পান: “তোমার বিনয়ী পথগুলো তাঁর পছন্দ হয়েছে।” (তাযকিরা, ২০২৩ সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৬৭৫)
তিনি নিজের সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি “সাইয়েদুর রুসুল”, অর্থাৎ সব রসূলের নেতা মহানবী (সা.)-এর সবচেয়ে নগণ্য সেবকদের একজন। (বারাহীনে আহমদীয়া, ৪র্থ খণ্ড, রূহানী খাযায়েন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৯৩–৫৯৪, উপটীকা ৩)
তাঁর জীবনের ছোট ছোট ঘটনাতেও এই বিনয় দেখা যায়। হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.) একটি খুতবায় বর্ণনা করেছেন: কোনো মজলিসে তাঁর বড় ভাই থাকলে তাঁকে চেয়ার দেওয়া হতো, আর হযরত মসীহ মওউদ (আ.) মাটিতে বসতেন; বড় ভাই চেয়ারে বসতে বললেও তিনি মাটিতেই বসে থাকতেন।
একই লেখায় তিনি ঈসা (আ.)-এর সঙ্গে নিজের সাদৃশ্যের কারণও বলেছেন: নম্রতা, বিনয়, আল্লাহর ওপর ভরসা আর আন্তরিকতা। (বারাহীনে আহমদীয়া, ৪র্থ খণ্ড, রূহানী খাযায়েন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৯৩–৫৯৪) অর্থাৎ বিনয় তাঁর দাবির বিরুদ্ধে নয়, তাঁর দাবিরই একটি অংশ।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
নবী নিজেকে এত তুচ্ছ বললে নবুওয়তের মর্যাদা থাকে কোথায়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, নবীর তো নিজের মর্যাদা ঘোষণা করার কথা। চলুন দেখি মহানবী (সা.) কী বলেছেন: “খ্রিস্টানরা যেমন মরিয়মের পুত্রের প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরা আমার প্রশংসায় তেমন করো না; আমি তো তাঁর বান্দা মাত্র।” (সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৪৪৫) নবুওয়তের মর্যাদা আল্লাহর দেওয়া; নবী নিজে বিনয়ী থাকেন। আল্লাহর সামনে নিজেকে শূন্য মনে করাই সেই মর্যাদার শর্ত।
কবিতার কথাটি কি আক্ষরিক অর্থে নেওয়া উচিত?
না। “আমি কীট, মানুষ নই”: হযরত দাউদ (আ.) কি সত্যিই কীট ছিলেন? এটি ভাষার একটি পরিচিত রীতি, যেখানে মানুষ আল্লাহর মহিমার সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা প্রকাশ করে। কবিতার আবেগকে আইনের ধারার মতো পড়লে যেকোনো দোয়াকেই বিকৃত করা যায়।
অন্যত্র তো তিনি বড় বড় দাবি করেছেন, এটা কি স্ববিরোধ নয়?
তিনি নিজেই এর উত্তর দিয়েছেন: “অজ্ঞ লোকেরা আপত্তি করে যে আমি নিজের মর্যাদা সীমাহীনভাবে বাড়াই। আমি আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, নিজের প্রশংসা চাওয়া বা নিজের বড়ত্ব দেখিয়ে আনন্দ পাওয়া আমার স্বভাবে নেই। আমি সব সময় বিনয় আর অপরিচিত থাকার জীবন পছন্দ করেছি। কিন্তু তা আমার হাতে ছিল না; আল্লাহ নিজেই আমাকে সামনে এনেছেন। আর তাঁর ওহীতে আমার সম্পর্কে যত প্রশংসা ও মহত্ত্বের কথা আছে, তা প্রকৃতপক্ষে মহানবী (সা.)-এরই।” (মলফূযাত, ২০২২ সংস্করণ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৪)
নিজের দিক থেকে তিনি কিছুই নন; যা কিছু মর্যাদা, তা আল্লাহর দান আর মহানবী (সা.)-এর অনুসরণের ফল। দুটি কথা একই সত্যের দুই দিক।
মহানবী (সা.) নিজেও কি এমন বিনয় শিখিয়েছেন?
হ্যাঁ। যিনি সব নবীর নেতা, তিনিই বলেছেন:
যে ইউনুস (আ.) নিজেকে “যালেমদের অন্তর্ভুক্ত” বলেছিলেন, মহানবী (সা.) তাঁর সম্মান রক্ষা করেছেন এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্ব করতে নিষেধ করেছেন। নবীদের মহত্ত্ব আল্লাহ ঘোষণা করেন; নবীরা নিজেরা মাটির কাছাকাছি থাকেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর পঙ্ক্তিটি এই একই পথের পদচিহ্ন।
সংক্ষেপে
- হযরত দাউদ (আ.) যবূরে নিজেকে “কীট, মানুষ নই” বলেছেন; কুরআনে ইউনুস (আ.) ও মূসা (আ.)-এর দোয়াতেও একই বিনয়।
- মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহর জন্য বিনয়ীকে আল্লাহ উঁচু করেন।
- আল্লাহ নিজেই ইলহামে হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর বিনয়ী পথের প্রশংসা করেছেন।
- তাই এই পঙ্ক্তি নবুওয়তের বিরুদ্ধে প্রমাণ নয়, বরং নবীদের পরিচিত বিনয়ের ভাষা।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.