ভোপালের নবাব সিদ্দিক হাসান খান ছিলেন আহলে হাদীস ধারার একজন বড় আলেম। হিজরী তেরোশো শতকের একেবারে শেষ দিকে তিনি একটি বইয়ে লিখলেন, চৌদ্দশ শতাব্দী শুরু হতে আর দশ বছর বাকি; সেই শতাব্দীর শিরোভাগে যদি মাহদীর আবির্ভাব আর ঈসার নুযূল হয়, তবে তাঁরাই হবেন সেই শতাব্দীর মুজাদ্দিদ।
তাঁর ছেলে নবাব নূরুল হাসান খান চৌদ্দশ শতাব্দীর শুরুতে ইকতিরাবুস সাআ বইয়ে লিখলেন: হিসাব অনুযায়ী মাহদীর তেরোশো শতাব্দীতেই আসার কথা ছিল, কিন্তু শতাব্দী পার হয়ে গেল, মাহদী এলেন না। এখন আমরা চৌদ্দশ শতাব্দীতে; হয়তো আল্লাহ্ দয়া করবেন, আর চার-ছয় বছরের মধ্যেই মাহদী আসবেন (পৃষ্ঠা ২২১)।
এই আলেমরা এত নিশ্চিত হয়ে সময় বলছিলেন কীসের ভিত্তিতে? চলুন সেই ভিত্তিগুলো দেখি।
প্রতি শতাব্দীর শিরোভাগে একজন সংস্কারক
মহানবী (সা.) উম্মতকে একটি স্থায়ী প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন:
উম্মত এই প্রতিশ্রুতি তেরো শতাব্দী ধরে পূর্ণ হতে দেখেছে। প্রথম শতাব্দীতে হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.), পঞ্চম শতাব্দীতে ইমাম গাযালী (রহ.), ষষ্ঠ শতাব্দীতে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.), এগারো শতাব্দীতে হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.), বারো শতাব্দীতে হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.), তেরো শতাব্দীতে সৈয়দ আহমদ বেরেলভী (রহ.)। এমন আরও অনেকে।
উম্মতের বুযুর্গরা এটাও বুঝেছিলেন যে চৌদ্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হবেন বিশেষ একজন, প্রতিশ্রুত মাহদী ও মসীহ্। তাই নবাব সিদ্দিক হাসান খানের মতো আলেম চৌদ্দশ শতাব্দীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
তিন শতাব্দী আলো, তারপর এক হাজার বছর
কুরআন একটি দীর্ঘ সময়ের হিসাব দিয়েছে:
আল্লাহর হুকুম, অর্থাৎ ইসলামের শিক্ষা, আকাশ থেকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হলো। তারপর তা ধীরে ধীরে উঠে যাবে, এক হাজার বছরের এক “দিনে”। কখন থেকে এই হাজার বছর শুরু?
মহানবী (সা.) বলেছেন, “সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের, তারপর তাদের পরবর্তীরা, তারপর তাদের পরবর্তীরা”; তারপর এমন লোক আসবে যাদের সাক্ষ্য আর কসমের কোনো ঠিক থাকবে না (সহীহ বুখারী, কিতাবুশ শাহাদাত, হাদীস ২৬৫২)। অর্থাৎ প্রথম তিন শতাব্দী উজ্জ্বল যুগ। দেখা যায়, প্রথম তিন শতাব্দীর পর ইসলামের ক্রমশ অবনতি শুরু হয়, আর তা চলে পরবর্তী এক হাজার বছর ধরে, যার দিকে এই আয়াত ইঙ্গিত করেছে। তিনশো আর হাজার মিলে তেরোশো বছর। তারপর, চৌদ্দশ শতাব্দীর শুরুতে, পুনর্জাগরণের সময়।
মূসা (আ.)-এর সাথে মহানবী (সা.)-এর তুলনাও একই কথা বলে। খলীফাতুল মসীহ্ পঞ্চম (আই.) এক খুতবায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন: মূসা (আ.)-এর খিলাফতের ধারা শেষ হয়েছিল ঈসা (আ.)-এর মাধ্যমে, যিনি এসেছিলেন মূসা (আ.)-এর পর চৌদ্দতম শতাব্দীতে; দুই ধারার মিল দাবি করে যে মহানবী (সা.)-এর উম্মতেও চৌদ্দতম শতাব্দীতে মসীহ্ আসবেন।
যিনি ঠিক সময়ে দাঁড়ালেন
আল্লামা আব্দুল গফুরের আন-নাজমুস সাকিব থেকে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত আছে: হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, এক হাজার দুইশো চল্লিশ বছর পার হলে আল্লাহ্ মাহদীকে প্রেরণ করবেন (আন-নাজমুস সাকিব, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৯)।
আর ঠিক এই সময়ে কাদিয়ান থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখলেন: “যখন হিজরতের তেরোশো শতাব্দী শেষের দিকে আর চৌদ্দশ শতাব্দীর শুরু কাছে এল, তখন আল্লাহ্ আমাকে ওহীর মাধ্যমে জানালেন যে আমি চৌদ্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ” (কিতাবুল বারিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ২০১)। তার কয়েক বছর পর তিনি জানালেন, যে মসীহের আগমনের প্রতিশ্রুতি ছিল আর যে মাহদীর কথা মহানবী (সা.) তেরোশো বছর আগে বলে গেছেন, তিনি তিনিই (তাযকিরাতুশ শাহাদাতাইন, পৃষ্ঠা ১-২)।
আর তাঁর দাবির পর, ১৩১১ হিজরীর রমযানে, আকাশে চাঁদ ও সূর্যের সেই গ্রহণ হলো, যা মাহদীর নিদর্শন হিসেবে বলা হয়েছিল। সময়, দাবি আর আসমানী নিদর্শন এক বিন্দুতে মিলে গেল।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
প্রতি শতাব্দীতে তো মুজাদ্দিদ আসেন; চৌদ্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদকেই মাহদী হতে হবে কেন?
