পবিত্র কুরআনে ঈসা (আ.) সম্পর্কে একটি ছোট্ট বাক্য আছে: ওয়া মা সালাবুহু। অনেক অনুবাদে এর অর্থ লেখা হয়, “তারা তাঁকে ক্রুশে চড়ায়নি।” আর সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত টানা হয়, ক্রুশের ঘটনাটাই ঘটেনি, অন্য কাউকে ক্রুশে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু একটি শব্দের অর্থ ঠিক না হলে পুরো ছবিটাই বদলে যায়। তাই চলুন, “সালাবা” শব্দটিকে একটু কাছ থেকে দেখি। আরবরা এটি কীভাবে বলত, আর কুরআন নিজে এটি কোথায় কীভাবে ব্যবহার করেছে।
আরবি ভাষায় “সালাবা”
আরবি অভিধানে এই শব্দের মূল অর্থগুলো বেশ চমকপ্রদ। লেইন এবং আকরাবুল মাওয়ারিদ অভিধানের বরাতে বলা হয়েছে:
সালাবাশ শাই’আ মানে কোনো কিছু পুড়িয়ে ফেলা। সালাবাল ইযাম মানে হাড় থেকে মজ্জা বের করে নেওয়া। আর সালাবাল লিস্সা মানে চোরকে একটি সুপরিচিত পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া, অর্থাৎ ক্রুশে ঝুলিয়ে মেরে ফেলা।
তখনকার ক্রুশের শাস্তি কেমন ছিল, সেটাও তফসীরে বলা হয়েছে। মানুষকে ক্রুশ আকৃতির কাঠের সাথে পেরেক দিয়ে আটকে দেওয়া হতো। খাবার নেই, পানি নেই। ব্যথা, ক্ষুধা, ক্লান্তি আর রোদ-ঠান্ডায় ধীরে ধীরে, কখনো কয়েক দিন ধরে, সে মারা যেত।
তাই “সালাবা” শব্দের মধ্যেই মৃত্যুর অর্থটি লুকিয়ে আছে। শুধু ক্রুশে ঝোলানো নয়, ঝুলিয়ে মেরে ফেলা।
কুরআন নিজেই শব্দটি কীভাবে ব্যবহার করেছে
একটি শব্দের অর্থ বোঝার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো দেখা, কুরআন অন্য জায়গায় সেটি কীভাবে ব্যবহার করেছে। প্রথমে দেখুন, ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের শাস্তির বর্ণনা:
এখানে ইউসাল্লাবূ শব্দটি শাস্তি হিসেবে এসেছে, আর অনুবাদে স্পষ্ট লেখা: “ক্রুশবিদ্ধ করিয়া নিহত করা হইবে”।
এবার হযরত ইউসুফ (আ.)-এর কারাগারের সেই ঘটনা। দুই সঙ্গী কয়েদি তাঁকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করেছিল। তিনি বললেন:
পাখিরা যার মাথা থেকে খাবে, সে কি জীবিত মানুষ? স্পষ্টতই এখানে “ক্রুশবিদ্ধ হওয়া” মানে ক্রুশে মৃত্যু। একইভাবে ফেরাউন যখন জাদুকরদের হুমকি দিয়েছিল, “অতঃপর অবশই তোমাদের সকলকে ক্রুশে বিদ্ধ করিব” (সূরা আল-আ’রাফ ৭:১২৫), তখন সে তাদের প্রাণদণ্ডেরই হুমকি দিচ্ছিল।
তাহলে “মা সালাবুহু” মানে কী?
