একজন ডাক্তার রোগীকে বললেন, “ভাত একদম খাবেন না, এটা আপনার জন্য ক্ষতিকর।” কিছুদিন পর রোগী দেখলেন, তাঁর এক আত্মীয় হাঁড়ি থেকে গতকালের ভাত বেড়ে দিচ্ছেন আর বলছেন, “ডাক্তার তো নতুন রান্না করা ভাত নিষেধ করেছেন, পুরোনো ভাত খেলে সমস্যা নেই!”
আমরা সবাই হাসব। নিষেধ ছিল ভাতের, নতুন-পুরোনোর কোনো কথাই ছিল না। এই ছোট্ট গল্পটি মনে রেখে চলুন একটি বড় প্রশ্নের দিকে যাই।
প্রথম প্রশ্ন: কার বিশ্বাস কে ঠিক করবে?
একজন মানুষের বিশ্বাস কী, তা জানার পথ হলো তার নিজের ঘোষণা শোনা। শত্রু তার উপর কী আরোপ করে, তা দিয়ে নয়। কুরআন এই নীতি শিখিয়েছে:
এখন শুনুন আহমদীয়া মুসলিম জামাতের প্রতিষ্ঠাতা নিজে কী ঘোষণা করেছেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন: আমি আল্লাহর মহিমা ও প্রতাপের কসম খেয়ে বলছি, আমি মু’মিন ও মুসলমান; আমি আল্লাহ, তাঁর কিতাবসমূহ, রসূলগণ, ফিরিশতা ও পরকালে বিশ্বাস করি; আর বিশ্বাস করি যে আমাদের নবী মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) নবীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং রসূলদের মোহর (হামামাতুল বুশরা, পৃষ্ঠা ৬)।
কেউ এই ঘোষণা দেওয়ার পর তাঁকে “খতমে নবুয়্যতের অস্বীকারকারী” বলা, তারপর সেই রায়ের ভিত্তিতে তাঁর উপর জুলুম করা, এটা কি ন্যায়বিচার? বিবেকের কাছে এটি প্রথম প্রশ্ন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: দুটি কথা কি একসঙ্গে সত্য হতে পারে?
প্রচলিত বিশ্বাসে দুটি কথা একসঙ্গে বলা হয়।
এক: মহানবী (সা.)-এর পরে নবুয়্যতের দরজা পুরোপুরি বন্ধ। কোনো নবী আর আসবেন না।
দুই: শেষ যুগে বনী ইসরাঈলের নবী হযরত ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নেমে আসবেন, আর তখনো তিনি নবী থাকবেন।
হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) এই দুই কথা পাশাপাশি রেখে বলেছেন: একদিকে তাঁরা জোর দিয়ে বলেন আর কোনো নবী আসবেন না, অন্যদিকে বিশ্বাস করেন ঈসা (আ.) নবী হিসেবে দ্বিতীয়বার আসবেন। এই দুই কথা মেলে না।
দরজা যদি বন্ধ হয়, তাহলে ঈসা (আ.) কোন পথে আসবেন? আর তিনি যদি আসতে পারেন, তাহলে দরজা পুরোপুরি বন্ধ হলো কীভাবে?
তৃতীয় প্রশ্ন: কে বেশি সম্মান দিচ্ছে?
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, শেষ যুগে উম্মতে মুহাম্মদীর সবচেয়ে বড় সংকটে উদ্ধারকারী হবেন বাইরের, মূসা (আ.)-এর উম্মতের একজন নবী। মহানবী (সা.)-এর চৌদ্দশ বছরের উম্মত থেকে কেউ সেই মর্যাদায় পৌঁছাতে পারবেন না।
আহমদী মুসলমানদের বিশ্বাস বলে, মহানবী (সা.)-এর আধ্যাত্মিক কল্যাণ এত শক্তিশালী যে তাঁর উম্মতের ভেতর থেকেই, তাঁর পূর্ণ আনুগত্যের ফলে, প্রতিশ্রুত মসীহ জন্ম নেবেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ভাষায়, এই উম্মতের প্রয়োজন নেই যে বাইরে থেকে কোনো মসীহ আসবে; মহানবী (সা.)-এর কল্যাণে একজন সাধারণ মানুষও মসীহ হতে পারে (চশমায়ে মসীহী, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ৩৮৯)।
এখন বিবেককে জিজ্ঞেস করুন: কোন বিশ্বাস মহানবী (সা.)-এর মর্যাদাকে বেশি উঁচু করে?
