জেরুজালেমের অলিগলিতে তখন একটাই আলোচনা। ইহুদি নেতারা বুক ফুলিয়ে বলছে, “আমরা মসীহকে শেষ করে দিয়েছি।” তাদের কাছে এটা শুধু একজন মানুষকে মেরে ফেলার খবর ছিল না। এটা ছিল একটি “প্রমাণ”।
কারণ তাওরাতে লেখা আছে, যাকে গাছে ঝোলানো হয়, সে আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত (দ্বিতীয় বিবরণ ২১:২৩)। তাই ক্রুশে মৃত্যু মানে, তাদের দৃষ্টিতে, তিনি সত্য নবী নন, আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত।
পবিত্র কুরআন এই দাবির জবাব দিয়েছে দুই ধাপে। প্রথম ধাপে বলেছে, তারা তাঁকে হত্যা করতে পারেনি, ক্রুশে মারতেও পারেনি (সূরা আন-নিসা ৪:১৫৮)। তারপর এসেছে দ্বিতীয় ধাপ:
অভিযোগ ছিল অভিশাপের, জবাব এল সম্মানের
যেকোনো জবাব বুঝতে হলে আগে প্রশ্নটা বুঝতে হয়। ইহুদিরা কি দাবি করছিল যে ঈসা (আ.)-এর দেহ আকাশে যায়নি? না। এমন কোনো দাবি তাদের ছিল না। তাদের দাবি ছিল, ক্রুশে মরে তিনি অভিশপ্ত হয়েছেন, আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরে গেছেন।
তাহলে এর সঠিক জবাব কী হবে? অভিশাপের উল্টো হলো আল্লাহর নৈকট্য ও সম্মান। কুরআন ঠিক সেটাই বলেছে: “বরং আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উন্নীত করেছেন।” অর্থাৎ তিনি অভিশপ্ত নন, আল্লাহর কাছে সম্মানিত।
alislam.org-এর কুরআন অ্যাপে এই আয়াতের ব্যাখ্যামূলক টীকায় ঠিক এই কথাটি বলা হয়েছে: “বাল” (বরং) শব্দটি ইহুদিদের অভিশপ্ত মৃত্যুর দাবির বিপরীতে এসেছে, আর অভিশাপের বিপরীত হলো আল্লাহর নৈকট্য। দাবি এক বিষয়ে, আর জবাব সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে, এমনটা কুরআনের মতো প্রজ্ঞাময় কিতাবে হতে পারে না।
আরেকটি বিষয় লক্ষ করুন। আয়াতে “আকাশ” শব্দটিই নেই। আছে “তাঁর দিকে”, অর্থাৎ আল্লাহর দিকে। আর আল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ নন। alislam.org-এর তফসীর তাই বলে, আল্লাহর দিকে উন্নীত করা মানে আধ্যাত্মিক উন্নতি, কারণ আল্লাহর জন্য কোনো নির্দিষ্ট আবাস নির্ধারণ করা যায় না।
একটি প্রতিশ্রুতি, তারপর তার পূর্ণতা
এই আয়াতকে একা পড়লে চলবে না। এর আগে, সূরা আলে ইমরানে, আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন:
প্রতিশ্রুতির ক্রম দেখুন: প্রথমে মৃত্যু, তারপর আল্লাহর দিকে উন্নীত করা, তারপর শত্রুদের অপবাদ থেকে পবিত্র করা। সূরা আন-নিসার আয়াতটি এই প্রতিশ্রুতিরই পূর্ণতার ঘোষণা: “আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উন্নীত করেছেন।”
আল-আজহারের প্রধান শায়খ মাহমুদ শালতূত তাঁর বিখ্যাত ফতোয়ায় ঠিক এভাবেই দুটি আয়াতকে মিলিয়ে পড়েছেন, যা alislam.org-এ প্রকাশিত। তাঁর মতে, প্রথম আয়াতে প্রতিশ্রুতি, দ্বিতীয় আয়াতে তার বাস্তবায়ন। আর যেহেতু “রাফা” শব্দটি এসেছে মৃত্যুর পরে, এর অর্থ মর্যাদার উন্নতি, দেহকে আকাশে তোলা নয়।
আয়াতের শেষ অংশটিও অর্থবহ: “আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।” শত্রুরা সবাই মিলে যা চেয়েছিল, আল্লাহ তাঁর পরাক্রমে তা ব্যর্থ করেছেন। আর তাঁর প্রজ্ঞায়, নিজের নিয়মের ভেতরে থেকেই, তাঁর নবীকে রক্ষা করেছেন।
মহানবী (সা.)-এর জন্যও একই কথা
শিয়া মুসলমানদের সুপরিচিত তফসীর “তফসীরে সাফী”-তে মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের কথা লেখা হয়েছে এই ভাষায়: “যখন আল্লাহ তাঁর নবীকে ডাকলেন এবং তাঁকে নিজের দিকে উন্নীত করলেন (রাফাআহু ইলাইহি)।” alislam.org-এর প্রবন্ধে এই উদ্ধৃতিটি সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৫-এর তফসীরের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুবহু একই শব্দ। মহানবী (সা.)-এর বেলায় এর অর্থ কেউ সশরীরে আকাশে যাওয়া বোঝেননি, কারণ তিনি মদিনায় সমাহিত। তাহলে একই শব্দ ঈসা (আ.)-এর বেলায় এসে হঠাৎ দেহসহ আকাশে ওঠা হয়ে যাবে কেন?