এখন ঈসা (আ.)-এর আয়াতে ফিরে আসি। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা অনুবাদ সেখানে লিখেছে: “না তাহারা তাহাকে ক্রুশে বিদ্ধ করিয়া নিহত করিয়াছিল” (সূরা আন-নিসা ৪:১৫৮)।
এই অর্থে আয়াতটি একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। ঈসা (আ.)-কে ক্রুশে ঝোলানো হয়েছিল, এ কথা কুরআন অস্বীকার করেনি। কুরআন অস্বীকার করেছে, ক্রুশে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তফসীরের ভাষায়: আয়াতটি ঈসা (আ.)-কে ক্রুশে পেরেকবিদ্ধ করার ঘটনা অস্বীকার করে না, বরং ক্রুশে তাঁর মৃত্যুকে অস্বীকার করে।
ইতিহাসের ঘটনাগুলোও এর সাথে মিলে যায়, যা বাইবেলের বরাতে তুলে ধরা হয়েছে:
তিনি ক্রুশে ছিলেন মাত্র ঘণ্টা তিনেক (যোহন ১৯:১৪), যা একজন সুস্থ যুবকের মৃত্যুর জন্য খুবই কম সময়। তাঁর সাথে ঝোলানো দুই অপরাধীর পা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাঁর পা ভাঙা হয়নি। নামানোর পর তাঁর পাঁজরে বর্শা দিয়ে খোঁচা দিলে রক্ত ও পানি বেরিয়ে এসেছিল (যোহন ১৯:৩৪), যা জীবিত থাকার লক্ষণ। আর ঈসা (আ.) নিজেই বলেছিলেন, ইউনুস (আ.) যেমন তিন দিন মাছের পেটে ছিলেন, তিনিও তেমনি মাটির গর্ভে থাকবেন (মথি ১২:৪০)। ইউনুস (আ.) জীবিত অবস্থায় ঢুকেছিলেন, জীবিত অবস্থায় বেরিয়েছিলেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
সূরা আল-আ’রাফে তো আহমদীয়া অনুবাদেও শুধু “ক্রুশে বিদ্ধ করিব” লেখা। তাহলে সালাবা মানে শুধু ঝোলানো নয় কেন?
প্রশ্নটা ন্যায্য। চলুন ফেরাউনের পুরো হুমকিটা পড়ি। সূরা তাহায় একই ঘটনা আরও বিস্তারিত এসেছে:
যার হাত-পা উল্টো দিক থেকে কেটে ফেলা হয়েছে, তাকে খেজুর গাছের কাণ্ডে ঝুলিয়ে দেওয়া। এটা কি শুধু কিছুক্ষণ ঝুলিয়ে রেখে নামিয়ে আনার হুমকি? স্পষ্টতই এ ছিল নির্মম মৃত্যুদণ্ডের হুমকি। অনুবাদে শব্দ যা-ই থাকুক, প্রসঙ্গ বলে দেয় “সালাবা” এখানে প্রাণ নেওয়ার অর্থে এসেছে।
সালাবা মানেই যদি মেরে ফেলা হয়, তাহলে “মা কাতালুহু” (হত্যা করেনি) আলাদা করে বলার দরকার কী ছিল?
এর সুন্দর উত্তর আছে। ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু নিয়ে ইহুদিদের মধ্যে দুই রকম মত ছিল। কেউ বলত, আগে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, তারপর লাশ গাছে ঝোলানো হয়েছে। বাইবেলের প্রেরিত ৫:৩০-এ এই মতের প্রতিধ্বনি আছে: “যাঁকে তোমরা হত্যা করে গাছে ঝুলিয়েছিলে।” আবার কেউ বলত, ক্রুশে ঝুলিয়েই তাঁকে মারা হয়েছে।
কুরআন দুটো দাবিই একসাথে খণ্ডন করেছে। “মা কাতালুহু”: কোনোভাবেই তারা তাঁকে হত্যা করতে পারেনি। “ওয়া মা সালাবুহু”: বিশেষ করে ক্রুশে ঝুলিয়ে মারার পদ্ধতিতেও না। দুটো শব্দ আলাদা আলাদা দুটো দাবির জবাব, পুনরাবৃত্তি নয়।
একটি শব্দের সঠিক অর্থ তাই পুরো ঘটনাকে আলোকিত করে দেয়। ঈসা (আ.) ক্রুশে চড়েছিলেন, কিন্তু ক্রুশে মারা যাননি। আল্লাহ তাঁকে অভিশপ্ত মৃত্যু থেকে রক্ষা করেছিলেন।
সংক্ষেপে
- আরবি অভিধানে “সালাবা” মানে ক্রুশে ঝুলিয়ে মেরে ফেলা, শুধু ঝোলানো নয়।
- কুরআন নিজে সূরা আল-মায়েদা ৫:৩৪ ও সূরা ইউসুফ ১২:৪২-এ শব্দটি মৃত্যুদণ্ডের অর্থে ব্যবহার করেছে।
- তাই “মা সালাবুহু” মানে “তারা তাঁকে ক্রুশে মেরে ফেলতে পারেনি”।
- আয়াতটি ক্রুশে ঝোলানো অস্বীকার করে না, অস্বীকার করে ক্রুশে মৃত্যু।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Holy Quran 4:158 (with commentary) · alislam.org
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.