হুনায়নের উপত্যকা। হাওয়াযিন গোত্রের তীরন্দাজদের আচমকা আক্রমণে মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ। কিন্তু একজন মানুষ এক পা-ও পিছু হটেননি। সাদা খচ্চরের পিঠে বসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) উচ্চস্বরে বলছিলেন:
আরবি জানা যে কেউ বলবেন, এই দুটি বাক্যের ছন্দ ও অন্ত্যমিল আছে। মনে রাখুন দৃশ্যটি; আলোচনায় এটি কাজে লাগবে।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) উর্দু, ফারসি ও আরবিতে অনেক কবিতা লিখেছেন। অথচ কুরআন বলে, নবী কবি নন। তাই কবিতা লেখাই প্রমাণ করে, তিনি নবী নন।
কুরআন আসলে কী বলে?
আয়াতটির প্রসঙ্গ খেয়াল করুন। মক্কার কাফেররা বলত, মুহাম্মদ (সা.) একজন কবি, আর কুরআন তাঁর কল্পনার কাব্য। আল্লাহ এর উত্তর দিয়েছেন: কুরআন কাব্য নয়, এটি উপদেশ ও সুস্পষ্ট কিতাব; আর মহানবী (সা.) কল্পনার জগতে ঘুরে বেড়ানো পেশাদার কবি নন।
আয়াতটি বলছে না যে নবীর মুখে কখনো একটি ছন্দময় বাক্যও আসতে পারে না। যদি তা-ই হতো, তাহলে হুনায়নের সেই বাক্যের কী হবে? আরেক যুদ্ধে আঙুল আহত হলে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, “তুমি তো একটি আঙুল মাত্র, যা রক্তাক্ত হয়েছে; আর যা পেয়েছ, আল্লাহর পথেই পেয়েছ।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার, হাদীস ২৮০২) এটিও ছন্দোবদ্ধ।
কোন কবিদের নিন্দা করা হয়েছে?
সূরা শুআরায় কবিদের সম্পর্কে কঠিন কথা আছে, কিন্তু সঙ্গে একটি স্পষ্ট ব্যতিক্রমও আছে:
নিন্দা সেই কবিদের, যারা উদ্দেশ্যহীনভাবে কল্পনার উপত্যকায় ঘোরে, আর যা বলে তা করে না। কিন্তু যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করে, তাদের কবিতা এই নিন্দার বাইরে।
মহানবী (সা.) নিজেই বলেছেন, “কোনো কোনো কবিতায় প্রজ্ঞা আছে।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল আদব, হাদীস ৬১৪৫) তিনি সাহাবী কবি হযরত হাসসান বিন সাবিত (রা.)-কে বলেছিলেন, কবিতায় শত্রুদের জবাব দাও, “জিবরাঈল তোমার সঙ্গে আছেন।” (সহীহ বুখারী, কিতাবু বাদইল খালক, হাদীস ৩২১৩) আর হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.) পরিচিত ছিলেন “রসূলের কবি” নামে।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.) মহানবী (সা.)-এর প্রশংসায় একটি পঙ্ক্তি লিখেছিলেন, যাকে তাঁর শ্রেষ্ঠ পঙ্ক্তি বলা হয়: “তাঁর মধ্যে যদি সুস্পষ্ট নিদর্শনগুলো না-ও থাকত, তবু তাঁর মুখখানিই তোমাকে সত্যের সংবাদ দিত।” (আল-ইসাবা ফী তাময়ীযিস সাহাবা, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৫; আলইসলাম ডট অর্গে উদ্ধৃত) মহানবী (সা.)-এর মজলিসে কবিতা ছিল, আর সেই কবিতা ছিল সত্য ও ভালোবাসার।
তাঁর কবিতার বিষয় কী ছিল?
এবার আসল প্রশ্নে আসি। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর কবিতা কিসের কথা বলে? আলইসলাম ডট অর্গ লিখেছে: কবিতা নিজে কখনো তাঁর লক্ষ্য ছিল না; এটি ছিল বাণী পৌঁছানোর অনেক মাধ্যমের একটি। আরবি, উর্দু ও ফারসিতে তিনি কবিতা লিখেছেন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার ব্যাকুলতা আর তাঁর পবিত্র নামের মহিমা প্রকাশের জন্য, এমন এক যুগে, যখন পৃথিবীতে অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ছিল।
তাঁর কবিতার বড় অংশ আল্লাহর প্রশংসা, মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, কুরআনের সৌন্দর্য আর ইসলামের সত্যতা নিয়ে। ঠিক এই কবিতাকেই কুরআন ব্যতিক্রম বলেছে: ঈমান, সৎকর্ম আর আল্লাহর স্মরণে ভরা কবিতা। তাঁর একটি পঙ্ক্তির ভাবও তা-ই: কাব্যচর্চার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই; উদ্দেশ্য শুধু এই যে কেউ যেন এই পথে হলেও বার্তাটি বুঝে নেয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“কবিতা শেখাইনি” মানেই কি নবী একটি পঙ্ক্তিও বলতে পারেন না?
এখানে কেউ কেউ বলেন, আয়াতটি সব কবিতাকেই নবীর জন্য নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু তাহলে হুনায়নে মহানবী (সা.)-এর ছন্দোবদ্ধ বাক্যের ব্যাখ্যা কী? আয়াতের উদ্দেশ্য কুরআনকে কাব্য থেকে আলাদা করা আর মহানবী (সা.)-কে “কল্পনাবিলাসী কবি” অভিযোগ থেকে মুক্ত করা। কবিতার একটি পঙ্ক্তি বলা আর পেশাদার কল্পনাবিলাসী কবি হওয়া এক কথা নয়।
তাহলে কবিতা কি নবীর সত্যতার মাপকাঠি?
কুরআন কবিতার মাপকাঠি দিয়েছে বিষয়বস্তু দিয়ে, ছন্দ দিয়ে নয়। মিথ্যা, অশ্লীলতা আর উদ্দেশ্যহীন কল্পনা নিন্দনীয়; ঈমান, সৎকর্ম আর আল্লাহর স্মরণ প্রশংসনীয়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর কবিতা দ্বিতীয় শ্রেণির। তাই কবিতা লেখা তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ নয়।
কুরআনের বাইরে তাঁর ওহী কি কাব্য ছিল?
তাঁর কবিতা আর তাঁর ওহী আলাদা জিনিস। কবিতা তিনি নিজে রচনা করেছেন এবং নিজের নামেই প্রকাশ করেছেন; কখনো তাকে আল্লাহর বাণী বলে দাবি করেননি। মহানবী (সা.)-এর ক্ষেত্রেও কুরআন আর তাঁর নিজের কথা আলাদা ছিল। নিজের রচনা আর আল্লাহর বাণী আলাদা রাখাই সত্যবাদিতার লক্ষণ।
সংক্ষেপে
- সূরা ইয়াসীনের আয়াত কুরআনকে কাব্য থেকে আলাদা করে; নবীর মুখে ছন্দোবদ্ধ বাক্য অসম্ভব বলে না।
- মহানবী (সা.) নিজে ছন্দোবদ্ধ বাক্য বলেছেন, কবিতায় প্রজ্ঞার কথা বলেছেন এবং সাহাবী কবিদের উৎসাহ দিয়েছেন।
- কুরআন ঈমানদার, সৎকর্মশীল ও আল্লাহকে স্মরণকারী কবিদের নিন্দার বাইরে রেখেছে।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর কবিতা আল্লাহ, মহানবী (সা.) ও ইসলামের মহিমায় ভরা; তাই এই আপত্তি টেকে না।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.