“ফাতিমার বংশ থেকে কোনো মাহদী আসবে না”: তিনি আসলে কোন মাহদীকে অস্বীকার করেছেন?

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেই প্রতিশ্রুত মাহদী হওয়ার দাবি করেছেন। তাহলে তিনি কোন মাহদীর ধারণাকে মিথ্যা বলেছেন? উত্তর তাঁর একই পুস্তিকায় লেখা আছে।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

উনিশ শতকের শেষ দিকের ভারতবর্ষ। কিছু বইয়ে লেখা হচ্ছে, শিগগিরই এক মাহদী আসবেন। তিনি তলোয়ার হাতে খ্রিস্টানদের এত হত্যা করবেন যে বেঁচে থাকা মানুষের আর শাসন করার সাহস থাকবে না। ভারতের রাজাদের গলায় লোহার বেড়ি পরিয়ে তাঁর সামনে হাজির করা হবে, আর সরকারি কোষাগার লুট হবে।

এগুলো বানানো কথা নয়। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর “হাকীকাতুল মাহদী” পুস্তিকায় নওয়াব সিদ্দীক হাসান খানের “হুজাজুল কিরামা” আর তাঁর ছেলের “ইকতিরাবুস সাআ” বই থেকে পৃষ্ঠা নম্বরসহ এই বিশ্বাসগুলো তুলে ধরেছেন। এর পাশের কলামেই তিনি লিখেছেন নিজের ও নিজের জামাতের বিশ্বাস। (The True Nature of Mahdi, alislam.org)

আপত্তিটি কী

একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, সত্য কথা হলো ফাতিমার সন্তানদের মধ্য থেকে কোনো মাহদী আসবে না, আর এ ধরনের হাদীস বানোয়াট, সম্ভবত আব্বাসীয় শাসনামলে রচিত। আপত্তিকারীরা বলেন, এতে তিনি নবী-বংশ সম্পর্কিত হাদীস অস্বীকার করেছেন।

কথাটি তিনি কোন প্রসঙ্গে লিখেছেন, তা দেখা জরুরি। পুরো অনুচ্ছেদটি পড়লে বোঝা যায়, তিনি একটি নির্দিষ্ট মাহদীর ধারণার কথা বলছেন: যিনি ফাতিমা (রা.)-এর বংশধর রাজা হবেন, আর আকাশ থেকে নামা মসীহর সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করবেন।

তাঁর নিজের ভাষায় তাঁর বিশ্বাস

alislam.org-এ প্রকাশিত ইংরেজি অনুবাদে একই পুস্তিকার শেষ অংশে তিনি লিখেছেন:

“আমি জোর দিয়ে অস্বীকার করি যে মসীহ ইসলামী যুদ্ধ করার জন্য আকাশ থেকে নামবেন, আর মাহদী নামে ফাতিমার বংশের এক ব্যক্তি যুগের বাদশাহ হবেন, আর দুজন মিলে রক্তপাত ঘটাবেন। আল্লাহ আমার কাছে প্রকাশ করেছেন যে এ সবই সম্পূর্ণ মিথ্যা।” (The True Nature of Mahdi, “Beliefs Concerning the Mahdi”)

তিনি মাহদী-সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম: যেগুলো জাল, যার বর্ণনাকারীরা মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। দ্বিতীয়: যেগুলো দুর্বল বা পরস্পরবিরোধী হওয়ায় অনির্ভরযোগ্য। তৃতীয়: যেগুলো সত্যিই নির্ভরযোগ্য, কিন্তু সেগুলো হয় অতীতে পূর্ণ হয়ে গেছে, নয়তো শুধু একজন হেদায়াতপ্রাপ্ত মানুষের আগমনের সুসংবাদ দেয়, যাঁর কোনো পার্থিব রাজত্ব থাকবে না, যিনি যুদ্ধ করবেন না, রক্ত ঝরাবেন না, বরং আধ্যাত্মিক শক্তিতে মানুষের হৃদয়ে ঈমান প্রতিষ্ঠা করবেন। (একই সূত্র)

