বাংলায় আমরা বলি, “অমুক সাহেব আমাদের বাড়িতে পদধূলি দিয়েছেন।” কেউ ভাবে না তিনি সত্যিই পায়ের ধুলো ঝেড়ে দিয়ে গেছেন। আরবিতেও এমন কথা আছে: কোনো সেনাদল কোথাও এসে তাঁবু ফেললে বলা হয়, তারা সেখানে “নাযিল” হয়েছে। এতে কেউ বোঝে না যে সেনাদল আকাশ থেকে নেমেছে।
এই ছোট্ট শব্দটি, নুযূল, শেষ যুগের মসীহ্ নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝির কেন্দ্রে।
হাদীসটি কী বলে
হযরত নাওয়াস ইবনে সাম‘আন (রা.)-এর দীর্ঘ হাদীসে দাজ্জালের বর্ণনার পর মহানবী (সা.) বলেছেন:
দুটি জিনিস লক্ষ্য করুন। প্রথমত, এখানে “আকাশ থেকে” কথাটি নেই। দ্বিতীয়ত, শুরুতেই বলা হয়েছে আল্লাহ্ তাঁকে বা‘আসা করবেন, অর্থাৎ প্রেরণ করবেন। এই একই শব্দ কুরআন মহানবী (সা.)-এর জন্য ব্যবহার করেছে: “তিনিই উম্মীদের মধ্যে তাহাদেরই মধ্য হইতে এক রসূল আবির্ভূত করিয়াছেন” (সূরা আল-জুমু‘আ ৬২:৩)। নবীদের এভাবেই “প্রেরণ” করা হয়, মানুষের মধ্য থেকে।
হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেছেন, মানুষ নুযূল শব্দের সাথে “আকাশ” শব্দ জুড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভুল বোঝায়, অথচ যে হাদীসের নির্ভুলতা নিয়ে সন্দেহ নেই, তার কোনোটিতে এ শব্দ নেই। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, কেউ যদি এমন হাদীস দেখাতে পারে যে ঈসা (আ.) সশরীরে আকাশে উঠে গেছেন আর পরে ফিরে আসবেন, তাকে বিশ হাজার টাকা দেওয়া হবে (কিতাবুল বারিয়্যাহ, রূহানী খাযায়েন, ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৯-২২৬, পাদটীকা)।
কুরআন “নাযিল” শব্দটি কীভাবে ব্যবহার করে
এবার কুরআন খুলি। আল্লাহ্ বলেন, তিনি মানুষের জন্য একজন রসূল “নাযিল” করেছেন:
মহানবী (সা.) মক্কায় মায়ের কোলে জন্ম নিয়েছেন, সবাই জানে। তবুও কুরআন বলছে আল্লাহ্ তাঁকে “নাযেল” করেছেন। কারণ তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছেন।
আরও উদাহরণ দেখুন। কুরআন বলে, আল্লাহ্ “লৌহ নাযেল করিয়াছি” (সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২৬)। বলে, “আমরা তোমাদের জন্য এমন পোশাক নাযেল করিয়াছি” (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:২৭)। বলে, তিনি “গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুসমূহের মধ্য হইতে আট জোড়া নাযেল করিয়াছেন” (সূরা আয-যুমার ৩৯:৭)।
লোহা আসে খনি থেকে, পোশাক তৈরি হয় তুলা আর পশম থেকে, গরু-ছাগল জন্মায় মায়ের পেটে। কেউ এগুলোকে আকাশ থেকে পড়তে দেখেনি। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ব্যাখ্যা করেছেন, আরবিতে নুযূল শব্দের সাধারণ অর্থ আগমন; যে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় আসে, তাকে বলা হয় সে সেখানে নাযিল হয়েছে। আর আল্লাহর দেওয়া যে জিনিস তাঁর হিকমতে আসে, তাকে বলা হয় ঊর্ধ্বলোক থেকে নাযিল হয়েছে (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩২-১৩৩)।
মিনার, হলুদ চাদর আর ফিরিশতার ডানা
নবীর ভবিষ্যদ্বাণী প্রায়ই কাশফ বা দিব্যদর্শনের ভাষায় আসে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এর প্রতীকগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
দুটি হলুদ চাদর: স্বপ্নের ব্যাখ্যার নিয়মে হলুদ পোশাক অসুস্থতার প্রতীক। অর্থাৎ মসীহ্ যখন দাবি করবেন, তখন তাঁর স্বাস্থ্য ভালো থাকবে না (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪২-১৪৩)। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজে লিখেছেন, যখন থেকে তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হওয়ার দাবি করেছেন, তখন থেকেই দুটি রোগে ভুগছেন, একটি দেহের উপরের অংশে, একটি নিচের অংশে (হাকীকাতুল ওহী)।
