আহমদীয়া মুসলিম জামাত নিয়ে আলোচনা উঠলেই একটি কথা প্রায় শেষ কথা হিসেবে বলা হয়: “১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের পুরো সংসদ এক হয়ে রায় দিয়েছে, আহমদীরা মুসলমান নয়। এত মানুষ, এত আলেম কি ভুল করতে পারেন?”
প্রশ্নটি আন্তরিক, তাই এর উত্তরও মন দিয়ে দেওয়া দরকার। কিন্তু উত্তরের আগে জানা দরকার, সেই সিদ্ধান্তটি কোন পরিস্থিতিতে, কীভাবে এবং কোন ভাষায় নেওয়া হয়েছিল। চলুন, গল্পটি শুরু থেকে দেখি।
একটি রেলস্টেশন, আর তারপর আগুন
পাঞ্জাবের চিনিওটের কাছে চেনাব নদীর পাড়ে ছোট্ট শহর রাবওয়া (আজকের নাম চেনাব নগর)। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এটিই হয়ে ওঠে আহমদীয়া মুসলিম জামাতের কেন্দ্র। শহরের ভেতর দিয়েই চলে গেছে রেললাইন, আর আছে একটি ছোট স্টেশন।

১৯৭৪ সালের মে মাসে মুলতানের নিশতার মেডিকেল কলেজের একদল ছাত্র ট্রেনে উত্তরের দিকে যাচ্ছিল। বিভিন্ন বিবরণ অনুযায়ী, ২২ মে যাওয়ার পথে রাবওয়া স্টেশনে তারা আহমদী মুসলমানদের উদ্দেশে উসকানিমূলক স্লোগান দেয়। ২৯ মে ফেরার পথে সেই একই স্টেশনে কিছু স্থানীয় যুবকের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয় এবং কয়েকজন ছাত্র আহত হয়।
একটি স্টেশনের মারামারি ছিল এটি, যার বিচার আদালতেই হতে পারত। কিন্তু খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক দিনের মধ্যে পাঞ্জাব ও অন্যান্য প্রদেশে আহমদী মুসলমানদের দোকান, বাড়ি, কারখানা ও মসজিদে হামলা শুরু হয়। বহু শহরে তাঁদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়, অনেকে প্রাণ হারান। এই অস্থিরতা চলে কয়েক মাস ধরে।
পাঞ্জাব সরকার ঘটনাটি তদন্তের জন্য লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতি কে. এম. এ. সামদানীকে নিয়ে এক সদস্যের একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। এর কাজ ছিল স্টেশনের ঘটনায় কার কতটা দায়, তা খুঁজে বের করা। ১৯৭৪ সালের আগস্টে প্রতিবেদনটি প্রাদেশিক সরকারের হাতে জমা পড়ে, কিন্তু তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
লক্ষ করুন, একটি স্টেশনের সংঘর্ষের তদন্ত চলছিল আদালতে, অথচ রাস্তায় আর সংসদে প্রশ্নটি বদলে গেল: “আহমদীরা কি মুসলমান?” অপরাধের বিচার আর ঈমানের বিচার এক হয়ে গেল।
বন্ধ দরজার ভেতরে এগারো দিন
প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার বিষয়টি জাতীয় পরিষদে পাঠায়। পরিষদ নিজেকেই একটি “বিশেষ কমিটি”তে রূপ দেয়, যার সদস্য ছিলেন পুরো সংসদ। এই কমিটির অধিবেশন চলে ৫ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ পর্যন্ত, আর পুরোটাই হয় রুদ্ধদ্বার কক্ষে (in camera)। সাংবাদিক বা সাধারণ মানুষের সেখানে ঢোকার সুযোগ ছিল না।
সরকার আহমদীয়া মুসলিম জামাতের তৎকালীন ইমাম হযরত মির্যা নাসের আহমদ (রহ.), খলীফাতুল মসীহ সালেস-কে নিজে উপস্থিত হয়ে জামাতের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে এবং সব প্রশ্নের উত্তর দিতে বলে। তাঁর সাথে চারজন সহযোগী রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। এই পাঁচজনের প্রতিনিধিদলে ছিলেন হযরত মির্যা তাহের আহমদ, যিনি পরে খলীফাতুল মসীহ রাবে (রহ.) হন।

