মসীহের যুগে উট পরিত্যক্ত হবে: রেলগাড়ির কথা কুরআন-হাদীসে কোথায়?

হাজার বছর ধরে মরুভূমির সেরা বাহন ছিল উট। কুরআন আর হাদীস বলেছিল, এক যুগ আসবে যখন উট আর কেউ ব্যবহার করবে না। সেই যুগটি কখন এল, আর হযরত মির্যা সাহেব কেন একে রেলগাড়ির সাথে যুক্ত করলেন?

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

চৌদ্দশ বছর আগের আরব। মক্কা থেকে মদিনা, কিংবা সিরিয়া পর্যন্ত বাণিজ্যযাত্রা, সবই হতো উটের পিঠে। আর উটের মধ্যে সবচেয়ে দামি ছিল গর্ভবতী উটনী, যার পেটে দশ মাসের বাচ্চা। একজন আরবের কাছে এর চেয়ে মূল্যবান সম্পদ আর কিছু ছিল না।

এখন কল্পনা করুন, সেই সময়ে কেউ বলছে, “একদিন আসবে যখন এই উটনীগুলো বেকার পড়ে থাকবে, কেউ এগুলোতে চড়বে না।” শুনে মানুষ অবাক হতো। অথচ ঠিক এই কথাই বলেছে কুরআন।

আপত্তিটি কী?

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফ সহ পূর্ববর্তী কিতাবে আছে যে মসীহের যুগে আগুনে চলা একটি গাড়ি আবিষ্কৃত হবে, আর সেটি হলো রেলগাড়ি (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ২৫)। বিরোধীরা বলেন, কুরআন-হাদীসে রেলগাড়ির কথা কোথায়?

কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণী

সূরা আত-তাকভীরে শেষ যুগের একের পর এক নিদর্শন বর্ণনা করা হয়েছে। তার একটি:

وَاِذَا الۡعِشَارُ عُطِّلَتۡ
“এবং যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটনীগুলি বেকার পরিত্যক্ত হইবে,”
সূরা আত-তাকভীর ৮১:৫
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৮১:৪।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: সেই যুগে উটনী, যা আগে ছিল সবচেয়ে উত্তম বাহন, অকেজো হয়ে যাবে; অর্থাৎ মসীহের যুগে যানবাহন এত উন্নত হবে যে পুরোনো বাহনগুলো বেকার হয়ে পড়বে। এতে রেলইঞ্জিনের যুগের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে (মালফুযাত, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৯–৫০)।

তিনি আরেকটি সূক্ষ্ম কথাও বলেছেন। যাঁরা মনে করেন এই আয়াতগুলো কিয়ামতের দিনের কথা, তাঁরা ভাবেন না, কিয়ামতের সময় উটনী গর্ভবতী থাকবে কীভাবে? একই আয়াতগুচ্ছে আছে, নদী-সমুদ্র একে অপরের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হবে, বই-পুস্তক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এগুলো সবই এই দুনিয়ার শেষ যুগের নিদর্শন।

কুরআন আরও বলেছে, নতুন নতুন বাহন সৃষ্টি হবে। নৌযানের কথা বলার পর আল্লাহ বলেন:

وَخَلَقۡنَا لَہُمۡ مِّنۡ مِّثۡلِہٖ مَا یَرۡکَبُوۡنَ
“এবং আমরা নিশ্চয় উহার সদৃশ আরও (যানবাহন) সৃষ্টি করিব যাহাতে তাহারা আরোহণ করিবে।”
সূরা ইয়াসীন ৩৬:৪৩

আর ঘোড়া, খচ্চর ও গাধার কথা বলার পর বলা হয়েছে, “এবং তিনি আরও এমন কিছু সৃষ্টি করিবেন যাহা তোমরা (এখন) জান না।” (সূরা আন-নাহল ১৬:৯)

✦

হাদীসের ভবিষ্যদ্বাণী: মসীহের সাথে জোড়া

কুরআনের ইঙ্গিতকে মহানবী (সা.) সরাসরি মসীহের আগমনের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন:

وَاللَّهِ لَيَنْزِلَنَّ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَادِلاً … وَلَتُتْرَكَنَّ الْقِلاَصُ فَلاَ يُسْعَى عَلَيْهَا
“আল্লাহর কসম, ইবনে মারইয়াম অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ বিচারক হয়ে অবতরণ করবেন… আর তরুণ উটনীগুলো পরিত্যক্ত হবে, সেগুলোতে চড়ে কেউ আর যাতায়াত করবে না।”
সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, ঈসা ইবনে মারইয়ামের অবতরণ অধ্যায়