একটি বিষয় এখানে পরিষ্কার থাকা দরকার। এই প্রশ্নগুলো কাউকে ছোট করার জন্য নয়। এগুলো সেই প্রশ্ন, যা একজন সৎ মানুষ নিজেকেই করতে পারেন। আমরা যা বিশ্বাস করি, তা কি আমাদের অন্য বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে? যে আয়াত দিয়ে আমরা অন্যকে বিচার করি, সেই আয়াতের মাপকাঠিতে কি আমাদের নিজেদের বিশ্বাস টেকে? কুরআন বারবার মানুষকে চিন্তা করতে, বিবেক খাটাতে বলেছে। খতমে নবুয়্যতের প্রশ্নেও সেই আহ্বান প্রযোজ্য।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
নিষেধ তো শুধু নতুন নবীর জন্য; পুরোনো নবী আসতে বাধা কোথায়?
এখানেই ভাতের গল্পটি কাজে আসে। আলেমদের কাছে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করুন: সূরা আহযাবের আয়াতে বা “লা নাবিয়্যা বা’দী” হাদীসে কোন শব্দটি বলছে যে নিষেধ শুধু নতুন নবীর জন্য, পুরোনো নবীর জন্য নয়? এমন কোনো শব্দ নেই। হযরত শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.)-এর মাপকাঠি বরং উল্টো কথা বলে: মহানবী (সা.)-এর পরে এমন কোনো নবী হতে পারেন না, যিনি তাঁর মাধ্যম ছাড়া স্বাধীনভাবে কল্যাণ পেয়েছেন (আল-খায়রুল কাসীর, পৃষ্ঠা ৭৮)। পুরোনো নবী ঈসা (আ.) ঠিক এমনই একজন।
ঈসা (আ.) তো এসে নবী হিসেবে নয়, একজন উম্মতী শাসক হিসেবে কাজ করবেন?
মহানবী (সা.) নিজে তাঁকে কী বলেছেন, সেটাই চূড়ান্ত। সহীহ মুসলিমের কিতাবুল ফিতানে হযরত নাওয়াস বিন সামআন (রা.)-এর বর্ণনায় আগমনকারী মসীহকে চারবার “নাবিয়ুল্লাহ”, আল্লাহর নবী, বলা হয়েছে, আর বলা হয়েছে আল্লাহ তাঁর প্রতি ওহী করবেন। সুনান আবু দাউদে (হাদীস ৪৩২৪) মহানবী (সা.) বলেছেন, “আমার ও তাঁর মাঝে কোনো নবী নেই।” যাঁকে মহানবী (সা.) নবী বলেছেন, তাঁর নবুয়্যত কেউ কেড়ে নিতে পারে না।
আহমদী মুসলমানরা কি মুখে এক কথা বলে, ভেতরে আরেক?
কুরআনের নির্দেশ আমরা উপরে দেখেছি: যে সালাম দেয়, তাকে বলো না তুমি মু’মিন নও। কারো হৃদয়ের ভেতর ঢুকে বিচার করার অধিকার আল্লাহ কাউকে দেননি। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বিশ্বাস তাঁদের বইয়ে লেখা, প্রকাশ্যে ছাপা, আলইসলাম ডট অর্গে সবার জন্য খোলা। সেখানে স্পষ্ট লেখা: মহানবী (সা.) খাতামান নাবিয়্যীন, তাঁর পরে কোনো শরীয়তবাহী নবী আসবেন না, আর যিনি আসবেন তিনি তাঁরই উম্মতী। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত সেটা পড়ে দেখা ন্যায়ের দাবি।
আমরা কাউকে জোর করে কিছু মানাতে চাই না। কুরআন নিজেই বলে, ধর্মের ব্যাপারে কোনো বলপ্রয়োগ নেই (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৭)। আমরা শুধু অনুরোধ করি: আহমদী মুসলমানদের বিশ্বাস জানতে তাঁদের নিজেদের লেখা পড়ুন, তারপর নিজের বিবেককে বিচারক বানান।
সংক্ষেপে
- কারো বিশ্বাস জানতে হয় তার নিজের ঘোষণা থেকে; হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কসম খেয়ে মহানবী (সা.)-কে রসূলদের মোহর বলে ঘোষণা করেছেন।
- “নবুয়্যতের দরজা পুরো বন্ধ” আর “ঈসা (আ.) নবী হিসেবে আসবেন”, এই দুই কথা একসঙ্গে টেকে না।
- আয়াত বা হাদীসে “নতুন” আর “পুরোনো” নবীর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।
- উম্মতের ভেতর থেকে মসীহের আগমন মহানবী (সা.)-এর কল্যাণের শক্তিরই প্রমাণ।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Nubuwwat within the Ummah of the Holy Prophet(sa) · alislam.org
- Ahmadis believe in Khatam-e-Nabuwwat · alislam.org
- Advent of a Prophet within the Ummah is Not in Conflict with ‘Khatm-e-Nubuwwat’ · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.