একটি বাজারে দুজন দোকানদার একই জিনিসের দুই রকম দাম বলছেন, আর দুজনেই দাবি করছেন তাঁর কথাই সরকারি দর। ক্রেতা কী করবেন? তিনি সরকারি তালিকাটি খুলে দেখবেন। তালিকার সঙ্গে যার কথা মেলে, সেটাই সঠিক।
হাদীসের জগতেও এমন অবস্থা তৈরি হয়েছিল। একই বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বর্ণনা, আর প্রতিটি দল নিজের পছন্দের বর্ণনা ধরে অন্যদের ভুল বলছে। এই অবস্থায় মহানবী (সা.) এমন একজনের আগমনের সংবাদ দিয়েছিলেন, যিনি মীমাংসা করবেন।
“হাকাম” মানে মীমাংসাকারী বিচারক, আর “আদল” মানে ন্যায়পরায়ণ। বিচারকের কাজই হলো দুই পক্ষের দাবি শুনে কোনটি সঠিক তা জানিয়ে দেওয়া।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, তাঁরা সমর্থনের জন্য সেই হাদীসগুলো উল্লেখ করেন যা কুরআনের অনুকূল এবং তাঁর ওহীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, আর অন্য হাদীসগুলোকে ফেলে দেওয়া জিনিসের মতো ছুড়ে ফেলেন। আপত্তিকারীরা রূহানী খাযায়েন ১৯তম খণ্ডের ১৪০ পৃষ্ঠার বরাত দেন এবং বলেন, এতে হাদীসের অবমাননা হয়েছে।
বাক্যটির ভাষা কঠোর, এটা ঠিক। কিন্তু কোন হাদীস “ফেলে দেওয়া” হচ্ছে? সব হাদীস, নাকি যেগুলো কুরআনের সঙ্গে মেলে না? উত্তর বাক্যের ভেতরেই আছে: যে হাদীস কুরআনের অনুকূল, তা গ্রহণ করা হচ্ছে। এবার দেখি তিনি এই নীতি অন্যত্র কীভাবে বুঝিয়েছেন।
“কিশতিয়ে নূহ”-এ হাদীসের নীতি
“কিশতিয়ে নূহ” (নূহের নৌকা) পুস্তকে তিনি তাঁর জামাতকে লিখেছেন:
“আমি শুনেছি, তোমাদের কেউ কেউ হাদীস পুরোপুরি অস্বীকার করে। যারা এমন মত রাখে, তারা মারাত্মক ভুলে আছে। আমি কখনো এমন শিক্ষা দিইনি।”
এরপর তিনি পথনির্দেশের তিনটি উৎস বলেছেন: প্রথম কুরআন, দ্বিতীয় সুন্নাহ, অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর আমলের মাধ্যমে দেখানো পথ, আর তৃতীয় হাদীস। তারপর লিখেছেন:
“হাদীসকে সম্মান করো এবং তা থেকে উপকার নাও, কারণ তা মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। কুরআন ও সুন্নাহ যতক্ষণ না প্রত্যাখ্যান করে, ততক্ষণ হাদীস প্রত্যাখ্যান কোরো না… কিন্তু কোনো হাদীস যদি কুরআনের বর্ণনার স্পষ্ট বিরোধী হয়, তাহলে চিন্তা করো যেন সামঞ্জস্য করা যায়; হয়তো অমিলটি তোমাদের বোঝারই ভুল। তবু যদি বিরোধ দূর না হয়, তাহলে সেই হাদীস বর্জন করো, কারণ তা রসূল (সা.)-এর কথা হতে পারে না। অন্যদিকে কোনো হাদীস দুর্বল হলেও যদি কুরআনের অনুকূল হয়, তাহলে তা গ্রহণ করো, কারণ কুরআন তাকে সত্যায়ন করছে।” (কিশতিয়ে নূহ, রূহানী খাযায়েন ১৯তম খণ্ড)
এই অনুচ্ছেদেই তিনি বলেছেন, হাদীস কুরআন ও সুন্নাহর সেবক, আর কুরআনের বিচারক কুরআন নিজেই।
এবার আপত্তির বাক্যটি আবার পড়ুন। “ফেলে দেওয়া” হচ্ছে কেবল সেই বর্ণনা যা চেষ্টার পরও কুরআনের সঙ্গে মেলানো যায় না, আর যা তাঁর মতে রসূল (সা.)-এর কথাই নয়। যে কথা রসূল (সা.)-এর নয়, অথচ তাঁর নামে চালানো হয়েছে, তাকে দূরে ছুড়ে ফেলা হাদীসের অবমাননা নয়, বরং হাদীসের পবিত্রতা রক্ষা।
কুরআনও আল্লাহর আয়াতকে সর্বোচ্চ “হাদীস”, অর্থাৎ কথা, বলে ঘোষণা করেছে:
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“নিজের ওহীকে হাদীস যাচাইয়ের মানদণ্ড বানানো কি বাড়াবাড়ি নয়?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, কুরআন পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু “আমার ওহীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়” কথাটি আপত্তিকর। চলুন দেখি। মহানবী (সা.) যাঁকে “হাকাম” বা বিচারক বলেছেন, তাঁর রায় না মানলে তিনি বিচারক থাকেন কীভাবে? হযরত মসীহ মওউদ (আ.) বলেছেন: “যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে হাকাম ও আদল হয়ে এসেছেন, তিনি কুরআনের যে অর্থ বোঝেন, সেটিই প্রকৃত অর্থ হবে। তেমনি তিনি যে হাদীসকে সহীহ বলবেন, সেটিই সহীহ হাদীস।” (মলফূযাত, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৪০-১৪১; জুমুআর খুতবা, ২৮ আগস্ট ২০২০)
আল্লাহর পাঠানো বিচারকের ওহী কুরআনের বিরোধী হতে পারে না, কারণ দুটোর উৎস একই আল্লাহ। আর “কিশতিয়ে নূহ”-এ তিনি এ-ও লিখেছেন, কোনো ভবিষ্যদ্বাণীমূলক হাদীসকে মুহাদ্দিসরা দুর্বল বললেও যদি তার ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়, তাহলে তা সত্য বলে মানতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর কাজ নিজেই হাদীসের সত্যতা যাচাই করে দেয়।
“আলেমরা তো শত শত বছর ধরে সনদ দেখে হাদীস যাচাই করেছেন; সেটি কি যথেষ্ট নয়?”
সনদ-যাচাইয়ের মহান কাজকে আহমদীয়া মুসলিম জামাত সম্মান করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সনদ দেখেও আলেমরা একমত হননি। নামাযে রুকুর আগে-পরে হাত তোলা (রাফউল ইয়াদাইন) নিয়ে হাদীস থাকা সত্ত্বেও হানাফী আলেমরা এক রকম আমল করেন, আহলে হাদীসরা আরেক রকম। প্রত্যেক মাযহাবই কিছু বর্ণনা গ্রহণ করে, কিছু ছেড়ে দেয়। আলেমদের যদি এই অধিকার থাকে, তাহলে আল্লাহর পাঠানো হাকামের তা থাকবে না কেন?
“তাহলে কি আহমদী মুসলমানরা হাদীস কম মানেন?”
বরং উল্টো। “কিশতিয়ে নূহ”-এর নির্দেশ হলো, হাদীস এত যত্নে অনুসরণ করো যেন তোমাদের প্রতিটি কাজ ও বিরতির পেছনে হাদীসের সমর্থন থাকে। আহমদী মুসলমানরা নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ সবকিছুতে সুন্নাহ ও হাদীস অনুসরণ করেন। পার্থক্য শুধু একটি: কোনো বর্ণনা যদি কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে কুরআনই অগ্রাধিকার পায়। এই নীতি কোনো মুসলমানের কাছেই অপরিচিত হওয়ার কথা নয়।
সিদ্ধান্ত: বাক্যটির ভাষা জোরালো, কিন্তু লক্ষ্য হাদীস নয়, বরং রসূল (সা.)-এর নামে চলে আসা সেই বর্ণনা যা কুরআনের বিরোধী। মহানবী (সা.)-এর সম্মান রক্ষাই এর উদ্দেশ্য।
সংক্ষেপে
- মহানবী (সা.) প্রতিশ্রুত মসীহকে “হাকাম” ও “আদল”, অর্থাৎ ন্যায়পরায়ণ বিচারক বলেছেন (সহীহ বুখারী ৩৪৪৮)।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, হাদীস পুরোপুরি অস্বীকারকারীরা মারাত্মক ভুলে আছে; হাদীসকে সম্মান করো।
- শুধু যে বর্ণনা চেষ্টার পরও কুরআনের সঙ্গে মেলে না, তা বর্জনীয়, কারণ তা রসূল (সা.)-এর কথা হতে পারে না।
- আলেমরাও হাদীস গ্রহণ-বর্জন করেন; আল্লাহর পাঠানো বিচারকের এই অধিকার আরও বেশি।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Noah's Ark: Our Teaching (Hadith) · alislam.org
- The Promised Messiah and Mahdi: Hakam and Adl, Friday Sermon 28 August 2020 · alislam.org
- Noah's Ark: Our Teaching · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.