তিনি কেন লিখলেন, আল্লাহ তাঁর নাম “মরিয়ম” রেখেছেন?

একজন পুরুষ নিজেকে মরিয়ম বলছেন, শুনে অনেকে অবাক হন। কিন্তু কুরআন নিজেই মুমিনদের জন্য মরিয়মকে উপমা বানিয়েছে। সেই উপমার ভেতরে লুকানো আছে একটি ভবিষ্যদ্বাণী।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

১৮৮০-এর দশকের শুরু। কাদিয়ানে বসে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখছেন তাঁর বিখ্যাত বই বারাহীনে আহমদীয়া। বইয়ের পাতায় পাতায় তিনি লিখে রাখছেন আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া ইলহামগুলো।

কিছু ইলহাম ছিল বেশ অদ্ভুত। একটিতে তাঁকে ডাকা হলো, “হে মরিয়ম!” তখন তিনি নিজেও এর গভীর অর্থ বোঝেননি। প্রায় বিশ বছর পর তিনি লিখলেন, সেই ইলহামগুলোর মধ্যে কী রহস্য লুকানো ছিল।

আপত্তিটি কী?

বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেকে মরিয়ম দাবি করেছেন। একজন পুরুষ কীভাবে নিজেকে একজন নারীর নামে ডাকতে পারেন? আবার তিনি লিখেছেন, তাঁর ভেতরে ঈসার রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়েছে, আর রূপকভাবে তিনি “গর্ভবতী” হয়েছেন। এসব কথা শুনে অনেকে হাসেন, অনেকে বিভ্রান্ত হন।

কথাগুলো তিনি নিজেই লিখেছেন, তাঁর কিশতিয়ে নূহ (নূহের তরী) গ্রন্থে। (রূহানী খাযায়েন, ১৯শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮–৫০) তাই প্রশ্ন এটা নয় যে তিনি লিখেছেন কি না। প্রশ্ন হলো, কোন অর্থে লিখেছেন। চলুন, আগে কুরআন খুলি।

কুরআনের দুটি উপমা

সূরা আত-তাহরীমের শেষে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্য দুজন নারীকে উপমা হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রথমজন ফেরাউনের স্ত্রী, যিনি এক অত্যাচারীর ঘরে থেকেও ঈমান রক্ষা করেছিলেন। দ্বিতীয়জন হযরত মরিয়ম (আ.):

وَمَرۡیَمَ ابۡنَتَ عِمۡرٰنَ الَّتِیۡۤ اَحۡصَنَتۡ فَرۡجَہَا فَنَفَخۡنَا فِیۡہِ مِنۡ رُّوۡحِنَا
“এবং ইমরানের কন্যা মরিয়মকে (উপমা স্বরূপ বর্ণনা করিয়াছেন), যে স্বীয় সতীত্বকে রক্ষা করিয়াছিল এবং আমরা তাহার মধ্যে আমাদের বাণী ফুৎকার করিলাম…”
সূরা আত-তাহরীম ৬৬:১৩
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৬৬:১২।

লক্ষ করুন, ঠিক আগের আয়াতে বলা হয়েছে, এই উপমাগুলো “যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদের জন্য” (৬৬:১২)। অর্থাৎ নারী-পুরুষ সব মুমিনের জন্য। কুরআন বলছে, মুমিনদের মধ্যে কেউ হবেন ফেরাউনের স্ত্রীর মতো, আর কেউ হবেন মরিয়মের মতো।

মরিয়মের মতো মুমিন কেমন? যিনি নিজের পবিত্রতা রক্ষা করেছেন, মন্দের কোনো ছোঁয়া যাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। আর সেই পবিত্রতার পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ তাঁর মধ্যে নিজের পক্ষ থেকে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন, যার ফলে জন্ম নিয়েছেন ঈসা (আ.)।

✦

মরিয়ম থেকে ঈসা: একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কিশতিয়ে নূহ-তে লিখেছেন, সূরা তাহরীমে ইঙ্গিত আছে যে এই উম্মতের কোনো কোনো ব্যক্তি মরিয়ম সিদ্দীকার মতো হবেন। আর এই উম্মতের একজন প্রথমে মরিয়মের মর্যাদা পাবেন, তারপর তাঁর মধ্যে ঈসার রূহ ফুঁকে দেওয়া হবে। অর্থাৎ তাঁর মরিয়মসুলভ গুণাবলি রূপান্তরিত হবে ঈসাসুলভ গুণাবলিতে। এভাবে তিনি “ইবনে মরিয়ম” বা মরিয়মের পুত্র নামে পরিচিত হবেন।

এরপর তিনি দেখিয়েছেন, বারাহীনে আহমদীয়া-য় এই যাত্রাটি ধাপে ধাপে লেখা আছে। পৃষ্ঠা ২৪১-এর ইলহামে তাঁকে প্রথম “মরিয়ম” বলে ডাকা হয়েছে। পৃষ্ঠা ৪৯৬-এর ইলহামে বলা হয়েছে, “হে মরিয়ম… আমি তোমার মধ্যে নিজের পক্ষ থেকে সত্যের রূহ ফুঁকে দিলাম।” আর পৃষ্ঠা ৫৫৬-এর ইলহামে তাঁকে “ঈসা” নামে ডাকা হয়েছে।