শুরুতেই জামাত একটি লিখিত বিবৃতি পেশ করে, যার নাম “মাহযারনামা” (স্মারকলিপি)। এর একেবারে গোড়ার কথাটি ছিল: পৃথিবীর কোনো সংসদ বা আদালতের অধিকার নেই কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের ধর্ম নির্ধারণ করার, কারণ মানুষের অন্তরের খবর কেবল আল্লাহই জানেন। সাথে একটি সতর্কবাণীও লিপিবদ্ধ করা হয়: আজ যদি এই পরিষদ একটি দলকে অমুসলিম ঘোষণা করে, তবে এটি এমন এক নজির হয়ে থাকবে, যা ভবিষ্যতে অন্য ফেরকাকেও গ্রাস করতে পারে (মাহযারনামা, ভূমিকা)।
এরপর শুরু হয় জেরা। পাকিস্তানের অ্যাটর্নি জেনারেল, আলেম সংসদ সদস্যদের সহায়তায়, প্রশ্ন করে চলেন। ৫ থেকে ১০ আগস্ট এবং ২০ থেকে ২৪ আগস্ট, মোট এগারো দিন হযরত মির্যা নাসের আহমদ (রহ.) নিজে সব আপত্তির জবাব দেন।
সেই এগারো দিনে আসলে কী বলা হয়েছিল, তা দেশের মানুষ জানতে পারেনি। পুরো কার্যবিবরণী সরকার রেকর্ড করেছিল, কিন্তু গোপন রাখা হয়। প্রায় আটত্রিশ বছর পর, ২০১২ সালে, জাতীয় পরিষদের স্পিকারের দপ্তর থেকে ৩,০৮৩ পৃষ্ঠার এই নথি প্রথম বাইরে আসে। ভেবে দেখুন: যে শুনানির ভিত্তিতে লক্ষ মানুষের ধর্মীয় পরিচয় বদলে দেওয়া হলো, সেই শুনানির কথা দেশের মানুষকে প্রায় চার দশক জানতে দেওয়া হয়নি।
৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪: সংবিধানে কী লেখা হলো
৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, শনিবার। বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী জাতীয় পরিষদ সর্বসম্মতভাবে “সংবিধান (দ্বিতীয় সংশোধনী) আইন, ১৯৭৪” পাস করে, আর একই দিনে সিনেটও তা অনুমোদন দেয়। রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেন ১৭ সেপ্টেম্বর, আর আইনটি ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ পাকিস্তানের গেজেটে (Gazette of Pakistan, Extraordinary, Part I) প্রকাশিত হয়।
আইনটি ছোট, মাত্র তিনটি ধারা। প্রথম ধারায় নাম। দ্বিতীয় ধারায় সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে বদল আনা হয়। এই অনুচ্ছেদ প্রাদেশিক পরিষদে খ্রিস্টান, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ ও পারসি সম্প্রদায়ের মতো অমুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত আসনের কথা বলে। সেখানে “সম্প্রদায়” শব্দের পরে যোগ করা হয়:
“and persons of Quadiani group or the Lahori group (who call themselves 'Ahmadis')”
অর্থাৎ: “এবং কাদিয়ানী গোষ্ঠী বা লাহোরী গোষ্ঠীর ব্যক্তিরা (যারা নিজেদের ‘আহমদী’ বলে পরিচয় দেয়)।” এভাবে আহমদী মুসলমানদের সংখ্যালঘু অমুসলিম আসনের তালিকায় তুলে দেওয়া হয়।
তৃতীয় ধারায় ২৬০ অনুচ্ছেদে একটি নতুন উপধারা (৩) যোগ করা হয়, যা ছিল এরকম:
“A person who does not believe in the absolute and unqualified finality of The Prophethood of MUHAMMAD (Peace be upon him), the last of the Prophets or claims to be a Prophet, in any sense of the word or of any description whatsoever, after MUHAMMAD (Peace be upon him), or recognizes such a claimant as a Prophet or religious reformer, is not a Muslim for the purposes of the Constitution or law.”
