একটি ঘরের ভেতরে নারীদের উদ্দেশে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে একজন সাহাবী খাতায় নোট নিচ্ছেন। ভেতরে মায়েদের সঙ্গে শিশুরাও আছে; তারা কাঁদছে, খেলছে, চেঁচামেচি করছে। বক্তার কথা মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। সাহাবী যতটা পারছেন, লিখে নিচ্ছেন।
এমন অবস্থায় লেখা নোটের প্রতিটি শব্দ কি নিশ্চিতভাবে বক্তার মুখের কথা? যেকোনো বিবেকবান মানুষ বলবেন, না।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) বলেছেন, “দেখো, আমাদের নবীর ঘরে বারোটি মেয়ের জন্ম হয়েছিল।” আপত্তিকারীরা মলফূযাতের ৩য় খণ্ডের (পুরনো সংস্করণ) ৩৭২ পৃষ্ঠার বরাত দেন এবং বলেন, এটি ইতিহাসের ভুল, আর এতে প্রমাণ হয় তিনি মহানবী (সা.)-এর জীবনী জানতেন না।
মলফূযাত কী, আর এই নোটটি কীভাবে লেখা
মলফূযাত হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নিজের লেখা বই নয়। alislam.org-এর পরিচিতি অনুযায়ী এটি তাঁর বক্তৃতা, আলোচনা ও কথোপকথনের সংকলন, যা তাঁর সাহাবীরা প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে লিখে রাখতেন। অর্থাৎ প্রতিটি কথা এসেছে একজন শ্রোতার কলম দিয়ে, যাঁর শোনা ও লেখার ওপর বর্ণনার নির্ভুলতা নির্ভর করে।
alislam.org-এর ভাষায়, এই অভিজ্ঞতাগুলো এতটাই মুগ্ধকর ছিল যে প্রত্যক্ষদর্শীরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সেই মুহূর্তগুলো ধরে রাখতে লিখে রাখতেন। এ ভালোবাসার শ্রম অমূল্য, কিন্তু এর সীমাও আছে: শ্রোতা যা শুনেছেন, যেভাবে শুনেছেন, সেটুকুই লেখা হয়েছে। তাই হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর কোনো বিশ্বাস বা বক্তব্য নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে প্রথমে দেখতে হয় তাঁর নিজের হাতে লেখা বই, তারপর অন্য বর্ণনা।
এই নির্দিষ্ট বক্তৃতাটি ছিল বাড়ির ভেতরে নারীদের উদ্দেশে দেওয়া উপদেশ। মূল প্রবন্ধে উল্লেখ আছে, বর্ণনার শুরুতে (একই খণ্ডের ৩৬৯ পৃষ্ঠায়) নোটগ্রহণকারী নিজেই লিখেছেন যে তিনি বাইরে থেকে লিখছিলেন, আর নারীদের সঙ্গে শিশুরা থাকায় তাদের হৈচৈয়ে বারবার কথা শোনায় বাধা পড়ছিল; তাই যতটা সম্ভব লেখা হয়েছে।
অর্থাৎ বর্ণনাকারী নিজেই সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই নোটে শোনার ভুল থাকতে পারে। এমন একটি নোটের একটি সংখ্যা ধরে কারও বিশ্বাস বা জ্ঞান নিয়ে রায় দেওয়া যায় না।
কুরআনও কোনো সংবাদ গ্রহণের আগে যাচাইয়ের নির্দেশ দেয়:
এখানে বর্ণনাকারী নিজে সৎ ছিলেন বলেই নিজের সীমাবদ্ধতার কথা লিখে গেছেন। কিন্তু যিনি সেই সতর্কবাণী বাদ দিয়ে শুধু সংখ্যাটি তুলে ধরেন, তিনি পাঠকের সামনে পুরো সত্য রাখেন না।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“মলফূযাত তো আহমদীদেরই প্রকাশিত; তাহলে এর দায় কেন নেবেন না?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, নিজেদের বইয়ে ছাপা কথা অস্বীকার করা চলে না। চলুন হাদীসের উদাহরণ দেখি। সহীহ বুখারী ও মুসলিমও মুসলমানদেরই সংকলন, তবু মুহাদ্দিসরা কোনো বর্ণনাকারীর স্মৃতিশক্তি বা শোনার অবস্থা দুর্বল হলে সেই বর্ণনাকে দুর্বল বলেন। বর্ণনাকারীর নির্ভুলতা (যাবত) যাচাই হাদীসশাস্ত্রের মৌলিক নীতি। মলফূযাত সংকলকরা নোটটি যেমন ছিল তেমনই রেখেছেন, বর্ণনাকারীর সতর্কবাণীসহ। এটাই সততা। আর সেই সতর্কবাণীই বলে দেয়, নোটের এই অংশ নির্ভরযোগ্য বলে ধরা যায় না।
“মহানবী (সা.)-এর সন্তান আসলে কতজন ছিলেন, আহমদীরা কী মানেন?”