তিনি লিখেছেন, তৃতীয় খণ্ডে তাঁর নাম মরিয়ম রাখা হয়, আর দুই বছর তিনি মরিয়মের অবস্থায় আড়ালে প্রতিপালিত হন। তারপর চতুর্থ খণ্ডে ঈসার রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়, আর রূপক অর্থে তাঁকে গর্ভধারণকারী বলা হয়। দশ মাসের বেশি নয়, এমন সময় পরে তিনি মরিয়ম থেকে ঈসায় রূপান্তরিত হন। এভাবেই তিনি ইবনে মরিয়ম হয়েছেন। (রূহানী খাযায়েন, ১৯শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮–৫০)

এখানে “মরিয়ম” হলো একটি আধ্যাত্মিক অবস্থার নাম: পবিত্রতা, সততা, আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠা, যাকে বলা হয় সিদ্দীকিয়্যাতের মর্যাদা। আর “ইবনে মরিয়ম” হলো তার পরের ধাপ, যখন আল্লাহ সেই পবিত্র অবস্থার মধ্য থেকে নিজের পক্ষ থেকে এক নতুন রূহানী জীবন সৃষ্টি করেন।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

একজন পুরুষকে নারীর নামে ডাকা কি অসম্মানজনক নয়?

এখানে কেউ কেউ বলেন, পুরুষ হয়ে মরিয়ম নাম নেওয়া হাস্যকর। চলুন দেখি। সূরা তাহরীমে আল্লাহ নিজেই দুজন নারীকে সব মুমিনের জন্য উপমা বানিয়েছেন। কোনো পুরুষ মুমিন যদি এই উপমার মতো হন, তাহলে তাঁকে সেই নামে ডাকা কুরআনেরই ভাষা অনুসরণ।

রূপক নাম সব ভাষাতেই চলে। আমরা কোনো সাহসী মানুষকে বলি “বাঘ”, কোনো দানশীলকে বলি “হাতেম তাঈ”। এতে কেউ বোঝে না যে মানুষটি সত্যিই বাঘ হয়ে গেছেন। এখানেও “মরিয়ম” নামটি একটি গুণের নাম, শরীরের নয়। যে উপমা আল্লাহ নিজে দিয়েছেন, তাকে অসম্মান বলার সুযোগ নেই।

“গর্ভবতী” হওয়ার কথাটি কি আক্ষরিক?

একেবারেই না। কিশতিয়ে নূহ-তে তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, এটি ইস্তিআরা, অর্থাৎ রূপক ভাষা। যেমন মরিয়ম (আ.)-এর গর্ভে ঈসা (আ.) কিছুকাল লালিত হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন, তেমনি তাঁর ভেতরে ঈসাসুলভ আধ্যাত্মিক অবস্থা কিছুকাল গোপনে বেড়ে উঠে প্রকাশ পেয়েছে। একটি আধ্যাত্মিক পরিবর্তনকে বোঝাতে কুরআনের একটি ঘটনার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। রূপককে আক্ষরিক ধরে নিলে যেকোনো কিতাবের অর্থই বিকৃত হয়ে যায়।

এটা কি পরে বানানো ব্যাখ্যা নয়?

এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আর এর উত্তর হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই দিয়েছেন। বারাহীনে আহমদীয়া যখন ছাপা হয়, তখন তিনি নিজেই বিশ্বাস করতেন যে ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নেমে আসবেন, আর সেই বিশ্বাস ওই বইয়েই লিখেছিলেন।

তিনি প্রশ্ন রেখেছেন: যদি বিশ-বাইশ বছর আগে তিনি পরিকল্পনা করে প্রথমে “মরিয়ম”, তারপর “রূহ ফুঁকে দেওয়া”, তারপর “ঈসা” নামের ইলহাম সাজাতেন, তাহলে একই বইয়ে কেন লিখতেন যে ঈসা (আ.) আকাশ থেকে আসবেন? এতে তো তাঁর নিজের পরিকল্পনাই দুর্বল হয়ে যেত। তিনি লিখেছেন, ইলহামগুলো তাঁর ওপর নাযিল হয়েছিল, কিন্তু সেগুলোর অর্থ আর ক্রম তখন তাঁকে জানানো হয়নি; আর এটিই তাঁর সরলতা ও সততার সাক্ষী। (রূহানী খাযায়েন, ১৯শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫০)

তিনি এ-ও জিজ্ঞেস করেছেন: কুরআন নাযিলের সময় কি তিনি উপস্থিত ছিলেন যে, সূরা তাহরীমে এমন একটি আয়াত চেয়ে নিতেন? বিশ বছর আগে প্রকাশিত ইলহাম আর তেরোশো বছর আগের আয়াত যখন একই কথা বলে, তখন তাকে মানুষের বানানো বলা কঠিন।

সংক্ষেপে

  1. সূরা তাহরীমে আল্লাহ সব মুমিনের জন্য মরিয়ম (আ.)-কে উপমা বানিয়েছেন: পবিত্রতা, তারপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রূহ।
  2. হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর মতে এতে ভবিষ্যদ্বাণী আছে যে, এই উম্মতের একজন প্রথমে মরিয়মের মর্যাদা পাবেন, তারপর ইবনে মরিয়ম হবেন।
  3. বারাহীনে আহমদীয়া-র ইলহামে (পৃষ্ঠা ২৪১, ৪৯৬, ৫৫৬) এই ধাপগুলো আগেই লেখা ছিল, যখন তিনি নিজেও এর অর্থ জানতেন না।
  4. “মরিয়ম” ও “গর্ভ” এখানে রূপক; এগুলো একটি আধ্যাত্মিক অবস্থার নাম, শারীরিক কোনো দাবি নয়।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.