বাংলায়: “যে ব্যক্তি নবীদের মধ্যে সর্বশেষ মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তের নিরঙ্কুশ ও শর্তহীন সমাপ্তিতে বিশ্বাস করে না, অথবা মুহাম্মদ (সা.)-এর পরে শব্দের যে কোনো অর্থে বা যে কোনো ধরনের নবী হওয়ার দাবি করে, অথবা এমন দাবিদারকে নবী বা ধর্মীয় সংস্কারক হিসেবে মেনে নেয়, সে সংবিধান বা আইনের উদ্দেশ্যে মুসলমান নয়।”
দুটি শব্দগুচ্ছ খেয়াল করুন। প্রথমত, “সংবিধান বা আইনের উদ্দেশ্যে”। অর্থাৎ সংসদ নিজেও দাবি করেনি যে সে আল্লাহর কাছে কে মুসলমান তা ঠিক করছে; সে কেবল রাষ্ট্রের খাতায় একটি আইনি সংজ্ঞা লিখছে। দ্বিতীয়ত, “ধর্মীয় সংস্কারক” (religious reformer)। শুধু নবী নয়, কাউকে মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক মানাকেও এখানে মুসলমান না থাকার কারণ বানানো হয়েছে। অথচ প্রতি শতাব্দীতে মুজাদ্দিদ আসার ধারণা মুসলিম উম্মাহর বহু আলেমের কাছে সুপরিচিত।
পরে এই অনুচ্ছেদটি আরও বিস্তৃত করা হয় এবং এতে অমুসলিমদের একটি তালিকা যোগ হয়, যেখানে খ্রিস্টান, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, পারসি ও বাহাইদের সাথে আহমদীদের নামও লেখা হয়।
১৯৮৪: পরিচয়ের পর এবার ইবাদতও অপরাধ
১৯৭৪ সালের সংশোধনী বলেছিল, আইনের চোখে আহমদী মুসলমানরা “মুসলমান” নন। দশ বছর পর আরেক ধাপ এগোনো হলো। ২৬ এপ্রিল ১৯৮৪ সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউল হক “অধ্যাদেশ নং ২০” (Ordinance XX) জারি করেন। এর মাধ্যমে পাকিস্তান দণ্ডবিধিতে দুটি নতুন ধারা যোগ হয়: ২৯৮-বি এবং ২৯৮-সি।
২৯৮-বি ধারা অনুযায়ী, কোনো আহমদী যদি নিজেদের ইবাদতের স্থানকে “মসজিদ” বলেন, নিজেদের নামাজের আহ্বানকে “আযান” বলেন বা মুসলমানদের মতো আযান দেন, কিংবা নিজেদের কাউকে “আমীরুল মু’মিনীন”, “সাহাবী” বা “রাযিআল্লাহু আনহু” বলে উল্লেখ করেন, তবে তাঁর তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।
২৯৮-সি ধারা আরও এক ধাপ এগিয়ে। এর মূল কথাগুলো হলো:
“…who directly or indirectly, poses himself as a Muslim, or calls, or refers to, his faith as Islam, or preaches or propagates his faith, or invites others to accept his faith… shall be punished with imprisonment of either description for a term which may extend to three years and shall also be liable to fine.”
বাংলায়: “…যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিজেকে মুসলমান হিসেবে উপস্থাপন করে, অথবা নিজের ধর্মকে ইসলাম বলে, অথবা নিজের ধর্ম প্রচার করে, অথবা অন্যকে তা গ্রহণের আমন্ত্রণ জানায়… তাকে তিন বছর পর্যন্ত যে কোনো প্রকারের কারাদণ্ড দেওয়া হবে এবং জরিমানাও হবে।”
এর ফল কী দাঁড়াল, তা সহজেই বোঝা যায়। একজন আহমদী মুসলমান “আসসালামু আলাইকুম” বললে, কালেমা লেখা ব্যাজ পরলে, বা নিজেকে মুসলমান বললে মামলা হতে পারে। অসংখ্য মানুষের বিরুদ্ধে এমন মামলা হয়েছে। জামাতের তৎকালীন ইমাম হযরত মির্যা তাহের আহমদ, খলীফাতুল মসীহ রাবে (রহ.), এই আইন মেনে নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারছিলেন না। তাই ২৯ এপ্রিল ১৯৮৪ তিনি পাকিস্তান ছেড়ে লন্ডনে চলে যান।
১৯৫৩: যখন আলেমরাই একমত হতে পারেননি
১৯৭৪ সালের ঘটনা হঠাৎ ঘটেনি। এর বিশ বছর আগে, ১৯৫৩ সালে, একই দাবিতে পাঞ্জাবে বড় আন্দোলন ও দাঙ্গা হয়েছিল। লাহোরে সামরিক আইন জারি করতে হয়েছিল। এরপর সরকার বিচারপতি মুহাম্মদ মুনীর ও বিচারপতি এম. আর. কায়ানীকে নিয়ে একটি তদন্ত আদালত গঠন করে। ১৯৫৩ সালের ১ জুলাই শুনানি শুরু হয়, আর ১০ এপ্রিল ১৯৫৪ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এটিই বিখ্যাত “মুনীর রিপোর্ট”।
সেই আদালত তখনকার প্রধান আলেমদের একটি সরল প্রশ্ন করেছিল: মুসলমান কাকে বলে? উত্তরগুলো পাশাপাশি রেখে আদালত লিখল:
“Keeping in view the several definitions given by the ulama, need we make any comment except that no two learned divines are agreed on this fundamental. If we attempt our own definition as each learned divine has done and that definition differs from that given by all others, we unanimously go out of the fold of Islam. And if we adopt the definition given by any one of the ulama, we remain Muslims according to the view of that alim but kafirs according to the definition of every one else.”
