১৮৯১ সাল। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তখন সবেমাত্র মসীহ মওউদ হওয়ার দাবি করেছেন। চারদিকে বিরোধিতার ঝড়, অনেকে প্রকাশ্যে দোয়া করছেন যেন এই মানুষটি শীঘ্রই শেষ হয়ে যান। ঠিক সেই সময় তিনি ইযালায়ে আওহাম গ্রন্থে একটি আরবি ইলহাম ছাপলেন: “সামানীনা হাওলান আও কারীবান মিন যালিকা”, অর্থাৎ “আশি বছর, অথবা এর কাছাকাছি” (রূহানী খাযায়েন ৩, পৃ. ৪৪৩)।
তাঁর মৃত্যু হয় ১৯০৮ সালের ২৬ মে, লাহোরে। প্রশ্ন ওঠে: তখন তাঁর বয়স কত ছিল, আর তা কি ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে মেলে?
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা বলেন, তিনি নিজেই এক জায়গায় লিখেছেন যে তাঁর জন্ম ১৮৩৯ বা ১৮৪০ সালে। তাহলে ১৯০৮ সালে তাঁর বয়স হয় আটষট্টির মতো, আশির ধারেকাছেও নয়। তাই তাঁদের দাবি, বয়সের ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হয়েছে।
ইলহামের শব্দগুলো আসলে কী
প্রথমে দেখা দরকার, ঠিক কী বলা হয়েছিল। ১৮৯১ সালের ইলহামে ছিল “আশি বছর, অথবা এর কাছাকাছি”। পরে আরও পূর্ণরূপে এটি এভাবে এসেছে: “আশি বছর, অথবা এর কাছাকাছি, অথবা এর চেয়ে কয়েক বছর বেশি, আর তুমি দূরবর্তী বংশধর দেখবে” (যমীমা তোহফায়ে গোলড়বিয়া, রূহানী খাযায়েন ১৭, পৃ. ৬৬)।
সবচেয়ে স্পষ্ট শব্দগুলো এসেছে একটি উর্দু ইলহামে, যা হকীকাতুল ওহী গ্রন্থে লেখা আছে: “আল্লাহ তোমার আয়ু দীর্ঘ করবেন। আশি বছর, অথবা এর চেয়ে পাঁচ-চার বছর বেশি, অথবা পাঁচ-চার বছর কম।” (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ১০০)
অর্থাৎ ইলহাম কোনো নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা বলেনি। বলেছে একটি সীমা: আশির কাছাকাছি, চার-পাঁচ বছর কম বা বেশি। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেও বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খণ্ডে পরিষ্কার লিখেছেন: আল্লাহ এমন কোনো ওয়াদা করেননি যে তাঁর বয়স অবশ্যই আশি পার হবে; ইলহামের বাহ্যিক শব্দ বয়সকে চুয়াত্তর থেকে ছিয়াশির মধ্যে নির্ধারণ করে (রূহানী খাযায়েন ২১, পৃ. ২৫৯)।
জন্মসাল কেন নিশ্চিত নয়
এবার আসল প্রশ্ন: তিনি জন্মেছিলেন কবে? উনিশ শতকের পাঞ্জাবের গ্রামে জন্ম নিবন্ধনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আমাদের দাদা-দাদিদের প্রজন্মেও বহু মানুষ নিজের সঠিক জন্মসাল জানতেন না। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-ও জানতেন না, আর তিনি তা লুকাননি। বিভিন্ন সময়ে তিনি আনুমানিক হিসাব দিয়েছেন, আর বারবার বলেছেন যে প্রকৃত বয়স আল্লাহই ভালো জানেন।
