১৯০৪ সালের শিয়ালকোট। এক বিশাল সভায় হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর লেখা বক্তৃতা পড়ে শোনানো হচ্ছে। শ্রোতাদের অনেকের ঘরেই তখন শোক। প্লেগ কয়েক বছর ধরে পাঞ্জাবের গ্রাম-শহর উজাড় করে দিচ্ছে, কোনো চিকিৎসায় থামছে না।
বক্তৃতায় তিনি বললেন, এই মহামারীর সংবাদ কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় আছে। কথাটিই পরে একটি আপত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, মির্যা সাহেব লিখেছেন যে কুরআন ও হাদীসে প্লেগের ভবিষ্যদ্বাণী আছে। তাঁদের মতে, কুরআনে “প্লেগ” শব্দটি কোথাও নেই, তাই এটি জোর করে টানা ব্যাখ্যা।
প্রথম আয়াত: কিয়ামতের আগে জনপদের শাস্তি
শিয়ালকোটের বক্তৃতায় তিনি এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন: কিয়ামতের কিছু আগে একটি ভয়াবহ মহামারী আসবে; কিছু জনপদ পুরোপুরি উজাড় হবে, আর কিছু কষ্ট পেয়ে আবার বেঁচে উঠবে। (লেকচার শিয়ালকোট)
দ্বিতীয় আয়াত: মাটি থেকে বের হওয়া কীট
আয়াতটি খেয়াল করে পড়ুন। কীটটি আসবে “মাটি থেকে”, মানুষকে “জখম” করবে, আর আসবে একটি বিশেষ কারণে: মানুষ আল্লাহর নিদর্শনে বিশ্বাস করেনি।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, এই দুটি আয়াতে প্লেগের স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী আছে, কারণ প্লেগও একটি জীবাণু থেকে হয়, যদিও আগের চিকিৎসকরা তা জানতেন না। কিন্তু অদৃশ্যের জ্ঞানী আল্লাহ জানতেন, প্লেগের আসল কারণ মাটি থেকে বের হওয়া একটি জীবাণু; তাই একে “দাব্বাতুল আরদ”, মাটির কীট বলা হয়েছে। (লেকচার শিয়ালকোট)
আজ আমরা জানি, প্লেগের জীবাণু ছড়ায় ইঁদুরের গায়ের মাছির কামড়ে, আর ইঁদুর বাস করে মাটির গর্তে। মাটি থেকে উঠে আসা একটি ক্ষুদ্র প্রাণী, যার কামড়ে মানুষ জখম হয়: আয়াতের বর্ণনা এর সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়।
হাদীসে কী আছে?
সহীহ মুসলিমে হযরত নাওয়াস বিন সামআন (রা.) বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসে মসীহের যুগের বর্ণনা আছে। তাতে এক জায়গায় বলা হয়েছে:
“নাগাফ” মানে এক ধরনের কীট বা ক্ষুদ্র প্রাণী, যা ঘাড়ে আক্রমণ করে। প্লেগের একটি পরিচিত লক্ষণ ঘাড়, বগল ও কুঁচকির ফোলা গ্রন্থি। মসীহের যুগে, তাঁর দোয়ার পর, ক্ষুদ্র কীটের আক্রমণে দলে দলে মৃত্যু: হাদীসের এই দৃশ্য হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর যুগের প্লেগের সঙ্গে মিলে যায়।
তিনি নুযূলুল মসীহ-তেও এ কথা লিখেছেন যে, সুন্নিদের সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য গ্রন্থে এবং শিয়াদের ইকমালুদ্দীন গ্রন্থে মসীহ মওউদের যুগে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার সংবাদ আছে। (নুযূলুল মসীহ, পৃষ্ঠা ১৮)
