মক্কার কাফেরদের সবচেয়ে বড় অবিশ্বাস ছিল একটি বিষয়ে: মৃত্যুর পর আবার জীবিত হওয়া। “হাড়গোড় পচে মাটি হয়ে যাওয়ার পর আবার জীবন?” এই ছিল তাদের ঠাট্টা।
এই প্রেক্ষাপটে সূরা আয-যুখরুফে একটি আয়াত এসেছে, যা নিয়ে আজ অনেক আলোচনা হয়:
অনেকে বলেন, এখানে “সে” মানে ঈসা (আ.), আর “নিদর্শন” মানে কিয়ামতের আগে তাঁর আকাশ থেকে ফিরে আসা। তাই তিনি এখনো জীবিত। চলুন আয়াতটিকে ধীরে ধীরে খুলে দেখি।
প্রথম কথা: আয়াতে ঈসা (আ.)-এর নাম নেই
আয়াতের শুরু ওয়া ইন্নাহু, “এবং নিশ্চয় সে বা এটি”। এখানে শুধু একটি সর্বনাম আছে, কোনো নাম নেই। আর তফসীরকারকরা এই সর্বনামের অর্থ নিয়ে একমত নন।
alislam.org-এর প্রবন্ধে তফসীরে বাগাভী (মাআলিমুত তানযীল) থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে: হযরত হাসান (রহ.) এবং একদল তফসীরকারক বলেছেন, “এটি” মানে কুরআন। কুরআন কিয়ামতের নিদর্শন, কারণ এটি কিয়ামতের অবস্থা আর ঘটনাবলির খবর দেয়। একই তফসীরে “আমার অনুসরণ কর” কথাটিকে মহানবী (সা.)-এর দিকে নির্দেশ করা হয়েছে।
অর্থাৎ ঈসা (আ.)-এর ফিরে আসার অর্থটি বহু ব্যাখ্যার মাত্র একটি, তাও এমন একটি, যা প্রসঙ্গের সাথে মেলে না। কেন মেলে না, দেখুন।
দ্বিতীয় কথা: “সন্দেহ করো না” এখনই বলা হচ্ছে
আয়াতটি বলছে, “সুতরাং উহার সম্বন্ধে তোমরা সন্দেহ করিও না।” এই কথা বলা হচ্ছে মহানবী (সা.)-এর যুগের অবিশ্বাসীদের, সেই সময়েই।
এবার ভাবুন। যদি নিদর্শনটি হয় দুই হাজার বছর পরের কোনো ঘটনা, যা এখনো ঘটেইনি, তাহলে মক্কার কাফেরদের কীভাবে বলা যায়, “এই নিদর্শন দেখেও কেন সন্দেহ করছ?” তারা তো সহজেই বলতে পারত, “হে আমাদের প্রভু, নিদর্শন তো এখনো আসেইনি!”
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, মসীহ মওউদ (আ.) ঠিক এই যুক্তিটিই তুলে ধরেছেন তাঁর “ইযালায়ে আওহাম” গ্রন্থে (রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২১-৩২২)। তাঁর কথার সারমর্ম হলো: যে প্রমাণ এখনো প্রকাশই পায়নি, তার ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। এমন অর্থ কুরআনের প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষার সাথে মেলে না। তিনি বলেছেন, প্রকৃত অর্থ হলো, কুরআনই মৃতদের জীবিত হওয়ার নিদর্শন, কারণ এর মাধ্যমে মৃত হৃদয় নতুন জীবন পায়।
কুরআন নিজেও এই উপমা ব্যবহার করে। আল্লাহ বলেন, তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, “যেন আমরা উহার দ্বারা মৃত ভূমিকে সঞ্জীবিত করি” (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৫০)। আরেক জায়গায়: “এবং আমরা উহা দ্বারা মৃত ভূমিকে জীবিত করি। অনুরূপভাবেই পুনরুত্থান হইবে” (সূরা কাফ ৫০:১২)। মরুভূমির মতো মৃত আরব জাতি কুরআনের বৃষ্টিতে জেগে উঠছিল। কাফেররা নিজের চোখে তা দেখছিল। এটাই ছিল তাদের সামনে উপস্থিত নিদর্শন।
তৃতীয় কথা: “সা’আত” শব্দের বিস্তৃত অর্থ
আয়াতের আস-সা’আহ শব্দটি লক্ষ করুন। আহমদীয়া বাংলা অনুবাদ এর অর্থ করেছে “নির্ধারিত সময়”। শব্দটি কিয়ামত বোঝাতে পারে, আবার কোনো জাতির জীবনে আসা বড় পরিবর্তনের সময়ও বোঝায়।
