গুরদাসপুরের আদালত। ভেতরে একের পর এক মামলার শুনানি চলছে। বাইরে একটি গাছের নিচে অপেক্ষা করছেন হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)। তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা, যে কোনো মুহূর্তে ডাক পড়তে পারে।
এমন সময় নামাযের ওয়াক্ত হলো। তিনি সেখানেই নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাযের মাঝেই কানে এলো, আদালত থেকে তাঁর নাম ধরে ডাকা হচ্ছে। তিনি নামায ছাড়লেন না।
নামায শেষ করে দেখলেন, আদালতের এক কর্মচারী পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বললেন, “মির্যা সাহেব, অভিনন্দন! আপনি মামলায় জিতে গেছেন।” ঘটনাটি তিনি নিজেই তাঁর সহধর্মিণীকে শুনিয়েছিলেন। (সীরাতুল মাহদী, ১ম খণ্ড)
যে মানুষ আদালতের ডাকেও নামায ভাঙেননি, তাঁর বিরুদ্ধেই একটি অদ্ভুত অভিযোগ শোনা যায়।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, নামাযের মধ্যে যখন তাঁর ওপর ওহী নাযিল হতো, তখন তিনি অস্থির হয়ে নামায ছেড়ে দিতেন। এর প্রমাণ হিসেবে তাঁরা জামাতে আহমদীয়ার পত্রিকা আল ফযল-এর ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২০ তারিখের সংখ্যার নাম উল্লেখ করেন।
একটি অভিযোগ যখন কোনো লিখিত উৎসের নামে করা হয়, তখন প্রথম কাজ হলো উৎসটি খুলে দেখা। এর পরের কাজ হলো, যাঁরা তাঁকে বছরের পর বছর নামায পড়তে দেখেছেন, তাঁদের সাক্ষ্য শোনা।
রেফারেন্সটি কী বলে?
যে লেখা থেকে আমরা এই বিষয়টি নিয়েছি, সেখানে আহমদী মুসলিম লেখক জানিয়েছেন: আল ফযল-এর ৫ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯২০-এর সংখ্যাগুলো একত্রে প্রকাশিত হয়েছিল, আর সেখানে এমন কোনো কথা কোথাও নেই। তাঁর মতে রেফারেন্সটি বানোয়াট।
এখানে একটি সহজ নিয়ম মনে রাখা দরকার। যিনি দাবি করেন, প্রমাণ দেখানোর দায়িত্ব তাঁর। শুধু একটি তারিখ বলে দেওয়া প্রমাণ নয়; সেই পাতার আসল লেখাটি দেখাতে হয়। পবিত্র কুরআন এই নীতিটি শিখিয়েছে:
আর মহানবী (সা.) শুনে শুনে কথা ছড়ানো থেকে সাবধান করেছেন:
যাঁরা তাঁর নামায দেখেছেন
এবার আসি সাক্ষীদের কাছে। যৌবনে কাদিয়ানের মানুষ তাঁকে বলত “মসীতড়”, অর্থাৎ যে মানুষ সারাক্ষণ মসজিদে পড়ে থাকে।
হযরত পীর সিরাজুল হক নুমানী (রা.) ১৮৮২ সাল থেকে তাঁর ইন্তেকালের কয়েক মাস আগ পর্যন্ত তাঁর সাথে ছিলেন। তিনি লিখেছেন, তিনি সবসময় তাঁকে জামাতের সাথে নামাযের পাবন্দ পেয়েছেন। (তাযকিরাতুল মাহদী, পৃষ্ঠা ৭০)
জামাতে নামাযের প্রতি তাঁর টান এতটাই ছিল যে শুরুর দিনগুলোতে তিনি হাফেয মুঈনুদ্দীন সাহেবকে সাথে রাখতেন শুধু এজন্য, যেন একা না পড়ে জামাতে নামায পড়া যায়। হযরত মুফতী মুহাম্মদ সাদেক (রা.) বর্ণনা করেছেন, জীবনের শেষ দুই-তিন বছরে কখনো মাগরিব-এশায় বাইরে আসতে না পারলে তিনি ঘরের নারী ও শিশুদের একত্র করে জামাতে নামায পড়াতেন। মামলা-মোকদ্দমার দিনগুলোতেও তিনি কোনো নামায কাযা করেননি; আদালতের অনুমতি নিয়ে সময়মতো নামায পড়তেন।
হাফেয হামেদ আলী সাহেব বর্ণনা করেছেন, তিনি গভীর মনোযোগে নামায পড়তেন। “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম” বারবার পড়তেন। তাঁর সিজদা প্রায়ই হতো অনেক দীর্ঘ, যেন আবেগে গলে যাচ্ছেন।