অর্থাৎ তিনি মাহদীর আগমন অস্বীকার করেননি। তিনি অস্বীকার করেছেন রক্তপিপাসু রাজা-মাহদীর ধারণা, আর সেই ধারণার পক্ষে যে বর্ণনাগুলো দাঁড় করানো হয়েছিল।

পারস্য বংশের সেই মানুষের কথা কিন্তু সহীহ বুখারীতেই আছে। সূরা আল-জুমুআর আয়াত “এবং তাদের মধ্য থেকে অন্য লোকদের মধ্যেও যারা এখনো তাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি” নাযিল হলে মহানবী (সা.) হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর গায়ে হাত রেখে বলেছিলেন:

لَوْ كَانَ الإِيمَانُ عِنْدَ الثُّرَيَّا لَنَالَهُ رِجَالٌ ـ أَوْ رَجُلٌ ـ مِنْ هَؤُلاَءِ
“ঈমান যদি সুরাইয়া নক্ষত্রের কাছেও চলে যায়, তবু এদের মধ্য থেকে কিছু লোক, অথবা একজন লোক, তা অবশ্যই ফিরে পাবে।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুত তফসীর, সূরা আল-জুমুআ, হাদীস ৪৮৯৭
وَّاٰخَرِیۡنَ مِنۡہُمۡ لَمَّا یَلۡحَقُوۡا بِہِمۡ ؕ وَہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ
“এবং (তিনি তাহাকে আবির্ভূত করিবেন) তাহাদের মধ্য হইতে অন্য লোকের মধ্যেও যাহারা এখন পর্যন্ত তাহাদের সঙ্গে মিলিত হয় নাই। এবং তিনি মহাপ্ররাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।”
সূরা আল-জুমুআ ৬২:৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৬২:৩।
✦

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“আবু দাউদে তো স্পষ্ট আছে, মাহদী ফাতিমার বংশ থেকে হবেন?”

হ্যাঁ, সুনান আবু দাউদে হযরত উম্মে সালামা (রা.)-এর সূত্রে একটি বর্ণনা আছে:

الْمَهْدِيُّ مِنْ عِتْرَتِي مِنْ وَلَدِ فَاطِمَةَ
“মাহদী আমার পরিবার থেকে, ফাতিমার সন্তানদের মধ্য থেকে হবেন।”
সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল মাহদী, হাদীস ৪২৮৪

এখানে কেউ কেউ বলেন, তাহলে তো আপত্তি সঠিক। চলুন দেখি। প্রথমত, হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবাজ রাজা-মাহদীর ধারণা, যা ওপরে তাঁর নিজের কথায় দেখা গেছে। দ্বিতীয়ত, ফাতিমা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, তাঁর স্ত্রীর পরিবার সরাসরি হযরত ফাতিমা (রা.)-এর বংশধর, আর তাঁর নিজের বংশেও কয়েকজন দাদি-নানির মাধ্যমে হযরত ফাতিমা (রা.)-এর রক্তের মিশ্রণ আছে (তুহফায়ে গোলড়বিয়া, রূহানী খাযায়েন ১৭তম খণ্ড, পৃ. ১১৭; তাযকিরা, ইংরেজি সংস্করণে উদ্ধৃত)।

তৃতীয়ত, তিনি জাগ্রত অবস্থায় একটি কাশফ দেখেছিলেন, যেখানে হযরত ফাতিমা যাহরা (রা.) এসে মায়ের মতো স্নেহে তাঁর মাথা কোলে নিয়েছিলেন, আর তাঁকে জানানো হয়েছিল যে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কটি আধ্যাত্মিক সন্তানের মতো (সিররুল খিলাফা, রূহানী খাযায়েন ৮ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৮-৩৫৯; তাযকিরায় উদ্ধৃত)। তাই এই হাদীসকে সত্য ধরলেও তা তাঁর দাবির বিরুদ্ধে যায় না।

“তাহলে কি তিনি ইমাম মাহদীর আগমনই অস্বীকার করলেন?”

