হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কি সিনেমা দেখতে যেতেন?

মূল শব্দ ছিল ‘থিয়েটার’, আর সঙ্গে ছিল একটি কারণ। অনুবাদে শব্দ বদলে গেল, আর কারণটি হারিয়ে গেল।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

একজন চিকিৎসক একবার হাসপাতালের সংক্রামক রোগের ওয়ার্ডে ঢুকলেন, রোগটা নিজের চোখে দেখতে। কেউ যদি বলে, “তিনি রোগ ধরতে গিয়েছিলেন”, তা কি ঠিক হবে? কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, সেটাই ঠিক করে দেয় কাজটি ভালো না মন্দ।

আপত্তিটি কী

হযরত মুফতী মুহাম্মদ সাদেক (রা.)-এর বই যিকরে হাবীব-এর বরাতে একটি আপত্তি তোলা হয়েছে যে, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) বলেছেন, তিনিও একবার সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে বোঝাতে চাওয়া হয়, তিনি বিনোদন ও অশ্লীলতায় অংশ নিতেন।

প্রথমে বইটির পরিচয় জেনে নিই। যিকরে হাবীব হলো হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবী হযরত মুফতী মুহাম্মদ সাদেক (রা.)-এর স্মৃতিকথা, যেখানে তিনি নিজের দেখা ও শোনা ঘটনাগুলো ভালোবাসা নিয়ে লিখে রেখেছেন। একজন ভক্ত সাহাবী যে ঘটনা অকপটে লিখেছেন, তার পুরো ভাষ্যটাই দেখা দরকার।

মূল কথাটি কী ছিল

আহমদীয়া বাংলায় প্রকাশিত জবাব অনুযায়ী, মূল বক্তব্যের ভাব হলো: “আমি একবার থিয়েটার দেখতে গিয়েছিলাম, সেখানে কী হয় তা দেখতে। এর মাধ্যমে নানা বিষয় জানা যায়।”

এখানে দুটি বিষয় লক্ষ করার মতো। প্রথমত, মূল শব্দ “থিয়েটার”, যা সেকালে মঞ্চের অভিনয় বোঝাত। একে “সিনেমা” বানিয়ে আজকের পাঠকের মনে অন্য একটি ছবি তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাক্যের শেষ অংশ, অর্থাৎ যাওয়ার কারণটি, আপত্তিতে বাদ পড়ে গেছে। তিনি গিয়েছিলেন জানতে যে সেখানে আসলে কী হয়।

যিনি একটি সমাজের সংস্কার করতে চান, তাঁকে সেই সমাজের রোগগুলো চিনতে হয়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সারা জীবন খ্রিস্টান মিশনারি, আর্য সমাজ আর নানা মতবাদের মোকাবিলা করেছেন। নতুন যুগের নতুন মাধ্যম কীভাবে মানুষের মনে প্রভাব ফেলে, তা জানা তাঁর কাজেরই অংশ ছিল।

✦

কাজের বিচার নিয়তে

ইসলামের একেবারে প্রথম শিক্ষাগুলোর একটি হলো:

إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
“নিশ্চয় কাজের বিচার হয় নিয়ত অনুযায়ী।”
সহীহ বুখারী, হাদীস ১

একই জায়গায় দুজন মানুষ যেতে পারেন, একজন আমোদের জন্য, আরেকজন শিক্ষা নিয়ে সমাজকে সতর্ক করার জন্য। দুজনের কাজ এক নয়। মহানবী (সা.) পাপের একটি সহজ মাপকাঠিও দিয়েছেন:

الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ وَالإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ
“পুণ্য হলো উত্তম চরিত্র; আর পাপ হলো যা তোমার মনে খচখচ করে এবং তুমি চাও না যে মানুষ তা জানুক।”
সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বির্‌রি ওয়াস সিলাহ

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কথাটি নিজেই খোলাখুলি বলেছেন, আর তাঁর সাহাবী তা বইয়ে লিখে রেখেছেন। মনে কোনো অপরাধবোধ থাকলে মানুষ এমন কথা প্রকাশ্যে বলে না।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

একজন ধর্মীয় নেতার কি এমন জায়গায় যাওয়া উচিত?

এখানে কেউ কেউ বলেন, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, এমন জায়গায় যাওয়াই অনুচিত। চলুন দেখি, কুরআন কী বলে। কুরআন বারবার নির্দেশ দিয়েছে পৃথিবীতে ঘুরে দেখতে, মানুষের অবস্থা থেকে শিক্ষা নিতে:

قُلۡ سِیۡرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ ثُمَّ انۡظُرُوۡا کَیۡفَ کَانَ عَاقِبَۃُ الۡمُکَذِّبِیۡنَ
“তুমি বল, ‘তোমরা ভূ-পৃষ্ঠে ভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ, (সত্যকে) মিথ্যা বলিয়া প্রত্যাখ্যানকারীদের পরিণাম কি হইয়াছিল?’”
সূরা আল-আন‘আম ৬:১২
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৬:১১।

দেখে শিক্ষা নেওয়া কুরআনেরই শিক্ষা। একবার নিজের চোখে দেখে সমাজের অবস্থা বোঝা আর নিয়মিত বিনোদনে মেতে থাকা এক জিনিস নয়। আর এখানে তো বর্ণনাটি নিজেই বলছে, তিনি “একবার” গিয়েছিলেন, এবং কেন গিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় খলীফার ইউরোপ সফর নিয়েও তো আপত্তি আছে?

