নবুওয়াতের পঞ্চম বছর। মক্কায় মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চরমে। তখন মহানবী (সা.) কয়েকজন সাহাবীকে পরামর্শ দিলেন সাগর পেরিয়ে আবিসিনিয়ায় (হাবশায়) চলে যেতে। সেখানকার রাজা নাজাশী ছিলেন খ্রিস্টান, কিন্তু ন্যায়পরায়ণ; তাঁর দেশে কারও ওপর জুলুম হতো না।
ভাবুন, পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র শহর মক্কা ছেড়ে মুসলমানরা আশ্রয় নিলেন এক খ্রিস্টান রাজার দেশে। কেউ কি বলবেন, এতে মক্কার অবমাননা হয়েছে? না। কারণ শহরের পবিত্রতা এক জিনিস, আর সেখানকার শাসকদের আচরণ আরেক জিনিস।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, এই (ব্রিটিশ) সরকারের অধীনে তিনি যে নিরাপত্তা পাচ্ছেন, তা মক্কা মুয়াযযামা ও মদীনাতেও পাওয়া সম্ভব নয়, আর রোম সম্রাটের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে তো নয়ই। আপত্তিকারীরা রূহানী খাযায়েন ১৫তম খণ্ডের ১৫৬ পৃষ্ঠার বরাত দেন এবং বলেন, এতে পবিত্র শহরগুলোকে ছোট করে ইংরেজদের প্রশংসা করা হয়েছে।
বাক্যটির বিষয়বস্তু খেয়াল করুন: “নিরাপত্তা”। কথাটি শহরের পবিত্রতা নিয়ে নয়, সেখানকার শাসনব্যবস্থায় একজন নতুন দাবিদারের নিরাপদে মত প্রকাশ ও প্রচারের সুযোগ নিয়ে। তাঁর যুগে মক্কা, মদীনা আর কনস্টান্টিনোপল সবই তুর্কি উসমানীয় সালতানাতের অধীনে ছিল।
সে যুগের বাস্তবতা
ইংরেজদের আগে পাঞ্জাব ছিল শিখ শাসনে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, মুসলমানরা এখনো ভোলেনি, শিখদের হাতে তাদের দুনিয়া ও দীন দুই-ই বিপন্ন ছিল; ধর্মীয় দায়িত্ব পালন কঠিন ছিল, এমনকি আযান দেওয়ার কারণে একজন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল (১০ জুলাই ১৯০০-এর বিজ্ঞাপন)।
শিখ শাসনের অবসানের পর ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর এলাহাবাদের দরবারে রানী ভিক্টোরিয়ার পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল, কোনো প্রজাকে তার ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মপালনের কারণে নির্যাতন করা হবে না, আর আইনের চোখে সবাই সমান সুরক্ষা পাবে।
ইংরেজ শাসনে প্রত্যেক ধর্মের মানুষ নিজের ধর্ম প্রচারের স্বাধীনতা পেয়েছিল। তিনি লিখেছেন, সরকার প্রত্যেক জাতিকে নিজ নিজ ধর্ম প্রচারের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে, ফলে মানুষ প্রতিটি ধর্মের নীতি ও যুক্তি যাচাই করার সুযোগ পেয়েছে; আর এ কারণেই তাঁরা লেখায় ও বক্তৃতায় এই সরকারের অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেন (“রুয়েদাদে জলসায়ে দোয়া”)।
এই স্বাধীনতার জোরেই তিনি খ্রিস্টান পাদ্রীদের মোকাবিলা করেছেন, প্রমাণ করেছেন যে ঈসা (আ.) ক্রুশে মারা যাননি, আর ইসলামের পক্ষে অসংখ্য বই লিখেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“অন্য কোনো আলেম কি এমন কথা বলেছেন, নাকি এটা শুধু তাঁরই মত?”