প্রশ্নটি উল্টো দিক থেকে ভাবুন। চৌদ্দশ হিজরী শতাব্দী শেষ হয়েছে ১৯৮০ সালের নভেম্বরে। আবু দাউদের হাদীস অনুযায়ী সেই শতাব্দীর শিরোভাগেও একজন মুজাদ্দিদ আসার কথা। তিনি কে? সেই শতাব্দীর শুরুতে আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়ে মুজাদ্দিদ, মসীহ্ ও মাহদী হওয়ার দাবি নিয়ে যিনি দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি একজনই: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)। আর যুগের আলেমরা নিজেরাই লিখেছিলেন, এই শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হবেন মাহদী ও মসীহ্।
মাহদী হয়তো পরে কখনও আসবেন; সময় নিয়ে এত নিশ্চিত হওয়া যায়?
যে আলেমরা আহমদীয়াতের বিরোধী ছিলেন, তাঁরাই হিসাব কষে চৌদ্দশ শতাব্দীর শুরুর কথা বলেছিলেন। শতাব্দী যখন পার হতে লাগল, অনেকে হতাশ হয়ে লিখলেন, “আমরা মেনে নিচ্ছি মাহদী হয়তো আসবেন না, তাতে ইসলামের কোনো জরুরি বিশ্বাসের ক্ষতি নেই” (ইকতিরাবুস সাআ, পৃষ্ঠা ১৪৭)। অথচ কুরআন বলে, “নিশ্চয় আমরাই এই যিক্র (কুরআন) নাযেল করিয়াছি এবং নিশ্চয় আমরাই ইহার হেফাযতকারী” (সূরা আল-হিজর ১৫:১০)। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি মিথ্যা হয়নি; ঠিক সময়ে প্রতিশ্রুত ব্যক্তি এসেছেন। হতাশা নয়, খোঁজ নেওয়াই সঠিক পথ।
“১২৪০ বছর” বা এমন সংখ্যা কি নির্ভরযোগ্য হাদীস?
এ জাতীয় বর্ণনাগুলো সিহাহ সিত্তার নয়, আর আমাদের মূল দলিলও এগুলো নয়। মূল দলিল সহীহ সূত্রে প্রমাণিত: প্রতি শতাব্দীর মুজাদ্দিদের হাদীস (আবু দাউদ), প্রথম তিন উত্তম যুগের হাদীস (বুখারী), হাজার বছরের আয়াত (সূরা আস-সাজদা) আর মূসা (আ.)-এর উম্মতের সাথে মিল (সূরা আল-মুয্যাম্মিল)। এগুলো একসাথে চৌদ্দশ শতাব্দীর দিকে নির্দেশ করে। অন্য বর্ণনা আর বুযুর্গদের লেখা শুধু দেখায়, উম্মতের বহু আলেমও একই সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন।
সংক্ষেপে
- মহানবী (সা.) প্রতি শতাব্দীর শিরোভাগে একজন মুজাদ্দিদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন (আবু দাউদ ৪২৯১)।
- প্রথম তিন শতাব্দী উত্তম যুগ, তারপর হাজার বছরের অবনতি: মোট তেরোশো বছর পর চৌদ্দশ শতাব্দী পুনর্জাগরণের সময়।
- নবাব সিদ্দিক হাসান খানসহ যুগের আলেমরাও চৌদ্দশ শতাব্দীর শুরুতে মাহদীর অপেক্ষা করছিলেন।
- ঠিক সেই সময়ে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) মুজাদ্দিদ, মসীহ্ ও মাহদী হওয়ার দাবি করেন, আর রমযানের গ্রহণ তাঁর দাবির সাক্ষ্য দেয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Conclusion of the 14th Century and A Moment of Reflection for the Muslims · alislam.org
- The Promised Messiah (as): The need for the Imam (Friday Sermon, 22 March 2019) · alislam.org
- Hadith on Imam Mahdi · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.