১৩ মার্চ ১৯১৪, শুক্রবার। কাদিয়ানের বড় মসজিদে জুমার নামায শেষ হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ছিলেন হযরত হাকীম মৌলভী নূরুদ্দীন (রা.), হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর প্রথম খলীফা। সেদিন দুপুরে খবর এল, তিনি ইন্তেকাল করেছেন।
শোকের সাথে সাথে আরেকটি ভয় তখন অনেকের মনে: জামাত কি ঐক্যবদ্ধ থাকবে? কারণ কয়েক বছর ধরেই একটি প্রশ্ন নিয়ে ভেতরে ভেতরে মতভেদ চলছিল। পরের কয়েক দিনেই সেই মতভেদ একটি স্থায়ী বিভাজনে রূপ নিল।
প্রশ্নটি কী?
অনেকে শুনেছেন, আহমদী মুসলমানদের মধ্যে “কাদিয়ানী” আর “লাহোরী” নামে দুটি দল আছে। প্রশ্ন ওঠে: একই মানুষের অনুসারীরা দুই ভাগ হলো কেন? আর এই বিভাজন কি তাঁর দাবির দুর্বলতা প্রমাণ করে?
শুরুতেই নাম নিয়ে একটি কথা। “কাদিয়ানী” নামটি মূলত বিরোধীদের দেওয়া। বড় দলটি নিজেকে বলে আহমদীয়া মুসলিম জামাত, যার নেতৃত্বে আছে খিলাফত। ছোট দলটির প্রতিষ্ঠানের নাম আহমদীয়া আঞ্জুমানে ইশাআতে ইসলাম, লাহোর; সাধারণভাবে তাঁদের “লাহোরী জামাত” বলা হয়।
বিভাজনের পটভূমি
১৯০৮ সালের ২৬ মে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ইন্তেকাল করেন। পরদিন জামাত সর্বসম্মতভাবে হযরত মৌলভী নূরুদ্দীন (রা.)-কে খলীফা নির্বাচন করে। যাঁরা পরে লাহোরে আলাদা হন, সেই মৌলভী মুহাম্মদ আলী সাহেব ও খাজা কামালুদ্দীন সাহেবও তখন তাঁর হাতে বয়আত করেছিলেন।
কিন্তু শিগগিরই একটি প্রশ্ন উঠল: জামাতের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব কার? খলীফার, নাকি ১৯০৬ সালে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর গঠিত প্রশাসনিক সংস্থা “সদর আঞ্জুমানে আহমদীয়া”-র? একটি পক্ষ বলতে লাগল, প্রতিশ্রুত মসীহের আসল উত্তরাধিকারী আঞ্জুমান, খলীফার কাজ শুধু বয়আত নেওয়া। ১৯০৯ সালের ৩১ জানুয়ারি খলীফাতুল মসীহ আউয়াল (রা.) কাদিয়ানে প্রতিনিধিদের একটি সভা ডেকে বিষয়টির মীমাংসা করেন এবং খিলাফতের কর্তৃত্ব স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। (ট্রুথ অ্যাবাউট দ্য স্প্লিট, পৃষ্ঠা ২২৯–২৪২) তবে মতভেদের বীজ রয়ে গেল।
১৪ মার্চ ১৯১৪
খলীফাতুল মসীহ আউয়াল (রা.)-এর ইন্তেকালের পরদিন কাদিয়ানে সমবেত প্রায় দুই হাজার আহমদী মুসলমান হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.)-কে দ্বিতীয় খলীফা নির্বাচন করেন এবং তাঁর হাতে বয়আত করেন। তারপর প্রথম খলীফার জানাযা পড়া হয়। বয়আত থেকে বিরত ছিলেন অল্প কয়েকজন। (ট্রুথ অ্যাবাউট দ্য স্প্লিট, পৃষ্ঠা ৩৭০–৩৭১)
মৌলভী মুহাম্মদ আলী সাহেব ও খাজা কামালুদ্দীন সাহেবের নেতৃত্বে একটি দল এই নির্বাচন মানেননি। তাঁরা শুধু দ্বিতীয় খলীফাকেই নয়, ব্যক্তি-খিলাফতের ধারণাটিকেই প্রত্যাখ্যান করলেন। মৌলভী মুহাম্মদ আলী সাহেব কাদিয়ান ছেড়ে লাহোরে চলে যান এবং সেখানে নতুন সংগঠন “আহমদীয়া আঞ্জুমানে ইশাআতে ইসলাম”-এর প্রধান হন। (ট্রুথ অ্যাবাউট দ্য স্প্লিট, ভূমিকা)
মতভেদ তিনটি বিষয়ে
১. খিলাফত: আহমদীয়া মুসলিম জামাত বিশ্বাস করে, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) আল-ওসীয়্যত-এ যে “দ্বিতীয় কুদরত”-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা খিলাফতের মাধ্যমে পূর্ণ হয়। সেখানে তিনি লিখেছেন, তাঁর পরে মুমিনদের মতৈক্যে নির্বাচিত ব্যক্তিরা তাঁর নামে বয়আত নেবেন; চল্লিশজন মুমিন একমত হলে সেই ব্যক্তি বয়আত নেওয়ার অধিকারী হবেন। (আল-ওসীয়্যত; The Will, পৃষ্ঠা ৮, পাদটীকা) লাহোরী জামাতের মতে, জামাতের পরিচালনার দায়িত্ব আঞ্জুমানের, ব্যক্তি-খলীফার নয়।
২. প্রতিশ্রুত মসীহের মর্যাদা: আহমদীয়া মুসলিম জামাত বিশ্বাস করে, তিনি মহানবী (সা.)-এর অনুসরণে ও তাঁর অধীনে একজন উম্মতি নবী, যিনি কোনো নতুন শরীয়ত আনেননি। লাহোরী জামাত তাঁকে প্রতিশ্রুত মসীহ, মাহদী ও মুজাদ্দিদ মানে, কিন্তু বলে তাঁর “নবী” শব্দের ব্যবহার রূপক অর্থে, প্রকৃত অর্থে নয়।