তাঁর একটি অনুমান কিতাবুল বারিয়্যা-তে আছে: ১৮৩৯ বা ১৮৪০। কিন্তু ১৯০৩ সালের ২৩ আগস্ট আমেরিকার ডোয়ির বিরুদ্ধে ইংরেজি ইশতেহারে তিনি নিজের বয়স লেখেন “প্রায় সত্তর বছর”, যা হকীকাতুল ওহী-তে উদ্ধৃত আছে। এই হিসাবে জন্ম হয় ১৮৩৩-এর কাছাকাছি। একই মানুষের দুটি অনুমান দুরকম, এটাই প্রমাণ করে যে এগুলো অনুমান ছিল, নিশ্চিত তথ্য নয়।
তাহলে আহমদীয়া মুসলিম জামাত ১৮৩৫ সালের কথা বলে কীসের ভিত্তিতে? কয়েকটি সূত্র মিলিয়ে। তিনি লিখেছেন, তাঁর জন্ম হয়েছিল শুক্রবারে, চান্দ্র মাসের চৌদ্দ তারিখে (তোহফায়ে গোলড়বিয়া, রূহানী খাযায়েন ১৭, পৃ. ২৮১, পাদটীকা), আর হযরত মুফতী মুহাম্মদ সাদেক (রা.)-এর বর্ণনায় (যিকরে হাবীব) মাসটি ছিল ফাল্গুন। আবার তিনি লিখেছেন, ঠিক ১২৯০ হিজরীতে তিনি আল্লাহর সাথে বাক্যালাপের মর্যাদা পান (হকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ২০৮), আর সে সময় তাঁর বয়স ছিল চল্লিশের কাছাকাছি। ১২৯০ থেকে চল্লিশ বাদ দিলে ১২৫০ হিজরী। সেই বছরের ১৪ শাওয়াল ছিল শুক্রবার, ফাল্গুন মাস, ইংরেজি ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৫। তিনটি শর্তই এখানে মেলে।
এই হিসাবে ১৯০৮ সালের ২৬ মে, অর্থাৎ ২৪ রবিউস সানী ১৩২৬ হিজরীতে, তাঁর বয়স ছিল সৌর হিসাবে তিয়াত্তরের বেশি, আর চান্দ্র (হিজরী) হিসাবে সাড়ে পঁচাত্তরের মতো। ইলহামের সীমা ছিল আশি থেকে চার-পাঁচ বছর কম বা বেশি, অর্থাৎ পঁচাত্তর থেকে পঁচাশি। হিজরী হিসাবে বয়স ঠিক এই সীমার মধ্যে পড়ে।
মজার ব্যাপার, তাঁর ঘোর বিরোধী মৌলভী সানাউল্লাহ অমৃতসরীও তাঁর জীবদ্দশায় লিখেছিলেন, মির্যা সাহেব বলেছেন তাঁর মৃত্যু আশির কাছাকাছি বয়সে হবে, আর সম্ভবত তিনি সেই সব ধাপ পার করে ফেলেছেন (আহলে হাদীস, ৩ মে ১৯০৭)। অর্থাৎ সমসাময়িক বিরোধীরাও তাঁকে আশির কাছাকাছি বয়সের মানুষ বলেই দেখতেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
জন্মসালই যদি অনিশ্চিত হয়, তবে এটা আবার কেমন ভবিষ্যদ্বাণী?
এখানে কেউ কেউ বলেন, এমন ঢিলেঢালা সীমা দিয়ে কিছু প্রমাণ হয় না। চলুন কুরআনের একটি বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বাণী দেখি। রোমানরা পারস্যের কাছে হেরে গেছে, মক্কার মুশরিকরা খুশি। তখন আল্লাহ বললেন:
“কয়েক বৎসর”, আরবিতে “বিদ‘উ সিনীন”। নির্দিষ্ট বছর বলা হয়নি, একটি সীমা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর ভবিষ্যদ্বাণীতে এমন সীমা থাকা দোষ নয়, এটি তাঁর রীতি। আর বয়সের ভবিষ্যদ্বাণীর মূল কথাও স্পষ্ট: যে মানুষের মৃত্যুর জন্য চারদিকে দোয়া হচ্ছিল, যাঁকে হত্যার চেষ্টা ও মামলা হয়েছিল, তিনি অসুস্থ শরীর নিয়েও আরও সতেরো বছর বেঁচে রইলেন এবং ভবিষ্যদ্বাণীর সীমার ভেতরেই পৃথিবী ছাড়লেন। কুরআন বলে, মিথ্যা ওহী রচনাকারীকে আল্লাহ এমন অবকাশ দেন না:
তিনি তো নিজেই ১৮৩৯-৪০ লিখেছেন, সেটাই মানা উচিত নয় কি?