দামেস্কের পূর্বে: দামেস্ক থেকেই একসময় ইমাম হুসাইন (রা.)-এর উপর অত্যাচারের নির্দেশ এসেছিল। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেছেন, ভবিষ্যদ্বাণীতে দামেস্ক শব্দটি রূপক; এর ইঙ্গিত এমন এক জনপদের দিকে, যেখানে ইয়াযীদি স্বভাবের মানুষ থাকবে, আর সেই অন্ধকার জায়গাটিই হয়ে উঠবে ঈমান ও ন্যায় প্রচারের কেন্দ্র (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৪-১৩৭, পাদটীকা)। কাদিয়ান দামেস্কের পূর্ব দিকে অবস্থিত, আর সেখানে আজ “মিনারাতুল মসীহ্” নামে একটি সাদা মিনার দাঁড়িয়ে আছে।
সাদা মিনার: মিনার থেকে আযানের ডাক দূর-দূরান্তে পৌঁছায়। মসীহের পাশে মিনার থাকা মানে, তাঁর যুগে ইসলামের ডাক পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছানোর উপায় তাঁর হাতের কাছে থাকবে: ছাপাখানা, ডাক, রেল, আর আজ স্যাটেলাইট টেলিভিশন।
ফিরিশতার ডানায় হাত: তিনি দুনিয়ার কোনো অস্ত্র বা সেনাবাহিনীর জোরে আসবেন না; আল্লাহর ফিরিশতাদের সাহায্য আর আসমানী নিদর্শন হবে তাঁর ভরসা। আর তাঁর নিঃশ্বাসে কাফিরের মৃত্যুর অর্থ, তাঁর অকাট্য যুক্তির সামনে মিথ্যা বিশ্বাস টিকতে পারবে না (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪১-১৪৩, পাদটীকা)।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“নাযিল” শব্দ তো বলে দিচ্ছে তিনি উপর থেকে নামবেন?
তাহলে মহানবী (সা.), লোহা, পোশাক আর গৃহপালিত পশু সবই আকাশ থেকে নেমেছে বলতে হবে, কারণ কুরআন সবার জন্য একই শব্দ ব্যবহার করেছে। একই হাদীস মসীহের আগে বলেছে আল্লাহ্ তাঁকে “প্রেরণ করবেন”, যা নবীদের আবির্ভাবের শব্দ। শব্দের অর্থ ঠিক করতে কুরআনের নিজের ব্যবহারই সবচেয়ে বড় দলিল।
ফিরিশতাদের ডানায় ভর দিয়ে নামবেন, এটা কি আক্ষরিক নয়?
হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) একটি সহজ প্রশ্ন রেখেছেন: মি‘রাজের রাতে মহানবী (সা.) ফিরিশতাদের সাথে ঊর্ধ্বলোকে গেছেন, বুরাক ছিল। হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উমর (রা.) বা হযরত আলী (রা.) কি সেই আরোহণ বা অবতরণ নিজের চোখে দেখেছিলেন? দেখেননি। নবীদের নেতার আরোহণই যখন কেউ চোখে দেখেনি, তখন ঈসা (আ.)-এর ফিরিশতার কাঁধে চড়ে নামার দৃশ্য মানুষ দেখবে, এমন আশা কুরআনের শিক্ষার সাথে মেলে না (মাজমুআ ইশতেহারাত, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৬-৩২৭)।
ঈসা (আ.) জীবিত না থাকলে তিনি আবার আসবেন কীভাবে?
ঠিক এখানেই ইহুদিদের ইতিহাস শিক্ষা দেয়। তারা ইলিয়াস নবীর আকাশ থেকে নামার অপেক্ষায় ছিল, অথচ ইলিয়াসের গুণ নিয়ে এসেছিলেন ইয়াহইয়া (আ.)। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) সতর্ক করেছেন, মুসলমানরা যেন সেই বিপদে না পড়ে, যেখানে ইহুদিরা পড়েছিল ভবিষ্যদ্বাণীর আক্ষরিক পূর্ণতার উপর জেদ করে (কিতাবুল বারিয়্যাহ, রূহানী খাযায়েন, ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩)। ঈসা (আ.)-এর “নুযূল” মানে তাঁর গুণ ও রূহ নিয়ে উম্মতে মুহাম্মদীয়ার একজনের আল্লাহর পক্ষ থেকে আগমন।
সংক্ষেপে
- মসীহের নুযূলের নির্ভরযোগ্য কোনো হাদীসে “আকাশ থেকে” কথাটি নেই; সহীহ মুসলিমের হাদীস বলে আল্লাহ্ তাঁকে “প্রেরণ করবেন”।
- কুরআন মহানবী (সা.), লোহা, পোশাক ও পশুর জন্যও “নাযিল” শব্দ ব্যবহার করেছে; এর অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা।
- হলুদ চাদর, দামেস্কের পূর্বে সাদা মিনার আর ফিরিশতার ডানা কাশফের প্রতীক, যার ব্যাখ্যা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জীবনে পূর্ণ হয়েছে।
- ইলিয়াসের ঘটনা দেখায়, ফিরে আসার ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয় একই গুণের আরেকজনের মাধ্যমে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The Essence of Islam, Volume III (Correct Meanings of Nuzul) · alislam.org
- The Advent of the Messiah and Mahdi · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.