এখন প্রশ্ন: মানুষ কখন একটি কাজের জিনিস ফেলে রাখে? কেবল তখনই, যখন এর চেয়ে ভালো কিছু পেয়ে যায়। উট পরিত্যক্ত হওয়ার অর্থ, এর চেয়ে দ্রুত ও শক্তিশালী বাহন আসবে। আর মসীহের যুগে যে নতুন বাহনটি প্রথম ব্যাপকভাবে উটের জায়গা নিল, তা হলো আগুন আর বাষ্পে চলা রেলগাড়ি।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজের যুগের নিদর্শনগুলো গুনতে গিয়ে লিখেছেন, রমযানে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ, প্লেগের বিস্তার, আর দেশে রেলগাড়ি তৈরি হওয়া ও উট পরিত্যক্ত হওয়া, এসবই মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী, যা মানুষ নিজের চোখে দেখেছে।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“কুরআনে তো ‘রেলগাড়ি’ শব্দটি নেই”

ঠিক, আর থাকার কথাও নয়। ভবিষ্যদ্বাণী সাধারণত এমন ভাষায় আসে, যা তার নিজের যুগের মানুষ বুঝতে পারে। সপ্তম শতাব্দীর আরবকে “রেলগাড়ি” বললে কেউ কিছু বুঝত না। তাই বলা হয়েছে তাদের সবচেয়ে প্রিয় বাহনের কথা: সেটি পরিত্যক্ত হবে। হযরত মির্যা সাহেব এই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব রূপটি চিহ্নিত করেছেন মাত্র। একই সূরার “যখন বই-পুস্তক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে” আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.) ২০১৯ সালের ২২ মার্চের খুতবায় ছাপাখানা আর গণমাধ্যমের অগ্রগতির কথা বলেছেন। সেখানেও “ছাপাখানা” শব্দটি নেই, কিন্তু অর্থটি স্পষ্ট।

“এই আয়াতগুলো তো কিয়ামতের দিনের কথা”

এখানে কেউ কেউ বলেন, সূরা তাকভীরের বর্ণনা কিয়ামতের। কিন্তু হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর প্রশ্নটি আবার ভাবুন: কিয়ামতের প্রলয়ের সময় উটনী গর্ভবতী থাকার কথা কেন বলা হবে, আর তখন কে-ই বা উট ব্যবহার করবে বা ছেড়ে দেবে? তার ওপর মহানবী (সা.) নিজেই উট পরিত্যক্ত হওয়াকে ইবনে মারইয়ামের আগমনের যুগের সাথে যুক্ত করেছেন, কিয়ামতের সাথে নয়। হাদীস কুরআনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা।

“উট তো এখনও আছে, তাহলে ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হলো কীভাবে?”

ভবিষ্যদ্বাণীটি ছিল উট দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হওয়ার নয়, বরং যাতায়াতের প্রধান বাহন হিসেবে তার ব্যবহার উঠে যাওয়ার: “সেগুলোতে চড়ে কেউ আর যাতায়াত করবে না।” আজ মক্কা থেকে মদিনা, বা কোনো শহর থেকে আরেক শহরে মানুষ যায় ট্রেনে, বাসে, বিমানে। উট আছে, কিন্তু দূরযাত্রার বাহন হিসেবে সে সত্যিই পরিত্যক্ত। এটিই ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা।

সংক্ষেপে

  1. কুরআন বলেছে, শেষ যুগে দশ মাসের গর্ভবতী উটনী পরিত্যক্ত হবে (৮১:৫), আর নতুন নতুন বাহন সৃষ্টি হবে (৩৬:৪৩, ১৬:৯)।
  2. সহীহ মুসলিমের হাদীসে মহানবী (সা.) উট পরিত্যক্ত হওয়াকে ইবনে মারইয়ামের আগমনের যুগের সাথে জুড়ে দিয়েছেন।
  3. যে বাহন প্রথম ব্যাপকভাবে উটের জায়গা নিল, তা আগুন-বাষ্পে চলা রেলগাড়ি; হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এটিই চিহ্নিত করেছেন।
  4. ভবিষ্যদ্বাণী নিজের যুগের ভাষায় আসে; “রেলগাড়ি” শব্দ না থাকা আপত্তির কারণ নয়।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.