বাংলায়: “আলেমদের দেওয়া বিভিন্ন সংজ্ঞা সামনে রেখে আমাদের কি আর কোনো মন্তব্য করার প্রয়োজন আছে, এ ছাড়া যে এই মৌলিক বিষয়েও কোনো দুজন বিজ্ঞ আলেম একমত নন? প্রত্যেক আলেমের মতো আমরাও যদি নিজেদের একটি সংজ্ঞা দিই, আর তা অন্য সবার থেকে আলাদা হয়, তবে আমরা সর্বসম্মতভাবে ইসলামের গণ্ডির বাইরে চলে যাই। আর যদি কোনো একজন আলেমের সংজ্ঞা গ্রহণ করি, তবে সেই আলেমের মতে আমরা মুসলমান থাকি, কিন্তু বাকি সবার সংজ্ঞা অনুযায়ী কাফের।” (Report of the Court of Inquiry constituted under Punjab Act II of 1954 to enquire into the Punjab Disturbances of 1953, লাহোর, ১৯৫৪, পৃ. ২১৮)
এই কথাটি মনে রাখুন। ১৯৫৩ সালে যে প্রশ্নে আলেমরা একমত হতে পারেননি, ১৯৭৪ সালে সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো নতুন দলিল দিয়ে নয়, ভোট দিয়ে লেখা হলো। আর সেই সংজ্ঞাটিও আসলে মুসলমান কে তা বলে না; বলে, একটি নির্দিষ্ট দল মুসলমান নয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
সংসদ তো জনগণের প্রতিনিধি। তারা কি কারও ঈমানের ফয়সালা করতে পারে না?
সংসদ কর, সড়ক, বিদ্যালয়, আদালত নিয়ে আইন করতে পারে। কিন্তু ঈমান থাকে অন্তরে, আর অন্তরের খবর মানুষের ভোটে জানা যায় না। কুরআন এই বিষয়ে একটি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। যুদ্ধের অভিযানে মুসলমানদের বলা হলো:
ভাবুন, এই আয়াত নাযিল হয়েছিল যুদ্ধের ময়দানের প্রেক্ষাপটে, যেখানে সন্দেহ করার কারণ সবচেয়ে বেশি। তবুও আল্লাহ বললেন, যে তোমাকে সালাম দেয়, তাকে বলো না “তুমি মু’মিন নও”। আর ১৯৮৪ সালের আইন ঠিক সেই সালামকেই অপরাধ বানাল।
সহীহ বুখারীতে এর একটি জীবন্ত উদাহরণ আছে। এক অভিযানে হযরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) এক ব্যক্তিকে হত্যা করেন, যদিও সে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছিল। উসামা (রা.) ভেবেছিলেন, লোকটি শুধু প্রাণ বাঁচাতে কালেমা পড়েছে। মহানবী (সা.) শুনে বারবার বলতে থাকেন, “হে উসামা, সে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পরও তুমি তাকে হত্যা করলে?” উসামা (রা.) বলেন, তিনি এতটাই লজ্জিত হয়েছিলেন যে মনে হচ্ছিল, হায়, যদি সেদিনের আগে আমি ইসলামই গ্রহণ না করতাম (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীস ৪২৬৯)। অন্তরে কী আছে, তা নিয়ে রায় দেওয়ার অধিকার মহানবী (সা.) তাঁর প্রিয় সাহাবীকেও দেননি।
কুরআন আরও বলে:
যে আইন একজন মানুষকে জেলের ভয় দেখিয়ে বলে, “তুমি নিজেকে মুসলমান বলতে পারবে না, নিজের ইবাদতের ঘরকে মসজিদ বলতে পারবে না”, সেটি ধর্মের ব্যাপারে বলপ্রয়োগ ছাড়া আর কী? তাই উত্তর পরিষ্কার: সংসদ আইনি খাতায় যা খুশি লিখতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কাছে কে মু’মিন, সেই রায় দেওয়ার ক্ষমতা কুরআন কোনো মানুষকে দেয়নি।
কিন্তু পুরো মুসলিম বিশ্ব তো একমত হয়েছিল?