আহমদীয়া জামাত ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত তথ্যই মানে। alislam.org-এ প্রকাশিত হযরত চৌধুরী মুহাম্মদ জাফরুল্লাহ খান (রা.)-এর সীরাত গ্রন্থে লেখা আছে, হিজরী নবম বছরে মহানবী (সা.) কন্যা হযরত যয়নব (রা.)-কে হারান; হযরত উম্মে কুলসুম (রা.)-ও মারা গিয়েছিলেন, ফলে কন্যাদের মধ্যে শুধু হযরত ফাতিমা (রা.) বেঁচে ছিলেন। হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.)-এর খুতবাতেও হযরত রুকাইয়া (রা.) ও হযরত উম্মে কুলসুম (রা.)-এর বিয়ে ও ইন্তেকালের বিস্তারিত বর্ণনা আছে, আর বলা হয়েছে উম্মে কুলসুম (রা.) ফাতিমা (রা.)-এর বড় এবং রুকাইয়া (রা.)-র ছোট ছিলেন। অর্থাৎ জামাতের প্রকাশনায় মহানবী (সা.)-এর চার কন্যার কথাই আছে।
পুত্র হযরত ইব্রাহীম (রা.)-এর ইন্তেকালের সময় মহানবী (সা.)-এর কান্নার কথা সহীহ বুখারীতে আছে:
“তাহলে বক্তৃতার আসল কথা কী ছিল?”
নোটটি যেহেতু অস্পষ্ট অবস্থায় লেখা, বক্তার হুবহু শব্দ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়, আর আন্দাজে কিছু বলাও উচিত নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে উপদেশটি ছিল নারীদের উদ্দেশে, আর তার বিষয় ছিল মহানবী (সা.)-এর আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়া, কোনো ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান দেওয়া নয়। একটি অস্পষ্ট নোটের একটি সংখ্যা দিয়ে সেই আদর্শের শিক্ষাকে আড়াল করা ন্যায্য নয়।
সিদ্ধান্ত: “বারো কন্যা” কথাটি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর লেখা নয়, এক নোটগ্রহণকারীর অস্পষ্ট শোনার ফল হতে পারে, যা বর্ণনাকারী নিজেই স্বীকার করেছেন। এর ওপর ভিত্তি করে আপত্তি তোলা যুক্তিসংগত নয়।
সংক্ষেপে
- মলফূযাত হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর নিজের লেখা নয়; সাহাবীদের ডায়েরি থেকে সংকলিত তাঁর কথাবার্তা।
- এই নোটটি বাইরে দাঁড়িয়ে নেওয়া, আর বর্ণনাকারী নিজেই লিখেছেন যে শিশুদের হৈচৈয়ে কথা শুনতে বাধা হচ্ছিল।
- কুরআন সংবাদ যাচাইয়ের নির্দেশ দেয় (৪৯:৭); বর্ণনাকারীর নির্ভুলতা যাচাই হাদীসশাস্ত্রেরও মূলনীতি।
- আহমদীয়া জামাতের প্রকাশনায় মহানবী (সা.)-এর কন্যাদের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসই বর্ণিত; তাই আপত্তিটি ভিত্তিহীন।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Malfuzat (Volume 2), introduction · alislam.org
- Farewell (Life of Muhammad, Seal of Prophets) · alislam.org
- Muhammad (sa): The Great Exemplar, Friday Sermon 10 November 2023 · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.