কুরআনে আছে: “নির্দিষ্ট মুহূর্ত নিকটবর্তী হইল এবং চন্দ্র বিদীর্ণ হইল” (সূরা আল-কামার ৫৪:২)। আর মহানবী (সা.) বলেছেন: “আমি প্রেরিত হয়েছি, আর সেই ‘সা’আত’ এই দুই আঙুলের মতো” (সহীহ বুখারী, কিতাবুর রিকাক, হাদীস ৬৫০৪)। মহানবী (সা.)-এর আগমনের সাথেই পৃথিবীতে এক বিশাল পরিবর্তন শুরু হয়েছিল।
এই আলোয় alislam.org-এর বিস্তারিত তফসীর আয়াতটির আরেকটি অর্থ দিয়েছে। যদি “সে” বলতে ঈসা (আ.)-কেই ধরা হয়, তাহলে তিনি ছিলেন মূসা (আ.)-এর শরীয়তের যুগ শেষ হওয়ার নিদর্শন। তিনি ছিলেন বনী ইসরাঈলের শেষ নবী। তাঁর পর নবুওয়াত চলে গেছে আরেক জাতির কাছে। ঈসা (আ.) নিজেই তাঁর জাতিকে বলেছিলেন: আল্লাহর রাজ্য তোমাদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হবে এবং এমন এক জাতিকে দেওয়া হবে যারা তার ফল দেবে (মথি ২১:৪৩)। এই অর্থে ঈসা (আ.) তাঁর নিজের জীবদ্দশাতেই একটি “নিদর্শন” ছিলেন, ভবিষ্যতে ফিরে এসে নয়। alislam.org-এর কুরআন অ্যাপে আয়াতটির ইংরেজি অনুবাদও তাই অতীতকালে: “he was a sign of the Hour”।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
কিছু তফসীরে তো সাহাবীদের সূত্রে বলা হয়েছে, এর অর্থ কিয়ামতের আগে ঈসা (আ.)-এর আগমন?
হ্যাঁ, কিছু তফসীরকারক এমন অর্থ করেছেন। মসীহ মওউদ (আ.) নিজেও তা স্বীকার করে বলেছেন, অনেকে এই অর্থ করেছেন, কিন্তু আয়াতের শব্দ ও প্রসঙ্গ তা সমর্থন করে না। আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে আয়াতটি শেষ যুগে মসীহের আগমনের কথা বলছে, তবুও প্রশ্ন থাকে: কে আসবেন? ঠিক চার আয়াত আগে কুরআন বলেছে, মরিয়মের পুত্রের উল্লেখ করা হয় “দৃষ্টান্ত স্বরূপ” (সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৫৮)। alislam.org-এর কুরআন অ্যাপের টীকাতেও এখানে “সা’আত” বলতে শেষ যুগে মসীহের আগমন এবং তার সাথে আসা আধ্যাত্মিক বিপ্লবের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শেষ যুগে আসবেন ঈসা (আ.)-এর দৃষ্টান্ত, তাঁর গুণে গুণান্বিত একজন। আকাশ থেকে নেমে আসা দুই হাজার বছর আগের সেই মানুষটি নন, যাঁর মৃত্যুর কথা কুরআন স্পষ্ট বলেছে।
“আমার অনুসরণ কর” কথাটি তো ঈসা (আ.)-এর মুখের কথা হতে পারে?
আয়াতটি এসেছে মহানবী (সা.)-এর ওপর নাযিল হওয়া কুরআনে, মক্কার মানুষদের উদ্দেশে। তফসীরে বাগাভীতেও “আমার অনুসরণ কর” কথাটিকে মহানবী (সা.)-এর দিকে নির্দেশ করা হয়েছে, যা alislam.org-এর প্রবন্ধে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ বার্তাটি হলো: কুরআনের এই জীবন্ত নিদর্শন দেখেও সন্দেহ করো না, মহানবী (সা.)-কে অনুসরণ কর, এটাই সরল পথ। এখানে ভবিষ্যতে কারো আকাশ থেকে নামার অপেক্ষার কোনো কথা নেই।
সংক্ষেপে
- আয়াতে ঈসা (আ.)-এর নাম নেই; হযরত হাসান (রহ.) ও অন্যদের মতে “সে” মানে কুরআন।
- “সন্দেহ করো না” বলা হয়েছে তখনকার মানুষকে; তাই নিদর্শনটি তখনই উপস্থিত ছিল, দুই হাজার বছর পরের ঘটনা নয়।
- ঈসা (আ.)-কে ধরলেও তিনি ছিলেন বনী ইসরাঈলের নবুওয়াতের যুগ শেষ হওয়ার নিদর্শন।
- শেষ যুগে যিনি আসবেন, তিনি মরিয়মপুত্রের “দৃষ্টান্ত”; আয়াতটি ঈসা (আ.)-এর আকাশে জীবিত থাকার প্রমাণ দেয় না।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.