উনিশ শতকের শেষভাগে পাঞ্জাবে আর্য সমাজ নামে একটি হিন্দু সংস্কার আন্দোলন খুব সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর সবচেয়ে উগ্র কণ্ঠ ছিলেন পেশোয়ারের পণ্ডিত লেখরাম। ইসলামের বিরুদ্ধে তিনি একের পর এক বই লিখতেন, আর মহানবী (সা.) সম্পর্কে এমন ভাষা ব্যবহার করতেন যা কোনো মুসলমান পড়ে স্থির থাকতে পারেন না।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁকে কাদিয়ানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যাতে তিনি কাছে থেকে ইসলামের সত্যতার নিদর্শন দেখতে পারেন। লেখরাম প্রায় দুই মাস কাদিয়ানে ছিলেনও। কিন্তু বারবার তিনি একটাই দাবি করতেন: আসমানি নিদর্শন দেখান, আমার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করুন।
ভবিষ্যদ্বাণীর আগে একটি সুযোগ
১৮৮৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) একটি ইশতেহারে লিখলেন, তিনি লেখরামের পরিণতি সম্পর্কে কিছু লিখতে চান; কিন্তু কেউ যদি এমন ভবিষ্যদ্বাণীতে কষ্ট পান, তিনি লিখিতভাবে জানালে তা প্রকাশ করা হবে না। লেখরাম একটি পোস্টকার্ডে জবাব দিলেন: ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশ করুন, তবে সময়সীমা বেঁধে দিন।
শুধু তাই নয়, লেখরাম নিজেই পাল্টা ঘোষণা ছাপলেন: তাঁর পরমেশ্বর তাঁকে জানিয়েছেন, মির্যা সাহেব তিন বছরের মধ্যে কলেরায় মারা যাবেন, কারণ তিনি মিথ্যাবাদী। এই কথা লেখরামের নিজের বইয়েই আছে, যা হকীকাতুল ওহী-তে উদ্ধৃত হয়েছে (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ২৯৪-৩০২)।
১৮৯৩ সালের ভবিষ্যদ্বাণী
১৮৯৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, সোমবার, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) একটি ইশতেহার প্রকাশ করলেন, যা পরে আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম গ্রন্থে ছাপা হয় (রূহানী খাযায়েন ৫, পৃ. ৬৪৯-৬৫০)। তাতে লেখরাম সম্পর্কে একটি আরবি ইলহাম ছিল: “ইজলুন জাসাদুন লাহু খুওয়ারুন, লাহু নাসাবুন ওয়া আযাব”, অর্থাৎ সে একটি প্রাণহীন বাছুর, যার থেকে শুধু শব্দ বের হয়; তার জন্য রয়েছে দুঃখ ও শাস্তি।
আর লেখা হলো, আজ থেকে ছয় বছরের মধ্যে, মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে কটূক্তির কারণে এই ব্যক্তির ওপর এমন ঐশী শাস্তি আসবে যা সাধারণ রোগব্যাধির মতো নয়, যাতে আল্লাহর ভয় প্রকাশ পায়। যদি তা না হয়, তবে সবাই জেনে নিক তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে নন, আর তিনি যেকোনো শাস্তি, এমনকি ফাঁসির জন্যও প্রস্তুত।
এরপর আরও বিবরণ এলো। কারামাতুস সাদিকীন (সফর ১৩১১ হিজরী) গ্রন্থে একটি আরবি কবিতায় লেখা হলো: “আমার প্রভু আমাকে সুসংবাদ দিয়ে বললেন: তুমি ঈদের দিনটি চিনবে, আর ঈদ হবে সবচেয়ে কাছে।” আর বরকাতুদ দোয়া বইয়ের প্রচ্ছদের ভেতরে ছাপা হলো ২ এপ্রিল ১৮৯৩-এর একটি কাশফ: এক ভয়ংকর চেহারার, রক্তচক্ষু ব্যক্তি, যাঁকে মানুষ নয় বরং কঠোর ফেরেশতা মনে হচ্ছিল, এসে জিজ্ঞেস করলেন, “লেখরাম কোথায়?”
১৮৯৭ সালের মার্চ, লাহোর
পাঁচ বছর পেরিয়ে গেল। বিরোধীরা ঠাট্টা শুরু করলেন: কোথায় সেই ভবিষ্যদ্বাণী? তারপর এলো ১৮৯৭ সালের ঈদুল ফিতর, শুক্রবার। পরের দিন, শনিবার ৬ মার্চ ১৮৯৭, সন্ধ্যার দিকে লাহোরে নিজের বাড়িতে লেখরামকে ছুরিকাঘাত করা হলো। আঘাতকারী ছিল এমন এক ব্যক্তি, যে কয়েক সপ্তাহ ধরে হিন্দু ধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা নিয়ে তাঁর কাছে আসছিল। আহত লেখরামকে হাসপাতালে নেওয়া হলো, কয়েক ঘণ্টা পর তিনি মারা গেলেন। আঘাতকারী পালিয়ে গেল, আর কখনও ধরা পড়েনি।
ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিটি অংশ মিলিয়ে দেখুন: মেয়াদ ছয় বছর, ঘটনা ঘটল চার বছরের মাথায়। দিনটি ঈদের পরের দিন। মৃত্যু সাধারণ অসুখে নয়, ভয়ংকর এক ঘটনায়। আর আর্য রীতি অনুযায়ী তাঁর দেহ দাহ করে ছাই নদীতে দেওয়া হয়, যা সামেরীর বাছুরের পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
এই ঘটনা যে ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ঘটেছে, তার সাক্ষ্য দিয়েছিলেন মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টানসহ নানা ধর্মের বহু মানুষ। তাঁদের অনেকের নাম-ঠিকানাসহ সাক্ষ্য তিরিয়াকুল কুলূব গ্রন্থে ছাপা হয় (রূহানী খাযায়েন ১৫, পৃ. ১৭২ থেকে)।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
এটা কি ভবিষ্যদ্বাণী পূরণের জন্য সাজানো হত্যা নয়?
