১৮৯৮ সাল। পাঞ্জাবের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের দপ্তরে একটি লম্বা চিঠি পৌঁছাল কাদিয়ান থেকে। চিঠির লেখক হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)। কেন তাঁকে এই চিঠি লিখতে হলো? কারণ কিছু বিরোধী আলেম তখন সরকারের কাছে একের পর এক অভিযোগ পাঠাচ্ছিলেন: এই লোকটি বিপজ্জনক, সুদানের মাহদীর মতো বিদ্রোহ ঘটাতে পারে।
সেই চিঠিরই একটি বাক্য আজ সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয়, “খুদ-কাশতা পওদা”, অর্থাৎ “নিজের হাতে লাগানো চারাগাছ।” প্রশ্ন হলো, কথাটি কার সম্পর্কে বলা?
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, মির্যা সাহেব নিজেকে ইংরেজ সরকারের লাগানো চারা বলেছেন। অর্থাৎ তাঁর দাবি ইংরেজদের তৈরি। সাথে বলা হয়, তাঁর পরিবার ইংরেজদের কাছ থেকে পেনশন পেত, আর তিনি নিজের বইয়ে বারবার সরকারের প্রশংসা ও আনুগত্যের কথা লিখেছেন।
চিঠিটি কী বলে
চিঠিতে তিনি তাঁর পরিবারের ইতিহাস তুলে ধরেছেন: পিতা মির্যা গোলাম মুর্তজা ও ভাই মির্যা গোলাম কাদিরের অর্ধশতাব্দীর সেবা, যা সরকারি চিঠিপত্রে এবং স্যার লেপেল গ্রিফিনের পাঞ্জাব চিফস বইয়ে লেখা আছে। তারপর তিনি অনুরোধ করেছেন, ধর্মীয় মতভেদ, হিংসা বা ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে যাঁরা এই পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা খবর পাঠাচ্ছেন, কর্তৃপক্ষ যেন যাচাই না করে তা বিশ্বাস না করেন। এই প্রসঙ্গেই তিনি লিখেছেন, এমন একটি পরিবার, যার আনুগত্য প্রমাণিত, যাকে সরকারের বড় কর্মকর্তারা বরাবর শুভাকাঙ্ক্ষী বলে লিখেছেন, এবং যা সরকারের “নিজের হাতে লাগানো চারা”। (তবলীগে রিসালাত, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯–২০)
অর্থাৎ চারাগাছটি হলো একটি পরিবার, যার পুরোনো আনুগত্যের কথা সরকারের নিজের নথিতেই আছে। এটি তাঁর দাবি, তাঁর নবুওয়ত বা তাঁর মিশনের কথা নয়। একই চিঠিতে নিজের দাবির ব্যাপারে তিনি লিখেছেন, তিনি আল্লাহর নির্দেশে, তাঁর ওহী ও ইলহামে সম্মানিত হয়ে প্রতিশ্রুত মসীহ হওয়ার দাবি করছেন।
নিজের মিশন সম্পর্কে তিনি অন্য জায়গায় একেবারে ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করেছেন: “আমি এমন গাছ নই যাকে তারা উপড়ে ফেলতে পারে। তাদের আগের ও পরের, জীবিত ও মৃত সবাই মিলে যদি আমার মৃত্যুর জন্য দোয়া করে, আমার খোদা সেই দোয়াগুলো তাদের দিকেই ফিরিয়ে দেবেন।” (আরবাঈন) এই গাছের মালী আল্লাহ, কোনো সরকার নয়।
পেনশনের প্রশ্ন
এবার পেনশনের কথা। ইতিহাসটি সরকারি বইয়েই আছে। ১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব ইংরেজদের দখলে গেলে এই পরিবারের জায়গির, অর্থাৎ পুরোনো জমিদারি স্বত্ব, বাজেয়াপ্ত করা হয়। তার বদলে গোলাম মুর্তজা ও তাঁর ভাইকে বছরে সাতশ টাকার একটি পেনশন দেওয়া হয়, আর কাদিয়ান ও আশপাশের গ্রামের মালিকানা তাঁদের হাতে থাকে। (লেপেল গ্রিফিন, দ্য পাঞ্জাব চিফস; এ. আর. দর্দ, লাইফ অব আহমদ, পৃষ্ঠা ১৭)
লক্ষ করুন তিনটি বিষয়। এক, পেনশনটি ছিল কেড়ে নেওয়া পারিবারিক সম্পত্তির আংশিক ক্ষতিপূরণ। দুই, এটি দেওয়া হয়েছিল তাঁর পিতা ও চাচাকে, যখন তিনি নিজে প্রায় চৌদ্দ বছরের কিশোর। তিন, এটি তাঁর পিতার জীবনের সাথে বাঁধা ছিল।