অনেকে বলেন, শুধু পাকিস্তান নয়, ১৯৭৪ সালে মক্কায় রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী (মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ) একটি সম্মেলনে প্রস্তাব নিয়েছিল যে আহমদীদের অমুসলিম সংখ্যালঘু ঘোষণা করা হোক। কথাটি সত্য: ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে সেই সম্মেলনে এমন একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল, পাকিস্তানের ঘটনার কয়েক সপ্তাহ আগে।
কিন্তু একটু থেমে দেখুন। রাবেতা কোনো রাষ্ট্র নয়, কোনো আদালতও নয়; এটি বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় সংগঠনের একটি সংস্থা। তার প্রস্তাব ছিল একটি সুপারিশ। আর সেই সুপারিশ অনুযায়ী সংবিধান বদলে একটি মুসলিম দলকে অমুসলিম ঘোষণা করেছে পাকিস্তান। বাংলাদেশসহ অধিকাংশ মুসলিমপ্রধান দেশের সংবিধানে এ ধরনের কোনো ধারা নেই।
বরং উল্টো উদাহরণও আছে। ১৯৭০ সালের ৮ ডিসেম্বর ভারতের কেরালা হাইকোর্ট একটি বিয়ে-সংক্রান্ত মামলায় প্রশ্নটি সরাসরি বিচার করে: একজন মুসলমান আহমদী হলে কি তিনি মুরতাদ হয়ে যান? বিচারপতি ভি. আর. কৃষ্ণ আইয়ার রায় দেন, আহমদী মুসলমানরা মুসলমানই এবং তাঁদের মুরতাদ ঘোষণা করা যায় না (Shihabuddin Imbichi Koya Thangal v. K.P. Ahammed Koya, AIR 1971 Kerala 206)।
আর “সবাই একমত” কথাটির সবচেয়ে বড় উত্তর তো মুনীর রিপোর্টেই আছে: মুসলমানের সংজ্ঞাতেই যেখানে দুজন আলেম একমত হতে পারেননি, সেখানে একটি দলকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারে একমত হওয়া আসলে সংজ্ঞায় একমত হওয়া নয়। ঐক্য ছিল বিরোধিতায়, দলিলে নয়।
তারা যদি মুসলমানই হন, তাহলে রাষ্ট্র তাঁদের প্রত্যাখ্যান করল কেন?
রাষ্ট্র কেন কী করে, তার উত্তর অনেক সময় রাজনীতিতে খুঁজতে হয়, ধর্মে নয়। কয়েক মাসের দাঙ্গা, রাস্তায় চাপ, আর নির্বাচনী হিসাব, সব মিলিয়ে সরকার একটি দ্রুত “সমাধান” চেয়েছিল। কিন্তু মুসলমান কে, এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রের প্রয়োজন দিয়ে নয়, মহানবী (সা.)-এর কথা দিয়ে মাপতে হবে। তিনি নিজেই সংজ্ঞাটি দিয়ে গেছেন:
আহমদী মুসলমানরা একই কালেমা পড়েন, একই কিবলার দিকে মুখ করে একই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, একই রমযানে রোযা রাখেন, একই কুরআন তেলাওয়াত করেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, এমন মানুষ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জিম্মায় আছে, আর সেই জিম্মা ভঙ্গ করো না। ১৯৭৪ সালে মাহযারনামাতেও জামাত ঠিক এই প্রস্তাবই দিয়েছিল: সংবিধানে সেই সংজ্ঞাই রাখা হোক, যা খাতামুল আম্বিয়া (সা.) নিজে দিয়েছেন। কিন্তু সংসদ সেই সংজ্ঞা নেয়নি; নিজেদের তৈরি একটি সংজ্ঞা নিয়েছে।
আহমদী মুসলমানরা নিজেরা কী বলেন?
