“মীকাঈল” নামটি প্রতিটি মুসলমানের চেনা। কুরআনে জিবরাঈলের সঙ্গে এই ফেরেশতার নাম এসেছে। কিন্তু নামটির মূল কোন ভাষায়, আর তার অর্থ কী, তা আমরা কজনই বা খুঁজে দেখি?
আপত্তিটি কী
রূহানী খাযায়েন ১৭ খণ্ডের ৪১৩ পৃষ্ঠায় হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, দানিয়েল নবী তাঁর কিতাবে তাঁর (প্রতিশ্রুত মসীহের) নাম মীকাঈল রেখেছেন, আর হিব্রু ভাষায় মীকাঈলের অর্থ “খোদার মতো”।
এর বিরুদ্ধে দুটি আপত্তি তোলা হয়েছে। এক, মীকাঈলের আসল অর্থ নাকি “আল্লাহর বান্দা”, তাই “খোদার মতো” অর্থটি ভুল। দুই, দানিয়েল নবীর কোন বইয়ে, কোন পৃষ্ঠায় এ কথা আছে, তা দেখাতে হবে।
হিব্রু অভিধান কী বলে
নামটি হিব্রু, তাই উত্তর খুঁজতে হবে হিব্রু অভিধানে। বাইবেলের শব্দকোষ হিসেবে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত স্ট্রং-এর হিব্রু অভিধানে (Strong’s Hebrew Dictionary) মীকাঈলের ক্রমিক নম্বর H4317। সেখানে নামটির উচ্চারণ মী-কা-এল, আর এর গঠন দেখানো হয়েছে তিনটি অংশ দিয়ে: “মী” (কে), “কা” (মতো), আর “এল” (ঈশ্বর)। অর্থ লেখা আছে: who (is) like God, অর্থাৎ “কে আছে খোদার মতো”।
অর্থাৎ হযরত মসীহ মওউদ (আ.) যে অর্থ লিখেছেন, হিব্রু ভাষার প্রচলিত অভিধান হুবহু সেই অর্থই দেয়। “আল্লাহর বান্দা” অর্থটি এই নামের হিব্রু গঠন থেকে আসে না।
এই অর্থ খ্রিস্টান ও ইহুদি পণ্ডিতদের কাছেও সুপরিচিত। নামটি আসলে একটি প্রশ্নের আকারে প্রশংসা: “খোদার মতো আর কে আছে?” এর মাঝে আল্লাহর অতুলনীয়তার ঘোষণা আছে। আর যাকে এই নাম দেওয়া হয়, সে আল্লাহর গুণের প্রতিফলন, আল্লাহর সমকক্ষ নয়।
দানিয়েল নবীর বই
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরও কঠিন নয়। বাইবেলের পুরাতন নিয়মে “দানিয়েল” নামে একটি পুস্তক আছে। এর ১২ অধ্যায়ের প্রথম পদে বলা হয়েছে, সেই সময় “মহান অধিপতি মীখায়েল” উঠে দাঁড়াবেন, যিনি তোমার জাতির লোকদের রক্ষক; আর তখন এমন কষ্টের সময় আসবে, যা জাতির শুরু থেকে কখনো আসেনি। একই অধ্যায়ে দানিয়েলকে বলা হয়েছে, শেষ সময় পর্যন্ত এই কথাগুলো সিলমোহর করে রাখতে, যখন অনেকে এদিক-ওদিক ছুটবে আর জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে (দানিয়েল ১২:৪)।
এরপর একই অধ্যায়ে দুটি সংখ্যা এসেছে: ১২৯০ দিন, আর “ধন্য সে, যে অপেক্ষা করে ১৩৩৫ দিনে পৌঁছায়” (দানিয়েল ১২:১১-১২)। আহমদী মুসলমানদের ব্যাখ্যায় এখানে দিনকে বছর অর্থে ধরা হয়। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) প্রথম ইলহাম লাভ করেছিলেন হিজরী ১২৯০ সালে, আর ১২৯০ থেকে ১৩৩৫ হিজরীর মধ্যেই তাঁর জামাতের বিকাশ ও প্রসার ঘটে।
অর্থাৎ শেষ যুগে জাতির রক্ষক “মীখায়েল”-এর আবির্ভাবের কথা দানিয়েলের বইয়েই আছে, আর হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“খোদার মতো” নাম কি শিরকের দিকে নিয়ে যায় না?