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“বাল” (বরং) শব্দ তো আগের কথার বিপরীত বোঝায়। হত্যার বিপরীত কি জীবিত তুলে নেওয়া নয়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, “তারা হত্যা করেনি, বরং আল্লাহ তুলে নিয়েছেন”, তাই তুলে নেওয়াটা হত্যার ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটেছে। চলুন দেখি। “বাল” শব্দ আগের দাবিকে খণ্ডন করে, কিন্তু এর পরের ঘটনাটি সঙ্গে সঙ্গে ঘটতে হবে, এমন কোনো শর্ত নেই। এখানে খণ্ডন করা হচ্ছে অভিশপ্ত মৃত্যুর দাবি। তার বিপরীত হলো সম্মানজনক পরিণতি: তিনি অভিশপ্ত হননি, বরং আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বাভাবিক মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে উন্নীত হয়েছেন। শায়খ শালতূতের ফতোয়াও এই কথাই বলে।
রাফা যদি শুধু মর্যাদাই হয়, সব নবীরই তো মর্যাদা আছে। ঈসা (আ.)-এর জন্য আলাদা করে বলার দরকার কী?
প্রশ্নটির উত্তর লুকিয়ে আছে প্রেক্ষাপটে। অন্য কোনো নবী সম্পর্কে তাঁর জাতি এভাবে দাবি করেনি যে তিনি ক্রুশে মরে অভিশপ্ত হয়েছেন। ঈসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে ঠিক এই অপবাদটি ছিল, আর আজও ইহুদিরা সেই বিশ্বাসেই তাঁকে অস্বীকার করে। তাই আল্লাহ তাঁর জন্য বিশেষভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, “অস্বীকারকারীদের (দোষারোপ) হইতে তোমাকে পবিত্র করিব”। একটি নির্দিষ্ট অপবাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ঘোষণা দরকার ছিল।
আল্লাহ যদি আকাশে না-ই তুলে থাকেন, তাহলে বহু মানুষ এমন বিশ্বাস করল কেন?
alislam.org-এর কুরআন অ্যাপে এই আয়াতের টীকায় এই প্রশ্নের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে: আকাশে তুলে নেওয়ার এই দাবির পক্ষে কুরআনের কোনো শব্দ বা মহানবী (সা.)-এর কোনো বাণী পেশ করা হয় না। অর্থাৎ বিশ্বাসটি পরবর্তী যুগের ব্যাখ্যা থেকে ছড়িয়েছে, ওহী থেকে নয়। আর কোনো ধারণা যত মানুষই মানুক, কুরআনের স্পষ্ট শব্দের ওপর তা প্রাধান্য পেতে পারে না।
সংক্ষেপে
- ইহুদিদের দাবি ছিল, ক্রুশে মরে ঈসা (আ.) অভিশপ্ত হয়েছেন; দেহ আকাশে যাওয়া বা না যাওয়া নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিল না।
- অভিশাপের বিপরীত হলো আল্লাহর নৈকট্য; তাই “আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উন্নীত করেছেন” মানে সম্মান ও মর্যাদা।
- আয়াতে “আকাশ” শব্দ নেই; আছে “আল্লাহর দিকে”, আর আল্লাহ কোনো স্থানে সীমাবদ্ধ নন।
- সূরা আলে ইমরান ৩:৫৬-এর প্রতিশ্রুতিতে আগে মৃত্যু, পরে উন্নীত করা; সূরা আন-নিসা ৪:১৫৯ তারই পূর্ণতা।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Holy Quran 4:159 (with commentary) · alislam.org
- The ‘Ascension’ of Jesus · alislam.org
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.