সে সময় আর্য পত্রিকাগুলো ঠিক এই অভিযোগই তুলেছিল। ফলে ১৮৯৭ সালের এপ্রিলে পুলিশ কাদিয়ানে এসে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর বাড়ি তল্লাশি করল। পাওয়া গেল লেখরামের নিজের হাতে লেখা চিঠি আর সেই চুক্তিপত্র, যাতে দুই পক্ষ ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য-মিথ্যার মাপকাঠি মেনেছিলেন। ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ মেলেনি (ইস্তিফতা, রূহানী খাযায়েন ১২, পৃ. ১১০)।
তিনি এরপর প্রকাশ্য আহ্বানও জানালেন: যে মনে করে তিনি এই হত্যায় জড়িত, সে তাঁর সামনে শপথ করুক; যদি এক বছরের মধ্যে মানুষের হাত ছাড়া কোনো ঐশী শাস্তি তার ওপর না আসে, তবে তিনি নিজেকে খুনির শাস্তির যোগ্য বলে মেনে নেবেন (সিরাজে মুনীর, রূহানী খাযায়েন ১২, পৃ. ২৯)। আর যুক্তিটিও সহজ: যে নেতা নিজের মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী সত্য করতে শিষ্যকে দিয়ে খুন করায়, তার শিষ্যরা কি তাকে আর আল্লাহর মানুষ বলে মানবে?
“বাছুর” আর “ঈদের দিন” এর অর্থ কী?
ইলহামের শব্দগুলো কুরআনের একটি ঘটনা থেকে নেওয়া। হযরত মূসা (আ.)-এর অনুপস্থিতিতে সামেরী সোনার একটি বাছুর বানিয়েছিল:
আর সেই বাছুরের পরিণতি সম্পর্কে হযরত মূসা (আ.) বললেন:
হকীকাতুল ওহী-তে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, লেখরামকে বাছুরের সাথে তুলনা করা হয়েছিল কারণ তাঁর স্বভাবে এক ধরনের সরলতা ছিল, তিনি যাচাই না করে দুষ্ট লোকদের কথায় প্রভাবিত হতেন। আর ঈদের দিনটি ছিল শুক্রবার, যা নিজেও মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদ; পরের দিন শনিবার ঘটনাটি ঘটে (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ২৯৪-৩০২)।
একজন মানুষের মৃত্যুতে কি আনন্দ করা যায়?
না, আর হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তা করেননি। হকীকাতুল ওহী-তে তিনি লিখেছেন: আল্লাহ জানেন, কারও প্রতি আমার বিদ্বেষ নেই। লেখরামের ক্ষেত্রে আল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়ায় আমি খুশি, কিন্তু অন্যদিকে আমি দুঃখিত যে সে ভরা যৌবনে মারা গেল। সে যদি আমার দিকে ফিরত, আমি তার জন্য দোয়া করতাম, যাতে এই বিপদ টলে যায়। এর জন্য তার মুসলমান হওয়াও জরুরি ছিল না, শুধু গালিগালাজ থেকে মুখ বন্ধ রাখাই যথেষ্ট ছিল। তিনি আরও লিখেছেন, কাদিয়ানের কিছু দুষ্ট লোক তাকে মিথ্যা কথা শুনিয়ে উসকে দিয়েছিল, আর এর জন্য তিনি গভীর আফসোস করেন (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৩০১-৩০২)।
এই নিদর্শনের শিক্ষা তাই কারও মৃত্যুতে উল্লাস নয়। শিক্ষা হলো, ধর্মীয় বিতর্কে নবীদের, বিশেষ করে মহানবী (সা.)-এর সম্মানহানি আল্লাহ পছন্দ করেন না, আর তিনি নিজের নির্বাচিত বান্দার কথা সত্য করে দেখান।
সংক্ষেপে
- ১৮৮৬ সালে লেখরাম নিজেই ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশের অনুমতি দেন ও সময়সীমা চান, আর পাল্টা ঘোষণা দেন যে মির্যা সাহেব তিন বছরে মারা যাবেন।
- ২০ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৩-এর ভবিষ্যদ্বাণী: ছয় বছরের মধ্যে অস্বাভাবিক ঐশী শাস্তি; সঙ্গে “ইজলুন জাসাদুন” ইলহাম (রূহানী খাযায়েন ৫, পৃ. ৬৪৯-৬৫০)।
- কারামাতুস সাদিকীন-এ ঈদের দিনের কাছাকাছি সময়ের কথা বলা হয়; শনিবার ৬ মার্চ ১৮৯৭, ঈদের পরের দিন, লেখরাম লাহোরে নিহত হন।
- পুলিশি তল্লাশিতে ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ মেলেনি; হত্যাকারী কখনও ধরা পড়েনি।
- তিনি নিজেই লিখেছেন, লেখরামের অকালমৃত্যুতে তিনি দুঃখিত; সে গালি বন্ধ করলেই বিপদ টলে যেত।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Death of Lekh Ram – A Sign for the people of India · alislam.org
- A Murder in British Lahore - Closing the Case of Lekh Ram · reviewofreligions.org
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.