১৮৭৬ সালে পিতার মৃত্যুর দিন ইলহামে তিনি জানতে পারেন, সূর্যাস্তের পর পিতা মারা যাবেন। তিনি নিজে লিখেছেন, মুহূর্তের জন্য তাঁর মনে চিন্তা এসেছিল, পেনশন আর সরকারি ভাতার মতো পরিবারের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলো তো পিতার জীবনের সাথে বাঁধা, এখন কী হবে? তখনই দ্বিতীয় ইলহাম হলো: “আলাইসাল্লাহু বিকাফিন আবদাহু”, অর্থাৎ “আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন?” (লাইফ অব আহমদ, পৃষ্ঠা ৬৬) এরপর যা কিছু হয়েছে, আল্লাহর ওপর ভরসায় হয়েছে। প্রতিশ্রুত মসীহ হওয়ার দাবি এসেছে এর তেরো বছরেরও বেশি পরে।
আনুগত্যের শিক্ষা: কেন, আর কতটুকু
তিনি সরকারের প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতার কথা বলেছেন, এটি সত্য। কিন্তু কারণটিও তিনি লিখে গেছেন। শিখ শাসনের সময় পাঞ্জাবের মুসলমানরা জোরে আযান দিতে পারত না, অনেক মসজিদের অবমাননা করা হয়েছিল। (আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, রূহানী খাযায়েন, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০৭; মলফূযাত, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯০–১৯১) ইংরেজ শাসনে প্রত্যেক ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে ইবাদত ও প্রচার করার সুযোগ পেল। তাঁর মূলনীতি ছিল: যে সরকার ধর্মের কারণে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করে না এবং ধর্ম পালনে বাধা দেয় না, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা কুরআনের শিক্ষা নয়। (কিশতিয়ে নূহ, পৃষ্ঠা ৬৮) কুরআনের এই আয়াতটি এখানে প্রাসঙ্গিক:
আর উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা:
মক্কার নির্যাতনের সময় মহানবী (সা.) সাহাবীদের হাবশায় পাঠিয়েছিলেন, কারণ সেখানকার খ্রিস্টান রাজা ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। সেই রাজার প্রশংসা করা যদি দোষের না হয়, তাহলে ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া একটি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতাও দোষের নয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
এত প্রশংসা কি তোষামোদ ছিল না?
তিনি নিজেই এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন: কেউ কেউ বলে, আমি ইংরেজ শাসনে থাকি বলে জিহাদ নিষেধ করি। কিন্তু সরকারকে খুশি করাই যদি উদ্দেশ্য হতো, তাহলে আমি কেন বারবার বলি যে ঈসা ইবনে মরিয়ম ক্রুশ থেকে বেঁচে গিয়ে কাশ্মীরে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনি খোদা নন, খোদার পুত্রও নন? ধর্মপ্রাণ ইংরেজরা কি এতে অসন্তুষ্ট হবে না? (কিশতিয়ে নূহ, পৃষ্ঠা ৬৮)
আর সেই যুগে প্রশংসা শুধু তিনি করেননি। আহলে হাদীস নেতা মৌলভী মুহাম্মদ হোসেন বাটালভী লিখেছেন, যে সরকারের অধীনে মুসলমানরা স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করে, তার বিরুদ্ধে লড়াই করা বা লড়াইয়ে সাহায্য করা জায়েয নয়, আর ভারতের মুসলমানদের জন্য ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হারাম। (ইশাআতুস সুন্নাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, সংখ্যা ১০) নাদওয়াতুল উলামার পত্রিকা লিখেছিল, তাদের প্রতিষ্ঠানের আলেমদের দায়িত্ব দেশে সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রচার করা। (আন-নাদওয়া, ৫ম খণ্ড, জুলাই ১৯০৮) একই কথা অন্যরা বললে আপত্তি নেই, শুধু তিনি বললে আপত্তি, এটি ন্যায়বিচার নয়।
ইংরেজদের এজেন্ট হলে কি তিনি খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে লড়তেন?