এখানে কেউ কেউ বলেন, কোনো মানুষকে “খোদার মতো” বলা আপত্তিকর। চলুন দেখি। প্রথমত, এটি একটি ফেরেশতার প্রচলিত নাম, যাকে কুরআন নিজে সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করেছে (২:৯৯)। নামের অর্থ নিয়ে মুসলমানরা কখনো এই ফেরেশতার উপর শিরকের অভিযোগ তোলেননি। দ্বিতীয়ত, নামটির গঠনই প্রশ্নবোধক: “খোদার মতো কে আছে?” এর উত্তর: কেউ নেই। তাই নামটি আসলে তাওহীদের ঘোষণা। আর কোনো বান্দার মাঝে আল্লাহর গুণের প্রতিফলন দেখা ইসলামের পরিচিত শিক্ষা; মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ প্রিয় বান্দার কান, চোখ, হাত ও পা হয়ে যান (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৫০২)।
বাইবেল থেকে প্রমাণ দেওয়া কি ঠিক?
কুরআন নিজেই বলেছে, আহলে কিতাবরা এই রসূলের নাম “তাহাদের নিকট তওরাত ও ইন্জীলে লিখিত দেখিতে পায়” (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৫৮)। পূর্ববর্তী নবীদের ভবিষ্যদ্বাণী দেখানো মুসলিম আলেমদের পুরোনো রীতি। এখানে প্রশ্নই ছিল, “দানিয়েল নবীর বইয়ে কোথায় আছে?” সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে দানিয়েলের বই খুলতেই হবে।
দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণীতে তো এক ফেরেশতার কথা, মানুষ কীভাবে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, মীখায়েল তো ফেরেশতা, তাঁকে একজন মানুষের উপর প্রয়োগ করা যায় কীভাবে? চলুন দেখি, ভবিষ্যদ্বাণীর ভাষা নিয়ে হযরত ঈসা (আ.) নিজে কী শিখিয়েছেন। ইহুদিরা অপেক্ষা করছিল, মসীহের আগে নবী এলিয় (ইলিয়াস) আকাশ থেকে ফিরে আসবেন। হযরত ঈসা (আ.) হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “যে এলিয়ের আসার কথা ছিল, তিনিই ইনি” (মথি ১১:১৪)।
অর্থাৎ ভবিষ্যদ্বাণীতে কারও নাম এলে, অনেক সময় সেই নামের গুণ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে অন্য একজন আসেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-ও বলেছেন, দানিয়েলের ভবিষ্যদ্বাণীতে শেষ যুগে জাতির রক্ষক হিসেবে যে “মীখায়েল”-এর কথা, তার পূর্ণতা প্রতিশ্রুত মসীহের মাধ্যমে। নামটির অর্থ, “কে আছে খোদার মতো”, সেই ব্যক্তির ভূমিকারই ইঙ্গিত: তিনি এমন মানুষ, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহর গুণাবলি প্রতিফলিত হবে, আর যিনি আল্লাহর অতুলনীয়তার ঘোষণা দেবেন।
অতএব আপত্তির দুটি অংশেরই উত্তর পাওয়া গেল। নামটির অর্থ হিব্রু অভিধানেই আছে, আর দানিয়েল নবীর বইটিও যে কেউ খুলে পড়তে পারেন। যে বিষয়ে প্রমাণ এত সহজলভ্য, সেখানে আগে যাচাই করে তারপর মন্তব্য করাই ন্যায়সঙ্গত। কুরআনও আমাদের এই শিক্ষাই দেয়: কোনো খবর এলে আগে ভালো করে তদন্ত করো (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:৭)। যাচাই করলে দেখা যায়, হযরত মসীহ মওউদ (আ.) যা লিখেছেন, অভিধান আর দানিয়েলের বই দুটোই তার সাক্ষী।
সংক্ষেপে
- মীকাঈল একটি হিব্রু নাম; স্ট্রং-এর হিব্রু অভিধানে (H4317) এর অর্থ “who is like God”, অর্থাৎ “কে আছে খোদার মতো”।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর লেখা অর্থটি অভিধানের সঙ্গে হুবহু মেলে; “আল্লাহর বান্দা” অর্থটি নামের গঠন থেকে আসে না।
- দানিয়েলের পুস্তকের ১২ অধ্যায়ে শেষ সময়ে রক্ষক “মীখায়েল”-এর আবির্ভাব এবং ১২৯০ ও ১৩৩৫ সংখ্যার উল্লেখ আছে।
- নামটি প্রশ্নের আকারে আল্লাহর অতুলনীয়তার ঘোষণা; এতে শিরকের কিছু নেই।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.