মহানবী (সা.)-এর পিতা কি জন্মের আগে, না পরে ইন্তেকাল করেছিলেন?

প্রসিদ্ধ মত সবার জানা। কিন্তু সীরাতের বইয়ে আরও কিছু বর্ণনা আছে, যা অনেকে কখনো খুলে দেখেননি।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

মক্কার এক তরুণ ব্যবসায়ী কাফেলার সঙ্গে সিরিয়ার পথে বেরিয়েছিলেন। ঘরে রেখে গিয়েছিলেন তাঁর নববিবাহিতা স্ত্রী হযরত আমিনাকে। তিনি আর ফিরে আসেননি। ফেরার পথে মদিনায় অসুস্থ হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পিতা।

প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী এই ঘটনা ঘটেছিল মহানবী (সা.)-এর জন্মের আগেই। কিন্তু সব বর্ণনা কি একই কথা বলে?

আপত্তিটি কী

রূহানী খাযায়েন ২৩ খণ্ডের ৪৬৫ পৃষ্ঠায় হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, মহানবী (সা.) এমন এক এতীম শিশু ছিলেন, যাঁর জন্মের কিছুদিন পরই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন।

বিরোধীরা বলেন, এ দেশের ছোট শিশুরাও জানে যে মহানবী (সা.)-এর পিতা তাঁর জন্মের আগেই মারা গিয়েছিলেন। তাহলে এই বাক্য কি ইতিহাস না জানার প্রমাণ নয়?

সীরাতের বইগুলো কী বলে

যে কথাটি “ছোট শিশুরাও জানে”, সেটি প্রসিদ্ধ মত, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একজন গবেষক জানেন, সীরাত ও ইতিহাসের বইয়ে এ বিষয়ে একাধিক বর্ণনা আছে।

বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত সীরাত বিশ্বকোষে বিভিন্ন উদ্ধৃতিসহ উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আব্দুল্লাহ মহানবী (সা.)-এর জন্মের পর ইন্তেকাল করেছিলেন। কেউ বলেছেন সাত মাস পর, কেউ পনেরো মাস পর, কেউ আটাশ মাস পর (সীরাত বিশ্বকোষ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৫)।

প্রসিদ্ধ ইতিহাসগ্রন্থ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-তেও মহানবী (সা.)-এর জন্মের আলোচনায় একটি বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে যে, পিতার ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স ছিল দুই বছর।

অর্থাৎ হযরত মসীহ মওউদ (আ.) যে কথাটি লিখেছেন, তা মুসলিম ইতিহাসের ভেতরেই পাওয়া যায়। এটি তাঁর বানানো কথা নয়, আবার অজ্ঞতার ফলও নয়।

✦

মূল কথাটি কী ছিল

এখন একটু থেমে ভাবুন, এই বাক্যে তিনি আসলে কী বলতে চেয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, মহানবী (সা.) শৈশবেই পিতৃহারা ছিলেন, এতীম ছিলেন। এই মূল কথাটি কুরআন নিজেই সাক্ষ্য দেয়:

اَلَمۡ یَجِدۡکَ یَتِیۡمًا فَاٰوٰی
“তিনি কি তোমাকে এতীম পান নাই এবং (নিজ রহমতের ছায়াতলে) আশ্রয় দেন নাই?”
সূরা আয-যুহা ৯৩:৭
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৯৩:৬।

পিতা জন্মের কয়েক মাস আগে মারা যান, নাকি কয়েক মাস পরে, এতে মূল কথার কোনো পরিবর্তন হয় না। মহানবী (সা.) পিতার স্নেহ পাননি, আল্লাহ নিজেই তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) মহানবী (সা.)-এর এই এতীম জীবনের কথা গভীর ভালোবাসা নিয়ে বর্ণনা করেছেন।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

প্রসিদ্ধ মত বাদ দিয়ে দুর্বল বর্ণনা কেন নেওয়া হলো?

এখানে কেউ কেউ বলেন, অধিকাংশ ঐতিহাসিক যেহেতু জন্মের আগে মৃত্যুর কথা বলেন, তাই অন্য বর্ণনা উল্লেখ করা ঠিক হয়নি। চলুন দেখি। একটি বর্ণনা কম প্রসিদ্ধ হতে পারে, কিন্তু তা উল্লেখ করা মিথ্যা বলা নয়। খোদ ইবনে কাসীর (রহ.)-এর মতো ঐতিহাসিক নিজের বইয়ে এমন বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। কেউ তাঁকে “ইতিহাস না জানা” বলেন না। তাহলে একই বর্ণনার দিকে ইঙ্গিত করার জন্য হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে আলাদা মাপকাঠিতে বিচার করা ন্যায়সঙ্গত নয়।

এমন খুঁটিনাটি নিয়ে আপত্তির কি কোনো ওজন আছে?