একজন মানুষ যখন বিভিন্ন জায়গায় নিজের বয়সের বিভিন্ন অনুমান দেন, তখন তার একটিকে বেছে নিয়ে বাকিগুলো উপেক্ষা করা ন্যায়বিচার নয়। ১৮৩৯-৪০-এর অনুমান মানলে ১৯০৩ সালের “প্রায় সত্তর” কথাটি মেলে না, আর ১২৯০ হিজরীর হিসাবও মেলে না। যেখানে নিশ্চিত তথ্য নেই, সেখানে সব সূত্র মিলিয়ে যে তারিখে সব শর্ত পূর্ণ হয়, সেটিই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত। আর মনে রাখুন, বয়সের ব্যাপারে ইলহাম আল্লাহর কথা; জন্মসাল ছিল মানুষের অনুমান। অনুমানে ভুল হতে পারে, তাতে ইলহাম মিথ্যা হয় না।
সৌর বছর না চান্দ্র বছর, কোনটা ধরা হবে?
মুসলমানরা রোযা, হজ, যাকাত, ইদ্দত সবকিছু চান্দ্র বছরে হিসাব করেন। মহানবী (সা.)-এর বয়সও আমরা হিজরী বছরেই গুনি। লক্ষণীয়, তাঁর বয়স নিয়েও বর্ণনায় ভিন্নতা আছে: সহীহ বুখারীর এক হাদীসে আছে, আল্লাহ তাঁকে ষাট বছরের মাথায় তুলে নেন (হাদীস ৫৯০০), আরেক হাদীসে আছে, তিনি তেষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন (হাদীস ৩৯০২)। পুরোনো যুগে বয়স এভাবে মোটামুটি হিসাবেই বলা হতো। তাই একজন মুসলমান নবীর বয়সের ভবিষ্যদ্বাণী চান্দ্র হিসাবে যাচাই করা স্বাভাবিক, আর সেই হিসাবে বয়সটি ইলহামের সীমার ভেতরেই পড়ে।
সংক্ষেপে
- ইলহাম কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়, একটি সীমা দিয়েছিল: “আশি বছর, অথবা পাঁচ-চার বছর বেশি, অথবা পাঁচ-চার বছর কম” (হকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ১০০)।
- তিনি নিজেই লিখেছেন, আশি পার হওয়ার কোনো ওয়াদা নেই; শব্দগুলো চুয়াত্তর থেকে ছিয়াশির মধ্যে বয়স নির্ধারণ করে (রূহানী খাযায়েন ২১, পৃ. ২৫৯)।
- তাঁর জন্মসাল নথিভুক্ত ছিল না; তিনি বিভিন্ন অনুমান দিয়েছেন, আর সব সূত্র মিলিয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৫ (১৪ শাওয়াল ১২৫০ হিজরী) পাওয়া যায়।
- এই হিসাবে মৃত্যুর সময় তাঁর হিজরী বয়স সাড়ে পঁচাত্তরের মতো, যা ইলহামের সীমার ভেতরে।
- কুরআনের “কয়েক বৎসরের মধ্যে” ভবিষ্যদ্বাণীর মতো, এখানেও আল্লাহ একটি সীমা দিয়েছেন, আর তা পূর্ণ হয়েছে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.