একজন ডাক্তার রোগীকে বললেন, “আপনার ফুসফুসে ক্যানসার।” কথাটি কঠিন, শুনতে কষ্টের। কিন্তু কেউ কি বলবে ডাক্তার রোগীকে গালি দিয়েছেন? না। তিনি সত্য বলেছেন, কারণ সত্য না বললে চিকিৎসা হয় না।
এখন ধরুন, কেউ দাবি করল, “কঠিন সত্য বলাই গালি।” তাহলে তো পৃথিবীর সব ডাক্তারকে গালিবাজ বলতে হবে। এই ধরনের যুক্তিকে বলে দাবিটিকে তার শেষ পরিণতিতে নিয়ে গিয়ে দেখানো যে তা অসম্ভব। আজকের আপত্তির বাক্যটি ঠিক এমন একটি যুক্তির অংশ।
আপত্তিটি কী?
আপত্তিতে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ইযালায়ে আওহাম (রূহানী খাযায়েন ৩ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৫) থেকে একটি বাক্য তুলে ধরা হয়: “অথবা স্বীকার করতেই হবে যে কুরআন শরীফ অশ্লীল গালি দিয়ে ভর্তি এবং কুরআন কঠোর ভাষার রাস্তা ব্যবহার করেছে।” এ থেকে বলা হয়, তিনি কুরআনের অবমাননা করেছেন।
প্রেক্ষাপট: কঠোর ভাষার অভিযোগ
তাঁর যুগে কিছু খ্রিষ্টান পাদ্রী আর আর্য সমাজের প্রচারক ইসলাম, কুরআন আর মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে অশ্লীল ভাষায় বই লিখছিলেন। তিনি এর কড়া জবাব দিতেন। তখন অভিযোগ উঠল: আপনার ভাষা কঠোর, এটা গালি।
ইযালায়ে আওহাম-এ তিনি এর দীর্ঘ উত্তর দিয়েছেন। alislam.org-এ উদ্ধৃত তাঁর মূল নীতি: “গালি এক জিনিস, আর সঠিক বর্ণনা, তা যত তিক্ত ও কঠোরই হোক, আরেক জিনিস।” সত্যবাদীর দায়িত্ব হলো ভুল পথের প্রতিপক্ষের কাছে সত্য পৌঁছে দেওয়া, তাতে সে অসন্তুষ্ট হলেও।
তারপর তিনি কুরআন থেকে উদাহরণ দিয়েছেন। আর সেখানেই আসে আপত্তির বাক্যটি: যদি তিক্ত সত্যের বর্ণনাই গালি হয়, তাহলে (নাউযুবিল্লাহ) একই অভিযোগ কুরআনের ওপরও আসবে, “অথবা স্বীকার করতে হবে” যে কুরআনও গালিতে ভরা। যেহেতু কোনো মুসলমান তা স্বীকার করতে পারে না, তাই প্রমাণ হয়: তিক্ত সত্য বলা গালি নয়।
অর্থাৎ বাক্যটি কুরআনের বিরুদ্ধে নয়, কুরআনকে সাক্ষী রেখে প্রতিপক্ষের ভুল মানদণ্ড ভেঙে দেওয়ার যুক্তি।
কুরআনের ভাষা
কুরআন সত্য প্রকাশে কখনো দ্বিধা করেনি। তাওরাতের দায়িত্ব পেয়েও যারা তা পালন করেনি, তাদের সম্পর্কে:
দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়া এক ব্যক্তির উপমা দেওয়া হয়েছে হাঁপাতে থাকা কুকুরের সাথে (সূরা আল-আ’রাফ ৭:১৭৭)। অস্বীকারকারীদের বলা হয়েছে “সৃষ্টির মধ্যে নিকৃষ্টতম” (সূরা আল-বাইয়্যেনাহ ৯৮:৭)। আর এক প্রবল বিরোধী সম্পর্কে কুরআন বলেছে:
এগুলো কি গালি? কোনো মুসলমান তা বলবেন না। এগুলো সেই মানুষদের প্রকৃত নৈতিক অবস্থার বর্ণনা। alislam.org-এর ব্যাখ্যাও এটাই: এসব কথা তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থা বিবেচনায় বলা হয়েছে; একে আল্লাহর গালি বলা যায় না।
আর ঠিক এর আগের আয়াতেই কুরআন সত্য গোপন করে আপস করতে নিষেধ করেছে:
অন্যকে খুশি করার জন্য সত্য চেপে যাওয়াকে আরবিতে বলে মুদাহানাত। কুরআন এর বিরোধী।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“যদি”-বাক্য হলেও কুরআন সম্পর্কে এমন শব্দ ব্যবহার কি উচিত?