এই মহামারীর মধ্যেই হযরত মসীহ মওউদ (আ.) একটি ইলহাম পান: “তোমার ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে যারা আছে, আমি তাদের সবাইকে রক্ষা করব।” তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, এর অর্থ শুধু ইট-পাথরের ঘরের বাসিন্দা নয়, বরং তাঁর পূর্ণ অনুসারীরাও এই প্রতিশ্রুতির অন্তর্ভুক্ত। আলইসলাম ডট অর্গ লেখে, ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তাঁর যুগে প্লেগের বিরাট মহামারী ছড়িয়েছিল, বহু বিরোধী মারা গিয়েছিল, অথচ তাঁর ঘরের ভেতরের কেউ আক্রান্ত হয়নি; ঠিক যেমন নূহ (আ.)-এর নৌকার আরোহীরা প্লাবন থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“দাব্বা” তো একটি বড় জন্তু, কীট নয়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, দাব্বাতুল আরদ এক বিশাল অলৌকিক জন্তু, যে মানুষের সঙ্গে কথা বলবে। চলুন শব্দটি দেখি। আরবিতে “দাব্বা” মানে মাটির ওপর চলাফেরা করা যেকোনো প্রাণী, ক্ষুদ্রতম থেকে বৃহত্তম পর্যন্ত। আর “তুকাল্লিমুহুম” শব্দটির মূল “কালম”, যার অর্থ জখম করা; তাই আহমদীয়া অনুবাদে লেখা হয়েছে “তাহাদিগকে জখম করিবে”। একটি জন্তু মানুষের সঙ্গে কথা বলবে, এর চেয়ে একটি কীট মানুষকে জখম করবে, এই অর্থ আয়াতের শেষ অংশের সঙ্গে বেশি মেলে: শাস্তিটি আসছে নিদর্শন অস্বীকারের কারণে।
মুসলিমের হাদীসে তো নাগাফ ইয়াজুজ-মাজুজের ওপর পাঠানোর কথা?
হ্যাঁ, হাদীসে এটি সেই প্রবল শক্তিশালী দলের ওপর আসে, যাদের মোকাবেলার ক্ষমতা কারো নেই, আর তা আসে মসীহ ও তাঁর সঙ্গীদের দোয়ার পর। মূল কথাটি হলো, মসীহের যুগে তাঁর বিরোধিতাকারীদের ওপর আল্লাহ এক ক্ষুদ্র কীটের মাধ্যমে মৃত্যু পাঠাবেন। এটাই এখানে প্রমাণের বিষয়: হাদীস মসীহের যুগের সঙ্গে কীটজনিত মহামারীকে যুক্ত করেছে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এর বেশি কিছু দাবি করেননি।
একটি রোগকে আল্লাহর নিদর্শন বলা কি ঠিক?
কুরআনেই নূহ (আ.)-এর জাতির জন্য প্লাবন, লূত (আ.)-এর জাতির জন্য পাথরবৃষ্টি নিদর্শন হিসেবে এসেছে। প্রকৃতির শক্তিই আল্লাহর হাতে শাস্তির মাধ্যম হয়। শিয়ালকোটের বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, আকাশের নিদর্শন দেখে খুব কম মানুষ ঈমান এনেছিল; কিন্তু প্লেগ ও ভূমিকম্পের পর অল্প সময়ে প্রায় দুই লাখ মানুষ তাঁর হাতে বয়আত করে। নূহ (আ.)-এর জাতির সঙ্গে এই মিলের দিকেই তিনি ইঙ্গিত করেছিলেন।
সংক্ষেপে
- সূরা বনী ইসরাঈল কিয়ামতের আগে জনপদগুলোর কঠোর শাস্তির কথা বলে; সূরা নামল মাটি থেকে বের হওয়া জখমকারী কীটের কথা বলে।
- প্লেগ মাটির জীবাণু ও কীটের মাধ্যমে ছড়ায়; তাই এই আয়াতগুলো প্লেগের সঙ্গে মিলে যায়।
- সহীহ মুসলিমে মসীহের যুগে ঘাড়ে আক্রমণকারী “নাগাফ” কীটে দলে দলে মৃত্যুর কথা আছে।
- তাই কুরআন-হাদীসে প্লেগের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা মনগড়া নয়, আয়াত ও হাদীসের শব্দ থেকেই নেওয়া।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Lecture Sialkot · alislam.org
- Establishing the Truthfulness of the Promised Messiah (as) from the Holy Quran · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.