একবার প্রচণ্ড মাথাব্যথায় তিনি তিন দিন মসজিদে আসতে পারেননি। চতুর্থ দিন একটু ভালো লাগতেই ফজরে এলেন, কষ্ট করে বসে জামাতে নামায পড়লেন। এত দুর্বল ছিলেন যে নামাযের পর আর বসে থাকতে পারলেন না, মসজিদেই শুয়ে পড়লেন। (তাযকিরাতুল মাহদী, পৃষ্ঠা ৪৮–৪৯)
আরেকবার কিডনির তীব্র ব্যথায় ছটফট করছিলেন। আসরের আযান হতেই ব্যথার জায়গায় আগুনে গরম করা মাটির টুকরো বেঁধে নিয়ে নামায পড়লেন।
আর জীবনের শেষ ভোরে, মৃত্যুশয্যায়, তিনি বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, “নামাযের সময় কি হয়েছে?” জ্ঞান হারাচ্ছিলেন, জ্ঞান ফিরলেই আবার নামাযের নিয়ত বাঁধছিলেন। (সিলসিলায়ে আহমদীয়া, পৃষ্ঠা ১৮২)
এই মানুষটির ছবি আর অভিযোগের ছবি, দুটি পাশাপাশি রাখলেই পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
রেফারেন্স তো দেওয়া আছে, অস্বীকার করলেই কি তা মিথ্যা হয়ে যায়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, আহমদী মুসলমানরা নিজেদের পত্রিকার কথা অস্বীকার করছে। চলুন দেখি। প্রশ্নটি অস্বীকারের নয়, দেখানোর। যিনি অভিযোগ করছেন, তিনি পত্রিকার সেই পাতা আর সেই বাক্যটি হুবহু সামনে আনলেই বিষয়টি মিটে যায়। আহমদী মুসলিম লেখকের বক্তব্য হলো, সেই সংখ্যায় এমন কোনো বাক্য নেই।
তার ওপর, অভিযোগটি এমন একজন সম্পর্কে, যাঁর নামাযের অসংখ্য প্রত্যক্ষ বর্ণনা আছে, আর তার একটিও এর সাথে মেলে না। যে দাবির পক্ষে পাতা দেখানো যায় না আর সব সাক্ষী যার বিপক্ষে, তা প্রমাণ হিসেবে টেকে না।
তিনি কি কখনো বসে বা শুয়ে নামায পড়েননি? সেটা কি নামায ছাড়া নয়?
অসুস্থতায় তিনি কখনো বসে, শেষ সময়ে শুয়ে নামায পড়েছেন। কেউ এটিকে নামাযে শিথিলতা ভাবতে পারেন। অথচ এটি মহানবী (সা.)-এরই শিক্ষা। হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) অসুস্থ ছিলেন, নামায নিয়ে জিজ্ঞেস করলে মহানবী (সা.) বললেন:
অর্থাৎ যে মানুষ অসুস্থতার মধ্যেও বসে, এমনকি শুয়ে নামায আদায় করেছেন, তিনি আসলে নামাযকে কখনো ছাড়েননি। এটি নামায ছাড়ার নয়, নামায আঁকড়ে থাকার প্রমাণ।
তাহলে কি তাঁর ওপর নামাযে কখনো কিছু নাযিল হয়নি?
এ বিষয়ে আমরা এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাইনি যাতে বলা আছে যে ওহীর কারণে তিনি নামায ভেঙেছেন। আর যা প্রমাণিত নয়, তা নিয়ে অনুমান করে কিছু বলা ঠিক নয়। আমরা শুধু ততটুকুই বলি যতটুকু সাক্ষীরা দেখেছেন: আদালতের ডাক, অসুখের যন্ত্রণা, এমনকি মৃত্যুর মুহূর্তও তাঁকে নামায থেকে সরাতে পারেনি।
সংক্ষেপে
- অভিযোগটি আল ফযল, ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২০-এর নামে করা হয়; আহমদী মুসলিম লেখকের মতে সেই সংখ্যায় এমন কোনো কথা নেই।
- কুরআনের নীতি হলো, দাবিদারকেই প্রমাণ দেখাতে হবে; শোনা কথা ছড়ানো গুনাহ।
- প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, তিনি আদালতের ডাকেও নামায ভাঙেননি, অসুস্থতায় বসে ও শুয়ে নামায আদায় করেছেন।
- তাই “অস্থির হয়ে নামায ছেড়ে দিতেন” কথাটির কোনো প্রমাণ নেই।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Iqamatus Salat – The observance of Prayer · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.