কুরআন নিজেই এমন যুক্তি ব্যবহার করে: “যদি (আকাশ ও পৃথিবী) এতদুভয়ের মধ্যে আল্লাহ্ ছাড়া আরও মা’বূদ থাকিত তাহা হইলে নিশ্চয় উভয়েই বিনষ্ট হইয়া যাইত।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:২৩)। এর মানে এই নয় যে কুরআন একাধিক উপাস্যের সম্ভাবনা মেনে নিচ্ছে; বরং অসম্ভব পরিণতি দেখিয়ে দাবিটিকে খণ্ডন করছে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর বাক্যটিও তাই: “কঠোর সত্য = গালি” মানদণ্ড মানলে কুরআনকেও দোষী করতে হয়, আর সেটা অসম্ভব; তাই মানদণ্ডটিই ভুল।
কুরআন তো গালি দিতে নিষেধ করেছে?
অবশ্যই। “এবং তোমরা তাহাদিগকে গালি দিও না। যাহাদিগকে তাহারা আল্লাহ্কে ছাড়িয়া (মা’বূদরূপে) ডাকে…” (সূরা আল-আনআম ৬:১০৯)। হযরত মির্যা সাহেবের পুরো যুক্তিটিই এই পার্থক্যের ওপর: গালি নিষিদ্ধ, কিন্তু সত্য বর্ণনা নিষিদ্ধ নয়। কুরআন আরও শিখিয়েছে: “তোমরা আহ্লে কিতাবের সঙ্গে শুধু উত্তম পন্থায়ই বিতর্ক করিবে, তাহাদের মধ্য হইতে ঐ সকল লোক ব্যাতিরেকে যাহারা যুলুম করিয়াছে…” (সূরা আল-আনকাবূত ২৯:৪৭)। অর্থাৎ সীমালঙ্ঘনকারীদের ক্ষেত্রে আচরণ ভিন্ন হতে পারে।
তিনি কি নিজেই কঠোরতা শুরু করতেন?
alislam.org-এ উদ্ধৃত কিতাবুল বারিয়্যাহর (পৃষ্ঠা ১০-১১) বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কঠোরতা শুরু করেননি; প্রতিপক্ষের কঠোর আক্রমণের পরে জবাব হিসেবে তা এসেছে, যেন তারা ভদ্র ভাষায় ফিরে আসে, আর সাধারণ মুসলমানরা উত্তেজিত হয়ে ভুল পথে না যায়। যারা আল্লাহ, রাসূল (সা.) আর কুরআনের বিরুদ্ধে নোংরা ভাষায় লিখত, তাদের প্রকৃত চেহারা দেখানো ছিল কুরআনেরই পদ্ধতির অনুসরণ।
শেষ কথা
যে বাক্যটি দেখিয়ে কুরআন অবমাননার অভিযোগ, তা আসলে কুরআনের পক্ষে দেওয়া একটি যুক্তির অংশ: কঠোর সত্য বলা যদি গালি হতো, তবে কুরআনকেও দোষী করতে হতো; যেহেতু তা অসম্ভব, তাই কঠোর সত্য গালি নয়। কুরআনকে সাক্ষী মেনে দেওয়া যুক্তিকে কুরআনের অবমাননা বলা যায় না।
সংক্ষেপে
- বাক্যটি ইযালায়ে আওহাম-এর একটি যুক্তির অংশ, যেখানে মূল নীতি: গালি এক জিনিস, তিক্ত সত্য আরেক জিনিস।
- “অথবা স্বীকার করতে হবে…” অংশটি অসম্ভব পরিণতি দেখিয়ে প্রতিপক্ষের ভুল মানদণ্ড খণ্ডন করে।
- কুরআন নিজেও কঠোর বর্ণনা দিয়েছে (৬২:৬; ৭:১৭৭; ৬৮:১১-১৪; ৯৮:৭), যা গালি নয়।
- কুরআন সত্য চেপে আপস করতে নিষেধ করে (৬৮:৯-১০), আর গালি দিতেও নিষেধ করে (৬:১০৯); তিনি এই দুইয়ের সীমাই মেনেছেন।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- The Opponents of the Promised Messiah · alislam.org
- Why does the Quran have such ‘harsh’ language? · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.