ইংরেজ সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম ছিল খ্রিস্টধর্ম, আর তার মিশনারিরা তখন ভারতজুড়ে প্রচার চালাচ্ছিলেন। খ্রিস্টধর্মের ভিত্তি হলো ক্রুশে যিশুর মৃত্যু ও প্রায়শ্চিত্ত। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) সারা জীবন প্রমাণ করেছেন, ঈসা (আ.) ক্রুশে মারা যাননি, তিনি খোদা নন। পাদরি আবদুল্লাহ আথম, হেনরি মার্টিন ক্লার্কসহ বড় বড় মিশনারির সাথে তিনি বিতর্ক করেছেন। ডা. ক্লার্ক তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা-ষড়যন্ত্রের মিথ্যা মামলাও করেছিলেন।
তিনি খ্রিস্টানদের সম্পর্কে লিখেছেন, যিশু ঈমানের যে লক্ষণ বলে গেছেন, তা তাদের মধ্যে নেই; তাই হয় তারা ঈমানহীন, নয়তো যিনি এই লক্ষণ বলেছেন তিনি ভুল। (কারামাতুস সাদেকীন, পৃষ্ঠা ৫৫) এমনকি তিনি রানি ভিক্টোরিয়াকে সরাসরি ইসলামের দাওয়াত দিয়ে লিখেছেন। (তোহফায়ে কায়সারিয়া) যে সাম্রাজ্যের ধর্মের মূল ভিত্তিতে আঘাত করে, তাকে সেই সাম্রাজ্যের লাগানো চারা বলা যুক্তিতে টেকে না।
সরকার কি তাঁকে কোনো সুবিধা দিয়েছিল?
এমন একটি উদাহরণও দেখানো যায় না। তাঁর জীবদ্দশায় কাদিয়ানে রেলস্টেশন, টেলিগ্রাফ বা থানা কিছুই ছিল না। বিরোধীদের উসকানিতে তাঁর জীবন বারবার হুমকিতে পড়েছে, মিথ্যা মামলায় তাঁকে আদালতে দৌড়াতে হয়েছে, কিন্তু সরকার তাঁকে কোনো বিশেষ সুরক্ষা বা অর্থ দেয়নি। পরিবারের যে পেনশন ছিল, তা ১৮৭৬ সালেই পিতার মৃত্যুর সাথে শেষ হয়েছে। “এজেন্ট” বলার জন্য অন্তত একটি পারিশ্রমিকের প্রমাণ লাগে, যা কেউ দেখাতে পারেননি।
সংক্ষেপে
- “নিজের হাতে লাগানো চারা” কথাটি ১৮৯৮ সালের একটি চিঠিতে তাঁর পরিবারের পুরোনো আনুগত্য সম্পর্কে বলা, তাঁর দাবি বা মিশন সম্পর্কে নয়।
- পরিবারের পেনশন ছিল ১৮৪৯ সালে বাজেয়াপ্ত জমিদারির আংশিক ক্ষতিপূরণ, যা তাঁর পিতা ও চাচাকে দেওয়া হয় এবং ১৮৭৬ সালে পিতার মৃত্যুর সাথে শেষ হয়।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া সরকারের প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা কুরআন ও হাদীসের শিক্ষার সাথে মেলে; সেই যুগের অনেক বড় আলেমও একই কথা লিখেছেন।
- যিনি ঈসা (আ.)-এর ক্রুশে মৃত্যু ও খোদায়ীর বিশ্বাস খণ্ডন করেছেন এবং রানিকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, তিনি খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের এজেন্ট হতে পারেন না।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Ahmadiyyat and the British (Truth About Ahmadiyyat) · alislam.org
- Unpacking allegations: Hazrat Mirza Ghulam Ahmad Qadiani and the British Empire · alhakam.org
- Life of Ahmad by A. R. Dard, PDF · alislam.org
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.