আহমদী মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.) খাতামান নাবিয়্যীন, তাঁর শরীয়ত চূড়ান্ত, কুরআন শেষ কিতাব, আর তাঁর আনুগত্যের বাইরে কেউ আল্লাহর কাছে কোনো মর্যাদা পেতে পারে না। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে তাঁরা মানেন মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী আগত প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী হিসেবে, যিনি মহানবী (সা.)-এর অনুসারী এবং তাঁরই ধর্মের সেবক।
এই বিশ্বাস নিয়ে কারও দ্বিমত থাকতেই পারে। দ্বিমত থাকলে আলোচনা হবে, যুক্তি ও দলিল দিয়ে। কিন্তু দ্বিমতকে আইনের মাধ্যমে “তুমি মুসলমান নও” ঘোষণায় রূপ দেওয়া, আর তারপর সালাম, আযান ও কালেমাকে অপরাধ বানানো, এটি দলিলের পথ নয়।
১৯৭৪ সালের সেই কঠিন সময়েও আহমদীয়া মুসলিম জামাত প্রতিশোধের পথে যায়নি। জামাতের অবস্থান ছিল ধৈর্য আর দোয়ার। ১৯৮০ সালে স্পেনে একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় হযরত মির্যা নাসের আহমদ (রহ.) যে বাক্যটি ঘোষণা করেন, সেটিই আজ জামাতের পরিচিত মূলমন্ত্র: “সবার প্রতি ভালোবাসা, কারও প্রতি ঘৃণা নয়।”
শেষে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন। কাল যদি কোনো সংসদ ভোট দিয়ে বলে, আপনার মাযহাব মুসলমান নয়, আপনি কি সেই ভোটকে আল্লাহর রায় বলে মেনে নেবেন? যদি না নেন, তবে অন্যের বেলায়ও সেই ভোট ঈমানের প্রমাণ নয়।
সংক্ষেপে
- ২৯ মে ১৯৭৪ রাবওয়া স্টেশনের একটি সংঘর্ষ থেকে দেশজুড়ে আহমদীবিরোধী দাঙ্গা শুরু হয়; সামদানী ট্রাইব্যুনালের প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
- জাতীয় পরিষদের বিশেষ কমিটির রুদ্ধদ্বার শুনানিতে হযরত মির্যা নাসের আহমদ (রহ.) এগারো দিন জেরার জবাব দেন; সেই রেকর্ড প্রায় আটত্রিশ বছর গোপন ছিল।
- ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪-এর দ্বিতীয় সংশোধনী নিজেই বলে, এটি কেবল “সংবিধান বা আইনের উদ্দেশ্যে” একটি সংজ্ঞা; ১৯৮৪ সালের অধ্যাদেশ ২০ এরপর সালাম, আযান ও নিজেকে মুসলমান বলাকেও অপরাধ বানায়।
- ১৯৫৪ সালের মুনীর রিপোর্ট দেখিয়েছে, মুসলমানের সংজ্ঞায় কোনো দুজন আলেমও একমত ছিলেন না।
- কুরআন (৪:৯৫, ২:২৫৭) ও মহানবী (সা.)-এর সংজ্ঞা (বুখারী ৩৯১) অনুযায়ী যে সালাম দেয়, আমাদের নামাজ পড়ে ও আমাদের কিবলার দিকে মুখ করে, তাকে অমুসলিম বলার অধিকার কোনো সংসদের নেই।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Mahzarnama (The Memorandum) · alislam.org
- Ahmadi Muslims: Loyal community under siege since 1974 · alhakam.org
- Second Amendment to the Constitution of Pakistan · Wikipedia
- Punjab Disturbances Court of Inquiry (Munir Report) · Wikipedia
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.