হাদীসগ্রন্থে মহানবী (সা.)-এর একটি বিখ্যাত কথা বর্ণিত হয়েছে, যার মর্ম: মূসা (আ.) আজ জীবিত থাকলে আমার অনুসরণ ছাড়া তাঁর আর কোনো পথ থাকত না। আপত্তিকারী নিজেও মুসনাদে আহমদে হযরত জাবির (রা.)-এর বর্ণনার কথা উল্লেখ করেছেন।
কথাটির মর্ম পরিষ্কার: মহানবী (সা.)-এর আগমনের পর আগের সব নবীর পথ তাঁর পথে এসে মিলেছে। কিন্তু এই কথার একটি রূপে মূসা (আ.)-এর সাথে ঈসা (আ.)-এর নামও আছে। আজকের আপত্তি সেই নাম নিয়েই।
আপত্তিটি কী?
আপত্তিকারী বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন “যদি মূসা ও ঈসা জীবিত থাকতেন…” (রূহানী খাযায়েন ১৪/২৭৩)। তাঁর অভিযোগ, ঈসা (আ.)-কে মৃত প্রমাণ করার জন্য মির্যা সাহেব হাদীসে ঈসা (আ.)-এর নাম বাড়িয়ে দিয়েছেন; নির্ভরযোগ্য হাদীসগ্রন্থে, যেমন মুসনাদে আহমদে হযরত জাবির (রা.)-এর বর্ণনায়, শুধু মূসা (আ.)-এর নাম আছে।
অর্থাৎ অভিযোগটি গুরুতর: হাদীস জাল করার অভিযোগ। তাই প্রমাণ দেখা জরুরি।
ইবনে কাসীরের তফসীরে কী আছে?
হাফেজ ইবনে কাসীর (রহ.) অষ্টম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মুফাসসির। তাঁর তফসীর আজও সুন্নি আলেমদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তফসীরগুলোর একটি। সূরা আলে ইমরানের নবীদের অঙ্গীকারের আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি লিখেছেন:
এই বাক্যের পরেই ইবনে কাসীর লিখেছেন, মুহাম্মদ (সা.) কিয়ামত পর্যন্ত সব নবীর শেষে আসা নবী, এমন মহান ইমাম যে তিনি যে যুগেই থাকতেন, সব নবীর ওপরে তাঁরই আনুগত্য অবশ্যকর্তব্য হতো।
alislam.org-এ প্রকাশিত প্রবন্ধেও এই হাদীস ঈসা (আ.)-এর নামসহ উদ্ধৃত হয়েছে, সূত্র হিসেবে ইবনে কাসীর (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৪৫) ও আল-ইয়াওয়াকীত ওয়াল জাওয়াহির-এর উল্লেখসহ; আরেকটি প্রবন্ধে যুরকানীর (খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৫৪) উল্লেখ আছে।
তাহলে প্রশ্ন: হযরত মির্যা সাহেব যদি ঈসা (আ.)-এর নাম “বানিয়ে” থাকেন, তাহলে তাঁর জন্মের চারশো বছরেরও বেশি আগের ইবনে কাসীরের তফসীরে সেই নাম এল কোথা থেকে? স্পষ্টতই তিনি যা উদ্ধৃত করেছেন, তা আগে থেকেই ইসলামী গ্রন্থে বিদ্যমান ছিল।
আয়াতটি কী বলে?
ইবনে কাসীর যে আয়াতের ব্যাখ্যায় এই কথা লিখেছেন, সেটি এই:
আগের সব নবীর উম্মতের কাছ থেকে অঙ্গীকার: সত্যায়নকারী রসূল এলে তাঁর ওপর ঈমান আনতে হবে, তাঁকে সাহায্য করতে হবে। হাদীসটি এই আয়াতেরই ব্যাখ্যা।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
মুসনাদে আহমদে তো শুধু মূসা (আ.)-এর নাম?