একেবারেই না। তিনি নিজেই প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী হওয়ার দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, মসীহ আর মাহদী দুজন আলাদা মানুষ নন, একই ব্যক্তি। সহীহ বুখারীতে মহানবী (সা.) বলেছেন:

كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا نَزَلَ ابْنُ مَرْيَمَ فِيكُمْ وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ
“তোমাদের অবস্থা কেমন হবে, যখন ইবনে মারইয়াম তোমাদের মাঝে নাযিল হবেন, আর তোমাদের ইমাম হবেন তোমাদের মধ্য থেকেই?”
সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৪৪৯

সুনান ইবনে মাজাহতে (হাদীস ৪০৩৯) একটি বর্ণনা আছে, “ঈসা ইবনে মারইয়াম ছাড়া কোনো মাহদী নেই।” হাদীস-বিশারদদের অনেকে এর সনদকে দুর্বল বলেছেন; তবু হযরত মসীহ মওউদ (আ.) “হাকীকাতুল মাহদী”-তে এটি উল্লেখ করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, ঈসা (আ.)-এর স্বভাব ও চেতনা নিয়ে যিনি আসবেন, তিনিই মাহদী; তিনি যুদ্ধ করবেন না, বরং পবিত্র আদর্শ আর আসমানী নিদর্শন দিয়ে হেদায়াত ছড়াবেন।

“হাদীসকে ‘বানোয়াট’ বলার অধিকার তাঁকে কে দিল?”

হাদীস যাচাই করা নতুন কাজ নয়; প্রতিটি যুগের মুহাদ্দিসরা বর্ণনাকারীদের যাচাই করে বহু বর্ণনাকে জাল বা দুর্বল বলেছেন। মাহদী-বিষয়ক বর্ণনাগুলো নিয়ে মুসলিম আলেমদের মধ্যেও দীর্ঘ মতভেদ আছে, আর রাজনৈতিক কারণে বর্ণনা বানানোর ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অজানা নয়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই রক্তপাতের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা কুরআনের “ধর্মে কোনো বল প্রয়োগ নেই” (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৭) শিক্ষার বিরোধী। যে বর্ণনা কুরআনের বিরোধী অর্থ বহন করে, তা পরিত্যাগ করা কুরআনেরই আনুগত্য।

সিদ্ধান্ত: তিনি মাহদী অস্বীকার করেননি, নিজেই মাহদী হওয়ার দাবি করেছেন। তিনি অস্বীকার করেছেন তলোয়ারধারী রাজা-মাহদীর কল্পনা, যা ইসলামের শান্তির শিক্ষার বিপরীত।

সংক্ষেপে

  1. “হাকীকাতুল মাহদী”-তে তিনি সেই বিশ্বাস খণ্ডন করেছেন, যেখানে ফাতিমার বংশের এক মাহদী রাজা হয়ে মসীহর সঙ্গে মিলে রক্তপাত করবেন।
  2. তিনি নির্ভরযোগ্য হাদীসকে মেনেছেন, যা যুদ্ধহীন, রাজত্বহীন একজন হেদায়াতপ্রাপ্ত মানুষের সুসংবাদ দেয়।
  3. তাঁর বংশে কয়েকজন দাদি-নানির মাধ্যমে হযরত ফাতিমা (রা.)-এর রক্ত আছে, আর কাশফে তিনি নিজেকে তাঁর আধ্যাত্মিক সন্তান হিসেবে দেখেছেন।
  4. বুখারীর হাদীস অনুযায়ী পারস্য বংশের মানুষ ঈমান ফিরিয়ে আনবেন; হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ছিলেন সেই বংশের।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.