একই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় খলীফা হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.)-এর ইউরোপ সফরের একটি বর্ণনা নিয়েও আপত্তি তোলা হয়। আহমদীয়া বাংলার জবাব অনুযায়ী, তিনি সেখানকার সংস্কৃতি দেখে ফিরে এসে বরং পর্দাহীনতার বিরুদ্ধে জামাতকে সতর্ক করেছিলেন, যেন কেউ সেই অনুকরণ না করে। যে বর্ণনা নিয়ে আপত্তি, তার উদ্দেশ্যই ছিল সতর্ক করা। সতর্ককারীকে অভিযুক্ত করা উল্টো বিচার।

মন্দকে চেনার চেষ্টা কি নিজেই দোষের?

এখানে কেউ কেউ বলেন, ভালো মানুষ মন্দের খোঁজ নেবেন কেন? চলুন দেখি, মহানবী (সা.)-এর একজন বিশিষ্ট সাহাবী কী করতেন। হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) বলেছেন:

كَانَ النَّاسُ يَسْأَلُونَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنِ الْخَيْرِ، وَكُنْتُ أَسْأَلُهُ عَنِ الشَّرِّ مَخَافَةَ أَنْ يُدْرِكَنِي
“লোকেরা রসূলুল্লাহ (সা.)-কে কল্যাণের বিষয়ে প্রশ্ন করত, আর আমি তাঁকে প্রশ্ন করতাম অকল্যাণের বিষয়ে, এই ভয়ে যে তা আমাকে পেয়ে বসতে পারে।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকিব, হাদীস ৩৬০৬

মহানবী (সা.) তাঁকে নিষেধ করেননি, বরং ধৈর্য ধরে শেষ যুগের ফিতনাগুলোর বিস্তারিত খবর দিয়েছেন। কারণ মন্দকে না চিনলে তা থেকে বাঁচা যায় না। একজন সংস্কারকের ক্ষেত্রে এ কথা আরও সত্য। যে সমাজকে তিনি সতর্ক করবেন, সেই সমাজে কী চলছে তা তাঁকে জানতে হবে। নিজে একবার দেখে বোঝা, আর তারপর মানুষকে সেই বিষয়ে সতর্ক করা, এটি দোষ নয়, দায়িত্ব।

তাই প্রশ্নটা “তিনি কোথায় গিয়েছিলেন” নয়, বরং “কেন গিয়েছিলেন, আর ফিরে এসে কী শিক্ষা দিয়েছেন”। এই দুই প্রশ্নের উত্তর মূল বর্ণনাতেই আছে, যা আপত্তিতে বাদ দেওয়া হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি খুব সরল। একটি শব্দ বদলে দেওয়া হয়েছে, আর একটি কারণ বাদ দেওয়া হয়েছে। মূল শব্দ “থিয়েটার” আর মূল কারণ “সেখানে কী হয় তা জানা” ফিরিয়ে আনলেই আপত্তিটি তার ভিত্তি হারায়। একজন সংস্কারক সমাজের অবস্থা নিজের চোখে দেখে তা থেকে শিক্ষা নেবেন, এটি কুরআনের শিক্ষারই প্রয়োগ। পাঠকের কাছে আমাদের অনুরোধ, যেকোনো উদ্ধৃতি শুনলে মূল বাক্যটি পুরোটা খুঁজে দেখুন। কারণ অর্ধেক বাক্য অনেক সময় পুরো মিথ্যার চেয়েও বেশি বিভ্রান্তি তৈরি করে।

সংক্ষেপে

  1. মূল বর্ণনায় শব্দ ছিল “থিয়েটার”, সিনেমা নয়; আর যাওয়ার কারণও বলা ছিল: সেখানে কী হয় তা জানা।
  2. ইসলামে কাজের বিচার হয় নিয়ত অনুযায়ী (সহীহ বুখারী ১)।
  3. কুরআন পৃথিবী ঘুরে দেখে শিক্ষা নিতে বলে (সূরা আল-আন‘আম ৬:১২); সংস্কারকের জন্য সমাজের রোগ চেনা জরুরি।
  4. যে কথা তিনি নিজে খোলাখুলি বলেছেন আর সাহাবী লিখে রেখেছেন, তাতে গোপন অপরাধের কোনো চিহ্ন নেই।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.