একজন মানুষের দাবি সত্য কি না, তা বোঝার মাপকাঠি তার দাবির মূল বিষয়, তার শিক্ষা আর তার জীবন। ইতিহাসের একটি তারিখে ভিন্ন বর্ণনা গ্রহণ করা সেই মাপকাঠির অংশ নয়। কুরআন বলে, কোনো খবর এলে আগে যাচাই করো:

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ جَآءَکُمۡ فَاسِقٌۢ بِنَبَاٍ فَتَبَیَّنُوۡۤا
“হে যাহারা ঈমান আনিয়াছ! যদি কোন দুষ্কৃতকারী তোমাদের নিকট কোন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ লইয়া আসে তাহা হইলে তোমরা ভালরূপে তদন্ত কর…”
সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:৭

যাচাই করলে দেখা যায়, আপত্তিকারীরা যে বাক্যকে “ভুল” বলছেন, সেই কথা সীরাতের বইয়েই আছে। আপত্তিটি তাই নিজের ভারেই ভেঙে পড়ে।

এতীম হওয়ার কথাটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

কারণ মহানবী (সা.)-এর পুরো শৈশবটাই ছিল একের পর এক প্রিয়জন হারানোর গল্প। পিতাকে তিনি দেখেননি, বা দেখলেও মনে রাখার বয়সে দেখেননি। মাত্র ছয় বছর বয়সে মা হযরত আমিনাকে হারালেন। তারপর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁকে বুকে তুলে নিলেন, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে তিনিও ইন্তেকাল করলেন। এরপর চাচা আবু তালিবের ঘরে তিনি বড় হলেন।

এই এতীম শিশুকেই আল্লাহ পরে বিশ্বের জন্য রহমত বানিয়েছেন। সূরা আয-যুহার সেই আয়াত আল্লাহর এই আশ্রয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আপত্তিকৃত বাক্যটিতেও হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর মূল কথা এটিই: মহানবী (সা.) ছিলেন এক এতীম শিশু, যাঁকে আল্লাহ নিজে আশ্রয় দিয়েছেন।

পিতার মৃত্যুর তারিখ নিয়ে বর্ণনার ভিন্নতা এই মূল কথাকে বদলায় না। বরং যেকোনো বর্ণনা নিলেও দেখা যায়, মহানবী (সা.) পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। একটি সাধারণ সত্যকে তুলে ধরতে গিয়ে কোনো লেখক যদি একটি কম প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুসরণ করেন, তাকে অজ্ঞতা বলে প্রচার করা ন্যায়বিচার নয়।

শেষে একটি কথা মনে রাখা দরকার। ইতিহাসের প্রতিটি খুঁটিনাটিতে সব বর্ণনা এক রকম হয় না, আর বড় বড় আলেমরাও নিজেদের বইয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা লিখে গেছেন। সেই বর্ণনাগুলোর একটি উল্লেখ করলে কাউকে “ইতিহাস না জানা” বলা যায় না। এখানে আপত্তিটি যে বিষয় নিয়ে, সেই এতীম শৈশবের কথা বরং মহানবী (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসারই প্রকাশ। কুরআনের নির্দেশ মেনে যাচাই করলে প্রত্যেক পাঠক নিজেই দেখতে পাবেন, এখানে অজ্ঞতা নয়, বরং ইতিহাসের একটি পরিচিত বর্ণনার উল্লেখ আছে। আর সেই বর্ণনা উল্লেখ করার অধিকার যেমন অন্য ঐতিহাসিকদের আছে, তেমনি তাঁরও আছে।

সংক্ষেপে

  1. প্রসিদ্ধ মত হলো, মহানবী (সা.)-এর পিতা তাঁর জন্মের আগে ইন্তেকাল করেন।
  2. কিন্তু সীরাত ও ইতিহাসের বইয়ে জন্মের পরে ইন্তেকালের বর্ণনাও আছে; সীরাত বিশ্বকোষ (৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৮৫) ও আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া তা উল্লেখ করেছে।
  3. হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই বর্ণনার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন; এটি অজ্ঞতা নয়।
  4. মূল কথা, মহানবী (সা.) এতীম ছিলেন, আর কুরআন তা নিশ্চিত করে (সূরা আয-যুহা ৯৩:৭)।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.