এখানে কেউ কেউ ধরে নেন, এমন তুলনা কেবল হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-ই করেছেন। চলুন দেখি তাঁর সবচেয়ে বড় বিরোধী, আহলে হাদীস নেতা মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী কী লিখেছিলেন:
“তুরস্কের বাদশাহ একজন মুসলমান বাদশাহ, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনের দিক থেকে (ধর্মীয় দিক বাদ দিয়ে) ব্রিটিশ সরকারও আমাদের মুসলমানদের জন্য কম গর্বের নয়; আর বিশেষ করে আহলে হাদীস নামে পরিচিতদের জন্য শান্তি ও বিবেকের স্বাধীনতার দিক থেকে এই সরকার (তুরস্ক, ইরান ও খোরাসানের তুলনায়) বেশি গর্বের।” (ইশাআতুস সুন্নাহ, খণ্ড ৬, পৃ. ২৯২)
যে কথায় বিরোধী আলেম নিজেই একমত, তা নিয়ে শুধু একজনকে অভিযুক্ত করা ন্যায়বিচার নয়। আহলে হাদীসরা নিজেদের মত প্রকাশে যে স্বাধীনতা ব্রিটিশ ভারতে পেতেন, তা তখনকার মুসলিম দেশগুলোতে পেতেন না, এটাই ছিল তাঁদের বক্তব্য।
“কুরআন তো বলেছে, হারামে যে প্রবেশ করে সে নিরাপদ?”
এই আয়াত হারাম শরীফের পবিত্রতা ও সেখানে রক্তপাত নিষিদ্ধ হওয়ার ঐশী বিধান। কিন্তু এই বিধান মানুষ সবসময় মেনেছে, এমন নয়। মহানবী (সা.) নিজে মক্কায় নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁকে হিজরত করতে হয়েছে, সাহাবীদের হাবশায় পাঠাতে হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর বিধান আর শাসকদের আচরণের মধ্যে ফারাক থাকতে পারে, আর সেই ফারাকের কথা বলা আয়াতের অস্বীকার নয়।
“এটা কি ইংরেজদের তোষামোদ ছিল না?”
তিনি নিজেই এর উত্তর দিয়েছেন: “আমি সরকারকে তোষামোদ করি না, যেমন কিছু অজ্ঞ লোক মনে করে যে আমি সরকারের কাছ থেকে কিছু পেতে চাই। বরং আমি ঈমানের দাবিতে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাকে ন্যায্য ও কর্তব্য মনে করি।” (তবলীগে রিসালাত, খণ্ড ১০, পৃ. ১২৩)
এই কৃতজ্ঞতা মহানবী (সা.)-এরই শিক্ষা:
আর তোষামোদকারী হলে ইংরেজদের ধর্মের মূলে আঘাত করতেন না। অথচ তিনি ঘোষণা করেছেন, ঈসা (আ.) ক্রুশে মারা যাননি, স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনি খোদা বা খোদার পুত্র নন (কিশতিয়ে নূহ, পৃ. ৬৮)। সরকার তাঁকে কোনো সুবিধা দেয়নি; বরং তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে, আর তাঁর ইন্তেকালের দুই বছর আগ পর্যন্ত কাদিয়ানে আসা প্রত্যেক অতিথির নাম পুলিশ লিখে রাখত।
সিদ্ধান্ত: কথাটি মক্কা-মদীনার পবিত্রতা নিয়ে নয়, সেকালের শাসনব্যবস্থায় ধর্মপ্রচারের নিরাপত্তা নিয়ে। একই কথা তাঁর বিরোধী আলেমরাও বলেছেন, আর এর ভিত্তি মহানবী (সা.)-এর শেখানো কৃতজ্ঞতা।
সংক্ষেপে
- বাক্যটির বিষয় “নিরাপত্তা”, অর্থাৎ শাসকের অধীনে নতুন মত প্রচারের স্বাধীনতা; পবিত্র শহরের মর্যাদা নয়।
- মহানবী (সা.)-এর যুগেও সাহাবীরা মক্কা ছেড়ে এক ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টান রাজার দেশে নিরাপত্তা পেয়েছিলেন।
- বিরোধী আলেম মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভীও লিখেছেন, বিবেকের স্বাধীনতায় ব্রিটিশ সরকার তুরস্ক, ইরান ও খোরাসানের চেয়ে এগিয়ে।
- কৃতজ্ঞতা প্রকাশ মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা (তিরমিযী ১৯৫৪); তোষামোদ হলে তিনি খ্রিস্টধর্মের মূল বিশ্বাসে আঘাত করতেন না।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Ahmadiyyat and the British (Truth About Ahmadiyyat) · alislam.org
- Jihad against the British Government in India? · alislam.org
- Suspension of Jihad (Truth About Ahmadiyyat) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.