আপত্তিকারীর উল্লেখ অনুযায়ী হযরত জাবির (রা.)-এর বর্ণনায় শুধু মূসা (আ.)-এর কথা আছে। কিন্তু ইবনে কাসীর নিজেই লিখেছেন “কোনো কোনো হাদীসে” মূসা ও ঈসা দুজনের নামই আছে। একটি বর্ণনায় একজনের নাম আর আরেকটিতে দুজনের নাম থাকা হাদীসশাস্ত্রে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। হযরত মির্যা সাহেব দ্বিতীয় রূপটি উদ্ধৃত করেছেন, যা প্রাচীন গ্রন্থে আছে। একে “জালিয়াতি” বলা ন্যায়সঙ্গত নয়।
ইবনে কাসীর তো নিজে ঈসা (আ.)-কে জীবিত মানতেন?
ঠিক। আমরা ইবনে কাসীরকে আহমদী মত প্রমাণের জন্য উদ্ধৃত করছি না। উদ্ধৃত করছি শুধু এটুকু দেখাতে যে “মূসা ও ঈসা” শব্দগুলো তাঁর তফসীরে আছে। জাল করার অভিযোগ খণ্ডনের জন্য এটুকুই যথেষ্ট। হাদীসটি থেকে আহমদীরা কী বোঝেন, তা আলাদা আলোচনা।
ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু কি শুধু এই হাদীসের ওপর নির্ভর করে?
একেবারেই নয়। ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু প্রমাণের জন্য হাদীসে নাম বাড়ানোর কোনো প্রয়োজনই নেই; কুরআনেই প্রমাণ আছে। যেমন:
আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ডাকা হয়, তারা সবাই মৃত, জীবিত নয়। কোটি কোটি মানুষ ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর আসনে বসিয়ে ডাকে। কুরআনের এই ঘোষণা তাঁকেও শামিল করে। আরও আছে: “মুহাম্মদ কেবল একজন রসূল। তাহার পূর্বেকার সকল রসূল অবশ্যই মারা গিয়াছে” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৫)।
“যদি জীবিত থাকতেন” কথাটি থেকে আহমদীরা কী বোঝেন?
আরবিতে “লাও” (যদি) সাধারণত এমন শর্তের জন্য ব্যবহার হয় যা বাস্তবে ঘটেনি। যেমন কুরআনে: “যদি (আকাশ ও পৃথিবী) এতদুভয়ের মধ্যে আল্লাহ্ ছাড়া আরও মা’বূদ থাকিত তাহা হইলে নিশ্চয় উভয়েই বিনষ্ট হইয়া যাইত” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:২৩)। আহমদীদের মতে, “মূসা ও ঈসা যদি জীবিত থাকতেন” বাক্যটিও তেমনি ইঙ্গিত দেয় যে দুজনের কেউই জীবিত নেই।
যাঁরা ঈসা (আ.)-কে জীবিত মানেন, তাঁরা এই বাক্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা করেন। এটি ব্যাখ্যার মতভেদ, আর এ নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে। কিন্তু ব্যাখ্যার মতভেদ এক জিনিস, আর হাদীস জাল করার অভিযোগ আরেক জিনিস। শব্দগুলো যেহেতু ইবনে কাসীরের তফসীরেই আছে, জালিয়াতির অভিযোগ অন্তত টেকে না।
শেষ কথা
হাদীস জাল করার অভিযোগ খুব ভারী। কিন্তু যে শব্দগুলোর জন্য এই অভিযোগ, সেগুলো হাফেজ ইবনে কাসীরের তফসীরে “কোনো কোনো হাদীসে আছে” বলে লেখা। অভিযোগটি তাই প্রমাণের সামনে দাঁড়ায় না।
সংক্ষেপে
- অভিযোগ: হযরত মির্যা সাহেব হাদীসে ঈসা (আ.)-এর নাম যোগ করেছেন।
- তফসীর ইবনে কাসীরে সূরা আলে ইমরান ৩:৮২-এর ব্যাখ্যায় আছে: “কোনো কোনো হাদীসে আছে, মূসা ও ঈসা জীবিত থাকলে আমার অনুসরণ ছাড়া উপায় থাকত না।”
- এক বর্ণনায় শুধু মূসা (আ.), আরেক বর্ণনায় দুজনের নাম থাকা হাদীসশাস্ত্রে স্বাভাবিক।
- ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর প্রমাণ কুরআনেই আছে (১৬:২১-২২; ৩:১৪৫); নাম বানানোর প্রয়োজন ছিল না।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Death of Hazrat Jesus (as) · alislam.org
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.