৩. যাঁরা তাঁকে মানেননি, তাঁদের অবস্থান: আহমদীয়া মুসলিম জামাত কালেমা-পড়া সবাইকে মুসলিম উম্মাহর অংশ মনে করে, তবে বলে যে আল্লাহর পাঠানো একজনকে অস্বীকার করা ঈমানের দিক থেকে একটি গুরুতর ঘাটতি। লাহোরী জামাত এই অস্বীকারকে ততটা গুরুতর মনে করে না।
লক্ষ করার মতো বিষয়: দুই পক্ষই একই কালেমা পড়ে, একই কুরআন মানে, মহানবী (সা.)-কে খাতামুন নাবিয়্যীন মানে, আর হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী মানে। মতভেদটি তাঁর দাবির সত্যতা নিয়ে নয়, তাঁর পরে নেতৃত্ব ও তাঁর মর্যাদার ব্যাখ্যা নিয়ে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
সত্যিকারের মসীহের জামাত কি ভাগ হতে পারে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, বিভাজনই প্রমাণ করে দাবিটি সত্য নয়। চলুন ইতিহাসের দিকে তাকাই। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পরও কিছু গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল, কেউ কেউ ধর্ম ত্যাগও করেছিল; পরে উম্মতে নানা ফিরকা তৈরি হয়েছে। মূসা (আ.)-এর জীবদ্দশাতেই তাঁর কওম বাছুর পূজায় জড়িয়েছিল। অনুসারীদের মতভেদ কোনো নবীর সত্যতা কমায় না। প্রশ্ন হলো, আল্লাহর সাহায্য কোন পথের সাথে থাকল।
কুরআন খিলাফতের প্রতিশ্রুতির সাথে একটি লক্ষণ জুড়ে দিয়েছে: খলীফাদের মাধ্যমে দীন সুদৃঢ় হবে, আর ভয়ের অবস্থা নিরাপত্তায় বদলে যাবে।
১৯১৪ সালে যখন বিভাজন হলো, অনেকে ধারণা করেছিলেন কাদিয়ানের জামাত টিকবে না, কারণ ইংরেজি-শিক্ষিত নেতাদের অনেকে এবং সদর আঞ্জুমানের বহু প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন অপর পক্ষে। আজ খিলাফতের অধীন আহমদীয়া মুসলিম জামাত দুইশোর বেশি দেশে ছড়িয়ে আছে। পাঠক নিজেই বিচার করুন, ভয়ের অবস্থা কোথায় নিরাপত্তায় বদলেছে।
লাহোরী জামাত কি আহমদীয়া মুসলিম জামাতের চেয়ে মূলধারার মুসলমানদের কাছাকাছি?
নবুওয়তের প্রশ্নে তাঁদের ব্যাখ্যা প্রচলিত মতের কাছাকাছি শোনায়, এটি সত্য। কিন্তু বিরোধী আলেমদের ফতোয়া উভয় দলের বিরুদ্ধেই সমানভাবে গেছে, কারণ উভয়েই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী মানে এবং বিশ্বাস করে ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন। পাকিস্তানের আইনেও দুই দলকে একইভাবে দেখা হয়। তাই আসল প্রশ্নটি সবার জন্য একই থাকে: প্রতিশ্রুত মসীহ কি এসেছেন?
এই মতভেদ নিয়ে আহমদী মুসলমানদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
দুই পক্ষই যুক্তি দিয়ে নিজেদের মত লিখেছে; হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.)-এর আয়নায়ে সাদাকাত (ইংরেজিতে Truth about the Split) এবং মৌলভী মুহাম্মদ আলী সাহেবের The Split বই দুটি পাশাপাশি পড়া যায়। মতভেদ আলোচনা ও দোয়ার বিষয়, শত্রুতার নয়। কুরআনের আহ্বান সবার জন্য: আল্লাহর রজ্জু শক্ত করে ধরো, বিভক্ত হয়ো না। (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৪)
সংক্ষেপে
- ১৯০৮ সালে সবাই, পরে আলাদা হওয়া নেতারাসহ, হযরত মৌলভী নূরুদ্দীন (রা.)-এর হাতে বয়আত করেন; এরপর খলীফা বনাম আঞ্জুমানের কর্তৃত্ব নিয়ে মতভেদ শুরু হয়।
- ১৩ মার্চ ১৯১৪ তাঁর ইন্তেকালের পর পরদিন হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.) খলীফা নির্বাচিত হন; মৌলভী মুহাম্মদ আলী সাহেবের দল তা না মেনে লাহোরে আলাদা সংগঠন গড়েন।
- মূল মতভেদ তিনটি: খিলাফত, প্রতিশ্রুত মসীহের নবুওয়তের ধরন, আর যাঁরা তাঁকে মানেননি তাঁদের অবস্থান।
- দুই দলই একই কালেমা ও কুরআন মানে এবং হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী মানে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Truth about the Split, PDF · alislam.org
- Khilafat-e-Ahmadiyya · alislam.org
- The Will (Al-Wasiyyat), English PDF · alislam.org
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.